তোমার হাতের অরুণলেখা পাবার লাগি রাতারাতি
তোমার হাতের অরুণলেখা পাবার লাগি রাতারাতি
স্তব্ধ আকাশ জাগে একা পুবের পানে বক্ষ পাতি॥
তোমার রঙিন তুলির পাকে নামাবলীর আঁকন আঁকে,
তাই নিয়ে তো ফুলের বনে হাওয়ায় হাওয়ায় মাতামাতি॥
এই কামনা রইল মনে–গোপনে আজ তোমায় কব
পড়বে আঁকা মোর জীবনে রেখায় রেখায় আখর তব।
দিনের শেষে আমায় যবে বিদায় নিয়ে যেতেই হবে
তোমার হাতের লিখনমালা
সুরের সুতোয় যাব গাঁথি॥
তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে
তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে
সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে ॥
তোমার আশিস আমার কাজে সফল হবে বিশ্ব-মাঝে,
জ্বলবে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে ॥
কর্ম করি যে হাত লয়ে কর্মবাঁধন তারে বাঁধে।
ফলের আশা শিকল হয়ে জড়িয়ে ধরে জটিল ফাঁদে।
তোমার রাখী বাঁধো আঁটি– সকল বাঁধন যাবে কাটি,
কর্ম তখন বীণার মতন বাজবে মধুর মূর্ছনাতে ॥
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে
মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন্ ক্ষণে ॥
রবি ওই অস্তে নামে শৈলতলে,
বলাকা কোন্ গগনে উড়ে চলে–
আমি এই করুণ ধারার কলকলে
নীরবে কান পেতে রই আনমনে
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে ॥
দিনে মোর যা প্রয়োজন বেড়াই তারি খোঁজ করে,
মেটে বা নাই মেটে তা ভাবব না আর তার তরে
সারাদিন অনেক ঘুরে দিনের শেষে
এসেছি সকল চাওয়ার বাহির-দেশে,
নেব আজ অসীম ধারার তীরে এসে
প্রয়োজন ছাপিয়ে যা দাও সেই ধনে
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে ॥
তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ করুণাময় স্বামী
তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ করুণাময় স্বামী।
তোমারি প্রেম স্মরণে রাখি, চরণে রাখি আশা–
দাও দুঃখ, দাও তাপ, সকলই সহিব আমি ॥
তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে, জেনেও না জানি।
ওই মঙ্গলরূপ ভুলি, তাই শোকসাগরে নামি ॥
আনন্দময় তোমার বিশ্ব শোভাসুখপূর্ণ,
আমি আপন দোষে দুঃখ পাই বাসনা-অনুগামী ॥
মোহবন্ধ ছিন্ন করো কঠিন আঘাতে,
অশ্রুসলিলধৌত হৃদয়ে থাকো দিবসযামী।
তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে
তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে।
আমার প্রাণ তোমারি দান, তুমি ধন্য ধন্য হে ॥
পিতার বক্ষে রেখেছ মোরে, জনম দিয়েছ জননীক্রোড়ে,
বেধেছ সখার প্রণয়ডোরে, তুমি ধন্য ধন্য হে ॥
তোমার বিশাল বিপুল ভুবন করেছ আমার নয়নলোভন–
নদী গিরি বন সরসশোভন, তুমি ধন্য ধন্য হে ॥
হৃদয়ে-বাহিরে স্বদেশে-বিদেশে যুগে-যুগান্তে নিমেষে-নিমেষে
জনমে-মরণে শোকে-আনন্দে তুমি ধন্য ধন্য হে ॥
তোমারি নাম বলব নানা ছলে
তোমারি নাম বলব নানা ছলে,
বলব একা বসে আপন মনের ছায়াতলে ॥
বলব বিনা ভাষায়, বলব বিনা আশায়,
বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জলে ॥
বিনা প্রয়োজনের ডাকে ডাকব তোমার নাম,
সেই ডাকে মোর শুধু শুধুই পূরবে মনস্কাম।
শিশু যেমন মাকে নামের নেশায় ডাকে,
বলতে পারে এই সুখেতেই মায়ের নাম সে বলে ॥
মারি নামে নয়ন মেলিনু পুণ্যপ্রভাতে আজি
তোমারি নামে নয়ন মেলিনু পুণ্যপ্রভাতে আজি,
তোমারি নামে খুলিল হৃদয়শতদলদলরাজি॥
তোমারি নামে নিবিড় তিমিরে ফুটিল কনকলেখা,
তোমারি নামে উঠিল গগনে কিরণবীণা বাজি।
তোমারি নামে পূর্বতোরণে খুলিল সিংহদ্বার,
বাহিরিল রবি নবীন আলোকে দীপ্ত মুকুট মাজি।
তোমারি নামে জীবনসাগরে জাগিল লহরীলীলা,
তোমারি নামে নিখিল ভুবন বাহিরে আসিল সাজি॥
তোমারি মধুর রূপে ভরেছ ভুবন
তোমারি মধুর রূপে ভরেছ ভুবন–
মুগ্ধ নয়ন মম, পুলকিত মোহিত মন॥
তরুণ অরুণ নবীনভাতি, পূর্ণিমাপ্রসন্ন রাতি,
রূপরাশি-বিকশিত-তনু কুসুমবন॥
তোমা-পানে চাহি সকলে সুন্দর,
রূপ হেরি আকুল অন্তর।
তোমারে ঘেরিয়া ফিরে নিরন্তর তোমার প্রেম চাহি।
উঠে সঙ্গীত তোমার পানে, গগন পূর্ণ প্রেমগানে,
তোমার চরণ করেছে বরণ নিখিলজন॥
তোমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে
তোমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে বাজে যেন সদা বাজে গো।
তোমারি আসন হৃদয়পদ্মে রাজে যেন সদা রাজে গো ॥
তব নন্দনগন্ধমোদিত ফিরি সুন্দর ভুবনে
তব পদরেণু মাখি লয়ে তনু সাজে যেন সদা সাজে গো ॥
সব বিদ্বেষ দূরে যায় যেন তব মঙ্গলমন্ত্রে,
বিকাশে মাধুরী হৃদয়ে বাহিরে তব সঙ্গীতছন্দে।
তব নির্মল নীরব হাস্য হেরি অম্বর ব্যাপিয়া
তব গৌরবে সকল গর্ব লাজে যেন সদা লাজে গো ॥
তোমারি সেবক করো হে আজি হতে আমারে
তোমারি সেবক করো হে আজি হতে আমারে।
চিত্ত-মাঝে দিবারাত আদেশ তব দেহো নাথ,
তোমার কর্মে রাখো বিশ্বদুয়ারে ॥
করো ছিন্ন মোহপাশ সকল লুব্ধ আশ,
লোকভয়, দূর করি দাও দাও।
রত রাখো কল্যাণে নীরবে নিরভিমানে,
মগ্ন করো আনন্দরসধারে ॥
তোমায় নতুন করেই পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ
তোমায় নতুন করেই পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ
ও মোর ভালোবাসার ধন।
দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন,
ও মোর ভালোবাসার ধন॥
ওগো তুমি আমার নও আড়ালের, তুমি আমার চিরকালের–
ক্ষণকালের লীলার স্রোতে হও যে নিমগন,
ও মোর ভালোবাসার ধন॥
আমি তোমায় যখন খুঁজে ফিরি ভয়ে কাঁপে মন–
প্রেমে আমার ঢেউ লাগে তখন।
তোমার শেষ নাহি, তাই শূন্য সেজে শেষ করে দাও আপনাকে যে,
ওই হাসিরে দেয় ধুয়ে মোর বিরহের রোদন,
ও মোর ভালোবাসার ধন॥
