দূরে কোথায় দূরে দূরে
দূরে কোথায় দূরে দূরে
আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে।
যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে সেই বাঁশিটির সুরে সুরে ॥
যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে সেই বাঁশিটির সুরে সুরে॥
যে পথ সকল দেশ পারায়ে উদাস হয়ে যায় হারায়ে
সে পথ বেয়ে কাঙাল পরান যেতে চায় কোন্ অচিনপুরে ॥
দেওয়া নেওয়া ফিরিয়ে-দেওয়া তোমায় আমায়
দেওয়া নেওয়া ফিরিয়ে-দেওয়া তোমায় আমায়–
জনম জনম এই চলেছে, মরণ কভু তারে থামায়?।
যখন তোমার গানে আমি জাগি আকাশে চাই তোমার লাগি,
আবার একতারাতে আমার গানে মাটির পানে তোমায় নামায় ॥
ওগো, তোমার সোনার আলোর ধারা, তার ধারি ধার–
আমার কালো মাটির ফুল ফুটিয়ে শোধ করি তার।
আমার শরৎরাতের শেফালিবন সৌরভেতে মাতে যখন
তখন পালটা সে তান লাগে তব শ্রাবণ-রাতের প্রেম-বরিষায় ॥
দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে
দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে,
আপন জেনে আদর করি নে।
পিতা বলে প্রণাম করি পায়ে,
বন্ধু বলে দু-হাত ধরি নে।
আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে
আমার হয়ে এলে যেথায় নেমে
সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধরে সঙ্গী বলে তোমায় বরি নে॥
ভাই তুমি যে ভায়ের মাঝে প্রভু,
তাদের পানে তাকাই না যে তবু,
ভাইয়ের সাথে ভাগ ক’রে মোর ধন তোমার মুঠা কেন ভরি নে।
ছুটে এসে সবার সুখে দুখে
দাঁড়াই নে তো তোমারি সম্মুখে,
সঁপিয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে প্রাণসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ি নে॥
দেবাধিদেব মহাদেব
দেবাধিদেব মহাদেব !
অসীম সম্পদ, অসীম মহিমা॥
মহাসভা তব অনন্ত আকাশে।
কোটি কণ্ঠ গাহে জয় জয় জয় হে॥
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে।
নইলে কি আর পারব তোমার চরণ ছুঁতে॥
তোমায় দিতে পূজার ডালি বেড়িয়ে পড়ে সকল কালি,
পরান আমার পারি নে তাই পায়ে থুতে॥
এতদিন তো ছিল না মোর কোনো ব্যথা,
সর্ব অঙ্গে মাখা ছিল মলিনতা।
আজ ওই শুভ্র কোলের তরে ব্যাকুল হৃদয় কেঁদে মরে–
দিয়ো না গো, দিয়ো না আর ধুলায় শুতে॥
ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়
ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়,
তবু জান, মন তোমারে চায়।
অন্তরে আছ হে অন্তর্যামী,
আমা চেয়ে আমায় জানিছ স্বামী–
সব সুখে দুখে ভুলে থাকায়
জান, মম মন তোমারে চায়।
ছাড়িতে পারি নি অহংকারে,
ঘুরে মরি শিরে বহিয়া তারে,
ছাড়িতে পারিলে বাঁচি যে হায়–
তুমি জান, মন তোমারে চায়।
যা আছে আমার সকলি কবে
নিজ হাতে তুমি তুলিয়া লবে।
সব ছেড়ে সব পাব তোমায়,
মনে মনে মন তোমারে চায়।
ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।
যায় যেন মোর সকল গভীর আশা
প্রভু, তোমার কানে, তোমার কানে, তোমার কানে।
চিত্ত মম যখন যেথায় থাকে,
সাড়া যেন দেয় সে তোমার ডাকে,
যত বাধা সব টুটে যায় যেন
প্রভু, তোমার টানে, তোমার টানে, তোমার টানে।
বাহিরের এই ভিক্ষাভরা থালি
এবার যেন নি:শেষে হয় খালি,
অন্তর মোর গোপনে যায় ভরে
প্রভু, তোমার দানে, তোমার দানে, তোমার দানে।
হে বন্ধু মোর, হে অন্তরতর,
এ জীবনে যা-কিছু সুন্দর
সকলি আজ বেজে উঠুক সুরে
প্রভু, তোমার গানে, তোমার গানে, তোমার গানে।
ধীরে বন্ধু ধীরে ধীরে
ধীরে বন্ধু ধীরে ধীরে
চলো তোমার বিজন মন্দিরে।
জানি নে পথ, নাই যে আলো,
ভিতর বাহির কালোয় কালো,
তোমার চরণশব্দ বরণ করেছি
আজ এই অরণ্যগভীরে।
ধীরে বন্ধু ধীরে ধীরে।
চলো অন্ধকারের তীরে তীরে।
চলব আমি নিশীথরাতে
তোমার হাওয়ার ইশারাতে,
তোমার বসনগন্ধ বরণ করেছি
আজ এই বসন্তসমীরে॥
ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে
ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে,
দিকে দিগন্তরে ভুবনমন্দিরে শান্তিসঙ্গীত বাজে ॥
হেরো গো অন্তরে অরূপসুন্দরে, নিখিল সংসারে পরমবন্ধুরে,
এসো আনন্দিত মিলন-অঙ্গনে শোভন মঙ্গল সাজে ॥
কলুষ কল্মষ বিরোধ বিদ্বেষ হউক নির্মল, হউক নিঃশেষ–
চিত্তে হোক যত বিঘ্ন অপগত নিত্য কল্যাণকাজে।
স্বর তরঙ্গিয়া গাও বিহঙ্গম, পূর্বপশ্চিমবন্ধুসঙ্গম–
মৈত্রীবন্ধনপুণ্যমন্ত্র-পবিত্র বিশ্বসমাজে ॥
নদীপারের এই আষাঢ়ের প্রভাতখানি
নদীপারের এই আষাঢ়ের প্রভাতখানি
নে রে, ও মন, নে রে আপন প্রাণে টানি।
সবুজ-নীলে সোনায় মিলে যে সুধা এই ছড়িয়ে দিলে,
জাগিয়ে দিলে আকাশতলে গভীর বাণী,
নে রে, ও মন, নে রে আপন প্রাণে টানি॥
এমনি করে চলতে পথে ভবের কূলে
দুই ধারে যা ফুল ফুটে সব নিস রে তুলে।
সেগুলি তোর চেতনাতে গেঁথে তুলিস দিবস-রাতে,
দিনে দিনে আলোর মালা ভাগ্য মানি–
নে রে, ও মন, নে রে আপন প্রাণে টানি॥
নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে
নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে ॥
উৎসারিত নব জীবননির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি,
অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে ॥
নমি নমি চরণে
নমি নমি চরণে,
নমি কলুষহরণে॥
সুধারসনির্ঝর হে,
নমি নমি চরণে।
নমি চিরনির্ভর হে
মোহগহনতরণে॥
নমি চিরমঙ্গল হে,
নমি চিরসম্বল হে।
উদিল তপন, গেল রাত্রি,
নমি নমি চরণে।
জাগিল অমৃতপথযাত্রী–
নমি চিরপথসঙ্গী,
নমি নিখিলশরণে॥
নমি সুখে দুঃখে ভয়ে,
নমি জয়পরাজয়ে।
অসীম বিশ্বতলে
নমি নমি চরণে।
নমি চিতকমলদলে
নিবিড় নিভৃত নিলয়ে,
নমি জীবনে মরণে॥
