তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে আলোয় আকাশ ভরা
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে আলোয় আকাশ ভরা।
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে ফুল্ল শ্যামল ধরা ॥
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে
রাত্রি জাগে জগৎ লয়ে কোলে,
উষা এসে পূর্বদুয়ার খোলে কলকণ্ঠস্বরা ॥
চলছে ভেসে মিলন-আশা-তরী অনাদিস্রোত বেয়ে।
কত কালের কুসুম উঠে ভরি বরণডালি ছেয়ে।
তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে
যুগে যুগে বিশ্বভুবনতলে
পরান আমার বধূর বেশে চলে চিরস্বয়ম্বরা ॥
তোমায় কিছু দেব ব’লে চায় যে আমার মন
তোমায় কিছু দেব ব’লে চায় যে আমার মন,
নাই-বা তোমার থাকল প্রয়োজন ॥
যখন তোমার পেলেম দেখা, অন্ধকারে একা একা
ফিরতেছিলে বিজন গভীর বন।
ইচ্ছা ছিল একটি বাতি জ্বালাই তোমার পথে,
নাই-বা তোমার থাকল প্রয়োজন ॥
দেখেছিলেম হাটের লোকে তোমারে দেয় গালি,
গায়ে তোমার ছড়ায় ধুলাবালি।
অপমানের পথের মাঝে তোমার বীণা নিত্য বাজে
আপন-সুরে-আপনি-নিমগন।
ইচ্ছা ছিল বরণমালা পরাই তোমার গলে,
নাই-বা তোমার থাকল প্রয়োজন ॥
দলে দলে আসে লোকে, রচে তোমার স্তব–
নানা ভাষায় নানান কলরব।
ভিক্ষা লাগি তোমার দ্বারে আঘাত করে বারে বারে
কত-যে শাপ, কত-যে ক্রন্দন।
ইচ্ছা ছিল বিনা পণে আপনাকে দিই পায়ে,
নাই-বা তোমার থাকল প্রয়োজন ॥
তোমায় চেয়ে আছি বসে পথের ধারে সুন্দর হে
তোমায় চেয়ে আছি বসে পথের ধারে সুন্দর হে।
জমল ধুলা প্রাণের বীণার তারে তারে সুন্দর হে॥
নাই যে কুসুম, মালা গাঁথব কিসে ! কান্নার গান বীণায় এনেছি যে,
দূর হতে তাই শুনতে পাবে অন্ধকারে সুন্দর হে॥
দিনের পরে দিন কেটে যায় সুন্দর হে।
মরে হৃদয় কোন্ পিপাসায় সুন্দর হে।
শূন্য ঘাটে আমি কী-যে করি– রঙিন পালে কবে আসবে তরী,
পাড়ি দেব কবে সুধারসের পারাবারে সুন্দর হে॥
তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে
তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে,
তারে বাঁধনে রাখিলি বাঁধি।
হায় আলোর পিয়াসি সে যে
তাই গুমরি উঠিছে কাঁদি ॥
যদি বাতাসে বহিল প্রাণ
কেন বীণায় বাজে না গান,
যদি গগনে জাগিল আলো
কেন নয়নে লাগিল আঁধি?।
পাখি নবপ্রভাতের বাণী
দিল কাননে কাননে আনি,
ফুলে নবজীবনের আশা
কত রঙে রঙে পায় ভাষা।
হোথা ফুরায়ে গিয়েছে রাতি,
হেথা জ্বলে নিশীথের বাতি–
তোর ভবনে ভুবনে কেন
হেন হয়ে গেল আধা-আধি?।
তোর শিকল আমায় বিকল করবে না
তোর শিকল আমায় বিকল করবে না।
তোর মারে মরম মরবে না ॥
তাঁর আপন হাতের ছাড়চিঠি সেই যে
আমার মনের ভিতর রয়েছে এই যে,
তোদের ধরা আমায় ধরবে না ॥
যে পথ দিয়ে আমার চলাচল
তোর প্রহরী তার খোঁজ পাবে কি বল্।
আমি তাঁর দুয়ারে পৌঁছে গেছি রে,
মোরে তোর দুয়ারে ঠেকাবে কি রে?
তোর ডরে পরান ডরবে না ॥
তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি
তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি,
ওই যে আসে, আসে, আসে।
যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী
সে যে আসে, আসে, আসে।
গেয়েছি গান যখন যত আপন-মনে খ্যাপার মতো
সকল সুরে বেজেছে তার আগমনী–
সে যে আসে, আসে, আসে॥
কত কালের ফাগুন-দিনে বনের পথে
সে যে আসে, আসে, আসে।
কত শ্রাবণ অন্ধকারে মেঘের রথে
সে যে আসে, আসে, আসে।
দুখের পরে পরম দুখে, তারি চরণ বাজে বুকে,
সুখে কখন বুলিয়ে সে দেয় পরশমণি।
সে যে আসে, আসে, আসে॥
দাঁড়াও মন, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড-মাঝে আনন্দসভাভবনে আজ
দাঁড়াও মন, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড-মাঝে আনন্দসভাভবনে আজ ॥
বিপুলমহিমাময়, গগনে মহাসনে বিরাজ করে বিশ্বরাজ ॥
সিন্ধু শৈল তটিনী মহারণ্য জলধরমালা
তপন চন্দ্র তারা গভীর মন্দ্রে গাহিছে শুন গান।
এই বিশ্বমহোৎসব দেখি মগন হল সুখে কবিচিত্ত,
ভুলি গেল সব কাজ ॥
দাঁড়াও আমার আঁখির আগে
দাঁড়াও আমার আঁখির আগে।
তোমার দৃষ্টি হৃদয়ে লাগে॥
সমুখ-আকাশে চরাচরলোকে এই অপরূপ আকুল আলোকে দাঁড়াও হে,
আমার পরান পলকে পলকে চোখে চোখে তব দরশ মাগে ॥
এই-যে ধরণী চেয়ে ব’সে আছে ইহার মাধুরী বাড়াও হে।
ধুলায় বিছানো শ্যাম অঞ্চলে দাঁড়াও হে নাথ, দাঁড়াও হে।
যাহা-কিছু আছে সকলই ঝাঁপিয়া, ভুবন ছাপিয়া, জীবন ব্যাপিয়া দাঁড়াও হে।
দাঁড়াও যেখানে বিরহী এ হিয়া তোমারি লাগিয়া একেলা জাগে ॥
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে–
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে ॥
বাতাস বহে মরি মরি, আর বেঁধে রেখো না তরী–
এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয়মাঝারে ॥
তোমার সাথে গানের খেলা দূরের খেলা যে,
বেদনাতে বাঁশি বাজায় সকল বেলা যে।
কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি
আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে ॥
দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও
দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও।
আমার দিকে ও মুখ ফিরাও॥
কাছে থেকে চিনতে নারি, কোন্ দিকে যে কী নেহারি,
তুমি আমার হৃদ্বিহারী হৃদয়পানে হাসিয়া চাও॥
বলো আমায় বলো কথা, গায়ে আমার পরশ করো।
দক্ষিণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমায় তুমি তুলে ধরো।
যা বুঝি সব ভুল বুঝি হে, যা খুঁজি সব ভুল খুঁজি হে–
হাসি মিছে,কান্না মিছে, সামনে এসে এ ভুল ঘুচাও॥
দিন অবসান হল
দিন অবসান হল।
আমার আঁখি হতে অস্তরবির আলোর আড়াল তোলো॥
অন্ধকারের বুকের কাছে নিত্য-আলোর আসন আছে,
সেথায় তোমার দুয়ারখানি খোলো॥
সব কথা সব কথার শেষে এক হয়ে যাক মিলিয়ে এসে।
স্তব্ধ বাণীর হৃদয়-মাঝে গভীর বাণী আপনি বাজে,
সেই বাণীটি আমার কানে বোলো॥
