পথে যেতে ডেকেছিলে মোরে
পথে যেতে ডেকেছিলে মোরে।
পিছিয়ে পড়েছি আমি, যাব যে কী করে?।
এসেছে নিবিড় নিশি, পথরেখা গেছে মিশি–
সাড়া দাও, সাড়া দাও আঁধারের ঘোরে ॥
ভয় হয়, পাছে ঘুরে ঘুরে যত আমি যাই তত যাই চলে দূরে–
মনে করি আছ কাছে, তবু ভয় হয়, পাছে
আমি আছি তুমি নাই কালি নিশিভোরে ॥
পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে
পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে !
এত কামনা, এত সাধনা কোথায় মেশে ?।
ঢেউ ওঠে পড়ে কাঁদার, সম্মুখে ঘন আঁধার,
পার আছে গো পার আছে– পার আছে কোন্ দেশে ?।
আজ ভাবি মনে মনে, মরীচিকা-অন্বেষণে হায়
বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই। মনে ভয় লাগে সেই–
হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে॥
পাতার ভেলা ভাসাই নীরে
পাতার ভেলা ভাসাই নীরে,
পিছন-পানে চাই নে ফিরে॥
কর্ম আমার বোঝাই ফেলা, খেলা আমার চলার খেলা।
হয় নি আমার আসন মেলা, ঘর বাঁধি নি স্রোতের তীরে॥
বাঁধন যখন বাঁধতে আসে
ভাগ্য আমার তখন হাসে॥
ধুলা-ওড়া হাওয়ার ডাকে পথ যে টেনে লয় আমাকে–
নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে গান দিয়ে যাই ধরিত্রীরে॥
পাত্রখানা যায় যদি যাক ভেঙেচুরে
পাত্রখানা যায় যদি যাক ভেঙেচুরে–
আছে অঞ্জলি মোর, প্রসাদ দিয়ে দাও-না পুরে ॥
সহজ সুখের সুধা তাহার মূল্য তো নাই,
ছড়াছড়ি যায় সে-যে ওই যেখানে চাই–
বড়ো-আপন কাছের জিনিস রইল দূরে।
হৃদয় আমার সহজ সুধায় দাও-না পুরে ॥
বারে বারে চাইব না আর মিথ্যা টানে
ভাঙন-ধরা আঁধার-করা পিছন-পানে।
বাসা বাঁধার বাঁধনখানা যাক-না টুটে,
অবাধ পথের শূন্যে আমি চলব ছুটে।
শূন্য-ভরা তোমার বাঁশির সুরে সুরে
হৃদয় আমার সহজ সুধায় দাও-না পুরে ॥
পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে
পাদপ্রান্তে রাখ’ সেবকে,
শান্তিসদন সাধনধন দেবদেব হে ॥
সর্বলোকপরমশরণ, সকলমোহকলুষহরণ,
দুঃখতাপবিঘ্নতরণ, শোকশান্তস্নিগ্ধচরণ,
সতরূপ প্রেমরূপ হে,
দেবমনুজবন্দিতপদ বিশ্বভূপ হে ॥
হৃদয়ানন্দ পূর্ণ ইন্দু, তুমি অপার প্রেমসিন্ধু।
যাচে তৃষিত অমিয়বিন্দু, করুণালয় ভক্তবন্ধু
প্রেমনেত্রে চাহ’ সেবকে,
বিকশিতদল চিত্তকমল হৃদয়দেব হে ॥
পুণ্যজ্যোতিপূর্ণ গগন, মধুর হেরি সকল ভুবন,
সুধাগন্ধমুদিত পবন, ধ্বনিতগীত হৃদয়ভবন।
এস’ এস’ শূন্য জীবনে,
মিটাও আশ সব তিয়াষ অমৃতপ্লাবনে ॥
দেহ’ জ্ঞান, প্রেম দেহ’, শুষ্ক চিত্তে বরিষ স্নেহ।
ধন্য হোক হৃদয় দেহ, পুণ্য হোক সকল গেহ।
পাদপ্রান্তে রাখ’ সেবকে,
শান্তিসদন সাধনধন দেবদেব হে ॥
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কণ্ঠে তোমারি গান গাওয়া॥
চায় না সে জন পিছন-পানে ফিরে,
বায় না তরী কেবল তীরে তীরে,
তুফান তারে ডাকে অকূল নীরে
যার পরানে লাগল তোমার হাওয়া॥
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,
পথিকচিত্তে তোমার তরী বাওয়া।
দুয়ার খুলে সমুখ-পানে যে চাহে
তার চাওয়া যে তোমার পানে চাওয়া।
বিপদ বাধা কিছুই ডরে না সে,
রয় না পড়ে কোনো লাভের আশে,
যাবার লাগি মন তারি উদাসে–
যাওয়া সে যে তোমার পানে যাওয়া॥
পান্থ, এখনো কেন অলসিত অঙ্গ
পান্থ, এখনো কেন অলসিত অঙ্গ–
হেরো, পুষ্পবনে জাগে বিহঙ্গ ॥
গগন মগন নন্দন-আলোক উল্লাসে,
লোকে লোকে উঠে প্রাণতরঙ্গ ॥
রুদ্ধ হৃদয়কক্ষে তিমিরে
কেন আত্মসুখদুঃখে শয়ান–
জাগো জাগো, চলো মঙ্গলপথে
যাত্রীদলে মিলি লহো বিশ্বের সঙ্গ ॥
পারবি না কি যোগ দিতে এই ছন্দে রে
পারবি না কি যোগ দিতে এই ছন্দে রে,
খসে যাবার ভেসে যাবার
ভাঙবারই আনন্দে রে।
পাতিয়া কান শুনিস না যে
দিকে দিকে গগনমাঝে
মরণবীণায় কী সুর বাজে
তপন-তারা-চন্দ্রে রে
জ্বালিয়ে আগুন ধেয়ে ধেয়ে
জ্বলবারই আনন্দে রে।
পাগল-করা গানের তানে
ধায় যে কোথা কেই-বা জানে,
চায় না ফিরে পিছন-পানে
রয় না বাঁধা বন্ধে রে
লুটে যাবার ছুটে যাবার
চলবারই আনন্দে রে।
সেই আনন্দ-চরণপাতে
ছয় ঋতু যে নৃত্যে মাতে,
প্লাবন বহে যায় ধরাতে
বরন গীতে গন্ধে রে
ফেলে দেবার ছেড়ে দেবার
মরবারই আনন্দে রে।
পিনাকেতে লাগে টঙ্কার
পিনাকেতে লাগে টঙ্কার–
বসুন্ধরার পঞ্জরতলে কম্পন জাগে শঙ্কার ॥
আকাশেতে ঘোরে ঘূর্ণি সৃষ্টির বাঁধ চূর্ণি,
বজ্রভীষণ গর্জনরব প্রলয়ের জয়ডঙ্কার ॥
স্বর্গ উঠিছে ক্রন্দি, সুরপরিষদ বন্দী–
তিমিরগহন দুঃসহ রাতে উঠে শৃঙ্খলঝঙ্কার।
দানবদন্ত তর্জি রুদ্র উঠিল গর্জি–
লণ্ডভণ্ড লুটিল ধুলায় অভ্রভেদী অহঙ্কার ॥
পিপাসা হায় নাহি মিটিল, নাহি মিটিল
পিপাসা হায় নাহি মিটিল, নাহি মিটিল ॥
গরলরসপানে জরজরপরানে
মিনতি করি হে করজোড়ে,
জুড়াও সংসারদাহ তব প্রেমের অমৃতে ॥
পুষ্প দিয়ে মারো যারে চিনল না সে মরণকে
পুষ্প দিয়ে মারো যারে চিনল না সে মরণকে।
বাণ খেয়ে যে পড়ে সে যে ধরে তোমার চরণকে॥
সবার নিচে ধুলার ’পরে ফেলো যারে মৃত্যুশরে
সে যে তোমার কোলে পড়ে, ভয় কি বা তার পড়নকে ?।
আরামে যার আঘাত ঢাকা, কলঙ্ক যার সুগন্ধ,
নয়ন মেলে দেখল না সে রুদ্র মুখের আনন্দ।
মজল না সে চোখের জলে, পৌঁছল না চরণতলে,
তিলে তিলে পলে পলে ম’ল যেজন পালঙ্কে॥
