দিন ফুরালো হে সংসারী
দিন ফুরালো হে সংসারী,
ডাকো তাঁরে ডাকো যিনি শ্রান্তিহারী॥
ভোলো সব ভবভাবনা,
হৃদয়ে লহো হে শান্তিবারি॥
দিন যদি হল অবসান
দিন যদি হল অবসান
নিখিলের অন্তরমন্দিরপ্রাঙ্গণে
ওই তব এল আহ্বান॥
চেয়ে দেখো মঙ্গলরাতি জ্বালি দিল উৎসববাতি,
স্তব্ধ এ সংসারপ্রান্তে ধরো ধরো তব বন্দনগান॥
কর্মের-কলরব-ক্লান্ত,
করো তব অন্তর শান্ত।
চিত্ত-আসন দাও মেলে, নাই যদি দর্শন পেলে
আঁধারে মিলিবে তাঁর স্পর্শ–
হর্ষে জাগায়ে দিবে প্রাণ॥
দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে
দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে–
গানের পরশ প্রাণে এল, আপনি তুমি রইলে দূরে॥
শুধাই যত পথের লোকে ‘এই বাঁশিটি বাজালো কে’–
নানান নামে ভোলায় তারা, নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে॥
এখন আকাশ ম্লান হল, ক্লান্ত দিবা চক্ষু বোজে–
পথে পথে ফেরাও যদি মরব তবে মিথ্যা খোঁজে।
বাহির ছেড়ে ভিতরেতে আপনি লহো আসন পেতে–
তোমার বাঁশি বাজাও আসি
আমার প্রাণের অন্তঃপুরে॥
দীর্ঘ জীবনপথ, কত দুঃখতাপ, কত শোকদহন
দীর্ঘ জীবনপথ, কত দুঃখতাপ, কত শোকদহন–
গেয়ে চলি তবু তাঁর করুণার গান ॥
খুলে রেখেছেন তাঁর অমৃতভবনদ্বার–
শ্রান্তি ঘুচিবে, অশ্রু মুছিবে, এ পথের হবে অবসান ॥
অনন্তের পানে চাহি আনন্দের গান গাহি–
ক্ষুদ্র শোকতাপ নাহি নাহি রে।
অনন্ত আলয় যার কিসের ভাবনা তার–
নিমেষের তুচ্ছ ভারে হব না রে ম্রিয়মাণ ॥
দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে
দহন করে মারতে হবে।
জ্বলতে দে তোর আগুনটারে,
ভয় কিছু না করিস তারে,
ছাই হয়ে সে নিভবে যখন
জ্বলবে না আর কভু তবে।
এড়িয়ে তাঁরে পালাস না রে
ধরা দিতে হোস না কাতর।
দীর্ঘ পথে ছুটে কেবল
দীর্ঘ করিস দুঃখটা তোর
মরতে মরতে মরণটারে
শেষ করে দে একেবারে,
তার পরে সেই জীবন এসে
আপন আসন আপনি লবে।
দুঃখ যে তোর নয় রে চিরন্তন
দুঃখ যে তোর নয় রে চিরন্তন–
পার আছে রে এই সাগরের বিপুল ক্রন্দন॥
এই জীবনের ব্যথা যত এইখানে সব হবে গত,
চিরপ্রাণের আলয়-মাঝে অনন্ত সান্ত্বন॥
মরণ যে তোর নয় রে চিরন্তন–
দুয়ার তাহার পেরিয়ে যাবি, ছিঁড়বে রে বন্ধন।
এ বেলা তোর যদি ঝড়ে পূজার কুসুম ঝ’রে পড়ে,
যাবার বেলায় ভরবে থালায় মালা ও চন্দন॥
দুঃখরাতে, হে নাথ, কে ডাকিলে
দুঃখরাতে, হে নাথ, কে ডাকিলে–
জাগি হেরিনু তব প্রেমমুখছবি ॥
হেরিনু উষালোকে বিশ্ব তব কোলে,
জাগে তব নয়নে প্রাতে শুভ্র রবি ॥
শুনিনু বনে উপবনে আনন্দগাথা,
আশা হৃদয়ে বহি নিত্য গাহে কবি ॥
দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক
দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক
তবে তাই হোক।
মৃত্যু যদি কাছে আনে তোমার অমৃতময় লোক
তবে তাই হোক ॥
পূজার প্রদীপে তব জ্বলে যদি মম দীপ্ত শোক
তবে তাই হোক।
অশ্রু-আঁখি- ‘পরে যদি ফুটে ওঠে তব স্নেহচোখ
তবে তাই হোক ॥
দুঃখের বরষায় চক্ষের জল যেই নামল
দুঃখের বরষায় চক্ষের জল যেই নামল
বক্ষের দরজায় বন্ধুর রথ সেই থামল ॥
মিলনের পাত্রটি পূর্ণ যে বিচ্ছেদ -বেদনায়;
অর্পিনু হাতে তার, খেদ নাই আর মোর খেদ নাই ॥
বহুদিনবঞ্চিত অন্তরে সঞ্চিত কী আশা,
চক্ষের নিমেষেই মিটল সে পরশের তিয়াষা।
এত দিনে জানলেম যে কাঁদন কাঁদলেম সে কাহার জন্য।
ধন্য এ জাগরণ, ধন্য এ ক্রন্দন, ধন্য রে ধন্য ॥
দুখ দিয়েছ, দিয়েছ ক্ষতি নাই
দুখ দিয়েছ, দিয়েছ ক্ষতি নাই, কেন গো একেলা ফেলে রাখ?
ডেকে নিলে ছিল যারা কাছে, তুমি তবে কাছে কাছে থাকো ॥
প্রাণ কারো সাড়া নাহি পায়, রবি শশী দেখা নাহি যায়,
এ পথে চলে যে অসহায়– তারে তুমি ডাকো, প্রভু, ডাকো ॥
সংসারের আলো নিভাইলে, বিষাদের আঁধার ঘনায়–
দেখাও তোমার বাতায়নে চির-আলো জ্বলিছে কোথায়।
শুষ্ক নির্ঝরের ধারে রই, পিপাসিত প্রাণ কাঁদে ওই–
অসীম প্রেমের উৎস কই, আমারে তৃষিত রেখো নাকো ॥
কে আমার আত্মীয় স্বজন– আজ আসে, কাল চলে যায়।
চরাচর ঘুরিছে কেবল– জগতের বিশ্রাম কোথায়।
সবাই আপনা নিয়ে রয় কে কাহারে দিবে গো আশ্রয়–
সংসারের নিরাশ্রয় জনে তোমার স্নেহেতে, নাথ, ঢাকো ॥
দুখের বেশে এসেছ ব’লে তোমারে নাহি ডরিব হে
দুখের বেশে এসেছ ব’লে তোমারে নাহি ডরিব হে।
যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় ক’রে ধরিব হে ॥
আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, তোমারে তবু চিনিব আমি–
মরণরূপে আসিলে প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে।
যেমন করে দাও-না দেখা তোমারে নাহি ডরিব হে ॥
নয়নে আজি ঝরিছে জল, ঝরুক জল নয়নে হে।
বাজিছে বুকে বাজুক তব কঠিন বাহু-বাঁধনে হে।
তুমি যে আছ বক্ষে ধরে বেদনা তাহা জানাক মোরে–
চাব না কিছু, কব না কথা, চাহিয়া রব বদনে হে ॥
দুয়ারে দাও মোরে রাখিয়া
দুয়ারে দাও মোরে রাখিয়া নিত্য কল্যাণ-কাজে হে।
ফিরিব আহ্বান মানিয়া তোমারি রাজ্যের মাঝে হে ॥
মজিয়া অনুখন লালসে রব না পড়িয়া আলসে,
হয়েছ জর্জর জীবন ব্যর্থ দিবসের লাজে হে ॥
আমারে রহে যেন না ঘিরি সতত বহুতর সংশয়ে,
বিবিধ পথে যেন না ফিরি বহুল-সংগ্রহ-আশয়ে।
অনেক নৃপতির শাসনে না রহি শঙ্কিত আসনে,
ফিরিব নির্ভয়গৌরবে তোমারি ভৃত্যের সাজে হে ॥
