নিশিদিন মোর পরানে প্রিয়তম মম
নিশিদিন মোর পরানে প্রিয়তম মম
কত-না বেদনা দিয়ে বারতা পাঠালে ॥
ভরিলে চিত্ত মম নিত্য তুমি প্রেমে প্রাণে গানে হায়
থাকি আড়ালে ॥
নিশীথশয়নে ভেবে রাখি মনে, ওগো অন্তরযামী
নিশীথশয়নে ভেবে রাখি মনে, ওগো অন্তরযামী,
প্রভাতে প্রথম নয়ন মেলিয়া তোমারে হেরিব আমি
ওগো অন্তরযামী ॥
জাগিয়া বসিয়া শুভ্র আলোকে তোমার চরণে নমিয়া পুলকে
মনে ভেবে রাখি দিনের কর্ম তোমারে সঁপিব স্বামী
ওগো অন্তরযামী ॥
দিনের কর্ম সাধিতে সাধিতে ভেবে রাখি মনে মনে
কর্ম-অন্তে সন্ধ্যাবেলায় বসিব তোমারি সনে।
দিন-অবসানে ভাবি ব’সে ঘরে তোমার নিশীথবিরামসাগরে
শ্রান্ত প্রাণের ভাবনা বেদনা নীরবে যাইবে নামি
ওগো অন্তরযামী ॥
নীরবে আছ কেন বাহিরদুয়ারে
নীরবে আছ কেন বাহিরদুয়ারে–
আঁধার লাগে চোখে, দেখি না তুহারে ॥
সময় হল জানি, নিকটে লবে টানি,
আমার তরীখানি ভাসাবে জুয়ারে ॥
সফল হোক প্রাণ এ শুভলগনে,
সকল তারা তাই গাহুক গগনে।
করো গো সচকিত আলোকে পুলকিত
স্বপননিমীলিত হৃদয়গুহারে ॥
নূতন প্রাণ দাও, প্রাণসখা, আজি সুপ্রভাতে
নূতন প্রাণ দাও, প্রাণসখা, আজি সুপ্রভাতে ॥
বিষাদ সব করো দূর নবীন আনন্দে,
প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে ॥
নয় এ মধুর খেলা
নয় এ মধুর খেলা–
তোমায় আমায় সারাজীবন সকাল-সন্ধ্যাবেলা নয় এ মধুর খেলা ॥
কতবার যে নিবল বাতি, গর্জে এল ঝড়ের রাতি–
সংসারের এই দোলায় দিলে সংশয়েরই ঠেলা ॥
বারে বারে বাঁধ ভাঙিয়া বন্যা ছুটেছে।
দারুণ দিনে দিকে দিকে কান্না উঠেছে।
ওগো রুদ্র, দুঃখে সুখে এই কথাটি বাজল বুকে–
তোমার প্রেমে আঘাত আছে, নাইকো অবহেলা ॥
নয়ন ছেড়ে গেলে চলে, এলে সকল-মাঝে
নয়ন ছেড়ে গেলে চলে, এলে সকল-মাঝে–
তোমায় আমি হারাই যদি তুমি হারাও না যে ॥
ফুরায় যবে মিলনরাতি তবু চির সাথের সাথি
ফুরায় না তো তোমায় পাওয়া, এসো স্বপনসাজে ॥
তোমার সুধারসের ধারা গহনপথে এসে
ব্যথারে মোর মধুর করি নয়নে যায় ভেসে।
শ্রবণে মোর নব নব শুনিয়েছিলে যে সুর তব
বীণা থেকে বিদায় নিল, চিত্তে আমার বাজে ॥
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে ॥
বাসনার বশে মন অবিরত ধায় দশ দিশে পাগলের মতো,
স্থির-আঁখি তুমি মরমে সতত জাগিছ শয়নে স্বপনে ॥
সবাই ছেড়েছে, নাই যার কেহ, তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ–
নিরাশ্রয় জন, পথ যার গেহ, সেও আছে তব ভবনে।
তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর,সমুখে অনন্ত জীবনবিস্তার–
কালপারাবার করিতেছ পার কেহ নাহি জানে কেমনে ॥
জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি, তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি,
যত পাই তোমায় আরো তত যাচি, যত জানি তত জানি নে।
জানি আমি তোমায় পাব নিরন্তর লোকলোকান্তরে যুগযুগান্তর–
তুমি আর আমি মাঝে কেহ নাই, কোনো বাধা নাই ভুবনে ॥
নয়ান ভাসিল জলে
নয়ান ভাসিল জলে–
শূন্য হিয়াতলে ঘনাইল নিবিড় সজল ঘন প্রসাদপবনে,
জাগিল রজনী হরষে হরষে রে ॥
তাপহরণ তৃষিতশরণ জয় তাঁর দয়া গাও রে।
জাগো রে আনন্দে চিতচাতক জাগো–
মৃদু মৃদু মধু মধু প্রেম বরষে বরষে রে ॥
পথ এখনো শেষ হল না, মিলিয়ে এল দিনের ভাতি
পথ এখনো শেষ হল না, মিলিয়ে এল দিনের ভাতি।
তোমার আমার মাঝখানে হায় আসবে কখন আঁধার রাতি॥
এবার তোমার শিখা আনি
জ্বালাও আমার প্রদীপখানি,
আলোয় আলোয় মিলন হবে পথের মাঝে পথের সাথি॥
ভালো করে মুখ যে তোমার যায় না দেখা সুন্দর হে–
দীর্ঘ পথের দারুণ গ্লানি তাই তো আমায় জড়িয়ে রহে।
ছায়ায়-ফেরা ধুলায়-চলা
মনের কথা যায় না বলা,
শেষ কথাটি জ্বালবে এবার তোমার বাতি আমার বাতি॥
পথ চেয়ে যে কেটে গেল কত দিনে রাতে
পথ চেয়ে যে কেটে গেল কত দিনে রাতে,
আজ তোমায় আমায় প্রাণের বঁধু মিলব গো এক সাথে ॥
রচবে তোমার মুখের ছায়া চোখের জলে মধুর মায়া,
নীরব হয়ে তোমার পানে চাইব গো জোড় হাতে ॥
এরা সবাই কী বলে গো লাগে না মন আর,
আমার হৃদয় ভেঙে দিল তোমার কী মাধুরীর ভার!
বাহুর ঘেরে তুমি মোরে রাখবে না কি আড়াল করে,
তোমার আঁখি চাইবে না কি আমার বেদনাতে?।
পথ দিয়ে কে যায় গো চলে
পথ দিয়ে কে যায় গো চলে
ডাক দিয়ে সে যায়।
আমার ঘরে থাকাই দায়॥
পথের হাওয়ায় কী সুর বাজে, বাজে আমার বুকের মাঝে–
বাজে বেদনায়॥
পূর্ণিমাতে সাগর হতে ছুটে এল বান,
আমার লাগল প্রাণে টান।
আপন-মনে মেলে আঁখি আর কেন বা পড়ে থাকি
কিসের ভাবনায়॥
পথিক হে, ওই-যে চলে, ওই-যে চলে সঙ্গী তোমার দলে দলে
পথিক হে,
ওই-যে চলে, ওই-যে চলে সঙ্গী তোমার দলে দলে॥
অন্যমনে থাকি কোণে, চমক লাগে ক্ষণে ক্ষণে–
হঠাৎ শুনি জলে স্থলে পায়ের ধ্বনি আকাশতলে॥
পথিক হে, পথিক হে, যেতে যেতে পথের থেকে
আমায় তুমি যেয়ো ডেকে।
যুগে যুগে বারে বারে এসেছিলে আমার দ্বারে–
হঠাৎ যে তাই জানিতে পাই, তোমার চলা হৃদয়তলে॥
পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোন্খানে
পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোন্খানে
তোমার পরশ আসে কখন কে জানে॥
কী অচেনা কুসুমের গন্ধে, কী গোপন আপন আনন্দে,
কোন্ পথিকের কোন্ গানে॥
সহসা দারুণ দুখতাপে সকল ভুবন যবে কাঁপে,
সকল পথের ঘোচে চিহ্ন সকল বাঁধন যবে ছিন্ন
মৃত্যু-আঘাত লাগে প্রাণে–
তোমার পরশ আসে কখন কে জানে॥
