পূর্ণ-আনন্দ পূর্ণমঙ্গলরূপে হৃদয়ে এসো
পূর্ণ-আনন্দ পূর্ণমঙ্গলরূপে হৃদয়ে এসো,
এসো মনোরঞ্জন॥
আলোকে আঁধার হউক চূর্ণ, অমৃতে মৃত্যু করো পূর্ণ–
করো গভীরদারিদ্র৻ভঞ্জন ॥
সকল সংসার দাঁড়াবে সরিয়া তুমি হৃদয়ে আসিছ দেখি–
জ্যোতির্ময় তোমার প্রকাশে শশী তপন পায় লাজ,
সকলের তুমি গর্বগঞ্জন ॥
পূর্বগগনভাগে
পূর্বগগনভাগে
দীপ্ত হইল সুপ্রভাত
তরুণারুণরাগে।
শুভ্র শুভ মুহূর্ত আজি সার্থক কর’ রে,
অমৃতে ভর’ রে–
অমিতপুণ্যভাগী কে
জাগে কে জাগে ॥
পেয়েছি অভয়পদ, আর ভয় কারে
পেয়েছি অভয়পদ, আর ভয় কারে–
আনন্দে চলেছি ভবপারাবারপারে ॥
মধুর শীতল ছায় শোক তাপ দূরে যায়,
করুণাকিরণ তাঁর অরুণ বিকাশে।
জীবনে মরণে আর কভু না ছাড়িব তাঁরে ॥
পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহো ভাই
পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহো ভাই–
সবারে আমি প্রণাম করে যাই॥
ফিরায়ে দিনু দ্বারের চাবি, রাখি না আর ঘরের দাবি–
সবার আজি প্রসাদবাণী চাই॥
অনেক দিন ছিলাম প্রতিবেশী,
দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশি।
প্রভাত হয়ে এসেছে রাতি, নিবিয়া গেল কোণের বাতি–
পড়েছে ডাক, চলেছি আমি তাই॥
পেয়েছি সন্ধান তব অন্তর্যামী, অন্তরে দেখেছি তোমারে
পেয়েছি সন্ধান তব অন্তর্যামী, অন্তরে দেখেছি তোমারে॥
চকিতে চপল আলোকে, হৃদয়শতদলমাঝে,
হেরিনু একি অপরূপ রূপ॥
কোথা ফিরিতেছিলাম পথে পথে দ্বারে দ্বারে
মাতিয়া কলরবে–
সহসা কোলাহলমাঝে শুনেছি তব আহ্বান,
নিভৃতহৃদয়মাঝে
মধুর গভীর শান্ত বাণী॥
প্রচণ্ড গর্জনে আসিল একি দুর্দিন
প্রচণ্ড গর্জনে আসিল একি দুর্দিন–
দারুণ ঘনঘটা, অবিরল অশনিতর্জন ॥
ঘন ঘন দামিনী-ভুজঙ্গ-ক্ষত যামিনী,
অম্বর করিছে অন্ধনয়নে অশ্রু-বরিষন ॥
ছাড়ো রে শঙ্কা, জাগো ভীরু অলস,
আনন্দে জাগাও অন্তরে শকতি।
অকুণ্ঠ আঁখি মেলি হেরো প্রশান্ত বিরাজিত
মহাভয়-মহাসনে অপরূপ মৃত্যুঞ্জয়রূপে ভয়হরণ ॥
প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী
প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী,
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
করি জোড়কর, হে ভুবনেশ্বর,
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
তোমার অপার আকাশের তলে
বিজনে বিরলে হে–
নম্র হৃদয়ে নয়নের জলে
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
তোমার বিচিত্র এ ভবসংসারে
কর্মপারাবারপারে হে,
নিখিলজগৎজনের মাঝারে
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
তোমার এ ভবে মোর কাজ যবে
সমাপন হবে হে,
ওগো রাজরাজ, একাকী নীরবে
দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর
প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর—
তুমি দেহো মোরে কথা, তুমি দেহো মোরে সুর—
তুমি যদি থাক মনে বিকচ কমলাসনে,
তুমি যদি কর প্রাণ তব প্রেমে পরিপূর,
প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর॥
তুমি শোন যদি গান আমার সমুখে থাকি,
সুধা যদি করে দান তোমার উদার আঁখি,
তুমি যদি দুখ’পরে রাখ কর স্নেহভরে,
তুমি যদি সুখ হতে দম্ভ করহ দূর,
প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর॥
প্রথম আদি তব শক্তি
প্রথম আদি তব শক্তি–
আদি পরমোজ্জ্বল জ্যোতি তোমারি হে
গগনে গগনে ॥
তোমার আদি বাণী বহিছে তব আনন্দ,
জাগিছে নব নব রসে হৃদয়ে মনে ॥
তোমার চিদাকাশে ভাতে সূরয চন্দ্র তারা,
প্রাণতরঙ্গ উঠে পবনে।
তুমি আদিকবি, কবিগুরু তুমি হে,
মন্ত্র তোমার মন্দ্রিত সব ভুবনে ॥
প্রথম আলোর চরণধ্বনি উঠল বেজে যেই
প্রথম আলোর চরণধ্বনি উঠল বেজে যেই
নীড়বিরাগী হৃদয় আমার উধাও হল সেই ॥
নীল অতলের কোথা থেকে উদাস তারে করল যে কে
গোপনবাসী সেই উদাসীর ঠিক-ঠিকানা নেই ॥
“সুপ্তিশয়ন আয় ছেড়ে আয়’ জাগে যে তার ভাষা,
সে বলে “চল্ আছে যেথায় সাগরপারের বাসা’।
দেশ-বিদেশের সকল ধারা সেইখানে হয় বাঁধনহারা
কোণের প্রদীপ মিলায় শিখা জ্যোতিসমুদ্রেই ॥
প্রভাতে বিমল আনন্দে বিকশিত কুসুমগন্ধে
প্রভাতে বিমল আনন্দে বিকশিত কুসুমগন্ধে
বিহঙ্গমগীতছন্দে তোমার আভাস পাই॥
জাগে বিশ্ব তব ভবনে প্রতিদিন নব জীবনে,
অগাধ শূন্য পূরে কিরণে,
খচিত নিখিল বিচিত্র বরনে–
বিরল আসনে বসি তুমি সব দেখিছ চাহি॥
চারি দিকে করে খেলা বরন-কিরণ-জীবন-মেলা,
কোথা তুমি অন্তরালে !
অন্ত কোথায়, অন্ত কোথায়–অন্ত তোমার নাহি নাহি॥
প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে
প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে;
দেখা নাই পাই,
পথ চাই,
সেও মনে ভালো লাগে।
ধুলাতে বসিয়া দ্বারে
ভিখারি হৃদয় হা রে
তোমারি করুণা মাগে।
কৃপা নাই পাই,
শুধু চাই,
সেও মনে ভালো লাগে।
আজি এ জগত-মাঝে
কত সুখে কত কাজে
চলে গেল সবে আগে।
সাথী নাই পাই,
তোমায় চাই,
সেও মনে ভালো লাগে।
চারি দিকে সুধাভরা
ব্যাকুল শ্যামল ধরা
কাঁদায় রে অনুরাগে।
দেখা নাই নাই,
ব্যথা পাই,
সেও মনে ভালো লাগে।
প্রভু বলো বলো কবে
প্রভু, বলো বলো কবে
তোমার পথের ধুলার রঙে রঙে আঁচল রঙিন হবে।
তোমার বনের রাঙা ধূলি ফুটায় পূজার কুসুমগুলি,
সেই ধূলি হায় কখন আমায় আপন করি’ লবে?
প্রণাম দিতে চরণতলে ধুলার কাঙাল যাত্রীদলে
চলে যারা, আপন ব’লে চিনবে আমায় সবে॥
প্রভু আমার প্রিয় আমার পরম ধন হে
প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে।
চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে ॥
তৃপ্তি আমার, অতৃপ্তি মোর, মুক্তি আমার, বন্ধনডোর,
দুঃখসুখের চরম আমার জীবন মরণ হে॥
আমার সকল গতির মাঝে পরম গতি হে,
নিত্য প্রেমের ধামে আমার পরম পতি হে।
ওগো সবার, ওগো আমার, বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার–
অন্তবিহীন লীলা তোমার নূতন নূতন হে ॥
