না বাঁচাবে আমায় যদি মারবে কেন তবে
না বাঁচাবে আমায় যদি মারবে কেন তবে?
কিসের তরে এই আয়োজন এমন কলরবে?।
অগ্নিবাণে তূণ যে ভরা, চরণভরে কাঁপে ধরা,
জীবনদাতা মেতেছ যে মরণ-মহোৎসবে ॥
বক্ষ আমার এমন ক’রে বিদীর্ণ যে করো
উৎস যদি না বাহিরায় হবে কেমনতরো?
এই-যে আমার ব্যথার খনি জোগাবে ওই মুকুট-মণি–
মরণদুখে জাগাবে মোর জীবনবল্লভে ॥
না রে, না রে, হবে না তোর স্বর্গসাধন
না রে, না রে, হবে না তোর স্বর্গসাধন–
সেখানে যে মধুর বেশে ফাঁদ পেতে রয় সুখের বাঁধন॥
ভেবেছিলি দিনের শেষে তপ্ত পথের প্রান্তে এসে
সোনার মেঘে মিলিয়ে যাবে সারা দিনের সকল কাঁদন॥
না রে, না রে, হবে না তোর, হবে না তা–
সন্ধ্যাতারার হাসির নিচে হবে না তোর শয়ন পাতা।
পথিক বঁধু পাগল ক’রে পথে বাহির করবে তোরে–
হৃদয় যে তোর ফেটে গিয়ে ফুটবে তবে তাঁর আরাধন॥
নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে
নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে,
মুখ ফিরালে ফিরব না এইবারে ॥
বসব তোমার পথের ধুলার ‘পরে,
এড়িয়ে আমায় চলবে কেমন করে–
তোমার তরে যে জন গাঁথে মালা
গানের কুসুম জুগিয়ে দেব তারে ॥
রইব তোমার ফসল-খেতের কাছে
যেথায় তোমার পায়ের চিহ্ন আছে।
জেগে রব গভীর উপবাসে
অন্ন তোমার আপনি যেথায় আসে–
যেথায় তুমি লুকিয়ে প্রদীপ জ্বালো
বসে রব সেথায় অন্ধকারে ॥
নাথ হে, প্রেমপথে সব বাধা ভাঙিয়া দাও
নাথ হে, প্রেমপথে সব বাধা ভাঙিয়া দাও।
মাঝে কিছু রেখো না, রেখো না–
থেকো না, থেকো না দূরে ॥
নির্জনে সজনে অন্তরে বাহিরে
নিত্য তোমারে হেরিব ॥
নিকটে দেখিব তোমারে করেছি বাসনা মনে
নিকটে দেখিব তোমারে করেছি বাসনা মনে।
চাহিব না হে, চাহিব না হে দূরদূরান্তর গগনে ॥
দেখিব তোমারে গৃহমাঝারে জননীস্নেহে, ভ্রাতৃপ্রেমে,
শত সহস্র মঙ্গলবন্ধনে ॥
হেরিব উৎসবমাঝে, মঙ্গলকাজে,
প্রতিদিন হেরিব জীবনে।
হেরিব উজ্জ্বল বিমল মূর্তি তব শোকে দুঃখে মরণে।
হেরিব সজনে নরনারীমুখে, হেরিব বিজনে বিরলে হে
গভীর অন্তর-আসনে ॥
নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে
নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে
তারি মধু কেন মনমধুপে খাওয়াও না?
নিত্যসভা বসে তোমার প্রাঙ্গণে,
তোমার ভৃত্যের সেই সভায় কেন গাওয়াও না?।
বিশ্বকমল ফুটে চরণচুম্বনে,
সে যে তোমার মুখে মুখ তুলে চায় উন্মনে,
আমার চিত্ত-কমলটিরে সেই রসে
কেন তোমার পানে নিত্য-চাওয়া চাওয়াও না?।
আকাশে ধায় রবি-তারা-ইন্দুতে,
তোমার বিরামহারা নদীরা ধায় সিন্ধুতে,
তেমনি করে সুধাসাগর-সন্ধানে
আমার জীবনধারা নিত্য কেন ধাওয়াও না?
পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ,
তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ,
তেমনি করে আমার হৃদয়ভিক্ষুরে
কেন দ্বারে তোমার নিত্যপ্রসাদ পাওয়াও না?।
নিত্য নব সত্য তব শুভ্র আলোকময়
নিত্য নব সত্য তব শুভ্র আলোকময়
পরিপূর্ণ জ্ঞানময়
কবে হবে বিভাসিত মম চিত্ত-আকাশে?।
রয়েছি বসি দীর্ঘনিশি
চাহিয়া উদয়দিশি
ঊর্ধ্বমুখে করপুটে–
নবসুখ-নবপ্রাণ-নবদিবা-আশে ॥
কী দেখিব, কী জানিব,
না জানি সে কী আনন্দ–
নূতন আলোক আপন মনোমাঝে।
সে আলোকে মহাসুখে
আপন আলয়মুখে
চলে যাব গান গাহি–
কে রহিবে আর দূর পরবাসে ॥
নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা
নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা।
মন রে মোর, পাথারে হোস নে দিশেহারা ॥
বিষাদে হয়ে ম্রিয়মাণ বন্ধ না করিয়ো গান,
সফল করি তোলো প্রাণ টুটিয়া মোহকারা ॥
রাখিয়ো বল জীবনে, রাখিয়ো চির-আশা,
শোভন এই ভুবনে রাখিয়ো ভালোবাসা।
সংসারের সুখে দুখে চলিয়া যেয়ো হাসিমুখে,
ভরিয়া সদা রেখো বুকে তাঁহারি সুধাধারা ॥
নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা
নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা,
ভক্ত, সেথায় খোলো দ্বার– আজ লব তাঁর দেখা॥
সারাদিন শুধু বাহিরে ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে,
সন্ধ্যাবেলার আরতি হয় নি আমার শেখা॥
তব জীবনের আলোতে জীবন-প্রদীপ জ্বালি
হে পূজারি, আজ নিভৃতে সাজাব আমার থালি।
যেথা নিখিলের সাধনা পূজালোক করে রচনা,
সেথায় আমিও ধরিব একটি জ্যোতির রেখা॥
নিশা-অবসানে কে দিল গোপনে আনি
নিশা-অবসানে কে দিল গোপনে আনি
তোমার বিরহ-বেদনা-মানিকখানি ॥
সে ব্যথার দান রাখিব পরানমাঝে–
হারায় না যেন জটিল দিনের কাজে,
বুকে যেন দোলে সকল ভাবনা হানি ॥
চিরদুখ মম চিরসম্পদ হবে,
চরম পূজায় হবে সার্থক কবে।
স্বপনগহন নিবিড়তিমিরতলে
বিহ্বল রাতে সে যেন গোপনে জ্বলে,
সেই তো নীরব তব আহ্বানবাণী ॥
নিশার স্বপন ছুটল রে, এই ছুটল রে
নিশার স্বপন ছুটল রে, এই ছুটল রে, টুটল বাঁধন টুটল রে।
রইল না আর আড়াল প্রাণে, বেরিয়ে এলেম জগৎ-পানে–
হৃদয়শতদলের সকল দলগুলি এই ফুটল রে, এই ফুটল রে॥
দুয়ার আমার ভেঙে শেষে দাঁড়ালে যেই আপনি এসে
নয়নজলে ভেসে হৃদয় চরণতলে লুটল রে।
আকাশ হতে প্রভাত-আলো আমার পানে হাত বাড়ালো,
ভাঙা কারার দ্বারে আমার জয়ধ্বনি উঠল রে, এই উঠল রে॥
নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে
নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে।
বিকশিবে প্রাণ তাঁর গুণগানে ॥
হেরো রে অন্তরে সে মুখ সুন্দর,
ভোলো দুঃখ তাঁর প্রেমমধুপানে ॥
