তোমার দেখা পাব ব’লে এসেছি-যে সখা
তোমার দেখা পাব ব’লে এসেছি-যে সখা!
শুন প্রিয়তম হে, কোথা আছ লুকাইয়ে–
তব গোপন বিজন গৃহে লয়ে যাও ॥
দেহো গো সরায়ে তপন তারকা,
আবরণ সব দূর করো হে, মোচন করো তিমির–
জগত-আড়ালে থেকো না বিরলে,
লুকায়ো না আপনারি মহিমা-মাঝে–
তোমার গৃহের দ্বার খুলে দাও ॥
তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলেই যে যাই
তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলেই যে যাই, কতই কী চাই–
দিনের শেষে ঘরে এসে লজ্জা যে পাই ॥
সে-সব চাওয়া সুখে দুখে ভেসে বেড়ায় কেবল মুখে,
গভীর বুকে
যে চাওয়াটি গোপন তাহার কথা যে নাই ॥
বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে–
ফেটে যাবে, ঝরে যাবে দখিন-বায়ে।
একটি চাওয়া ভিতর হতে ফুটবে তোমার ভোর-আলোতে
প্রাণের স্রোতে–
অন্তরে সেই গভীর আশা বয়ে বেড়াই ॥
তোমার নয়ন আমায় বারে বারে
তোমার নয়ন আমায় বারে বারে বলেছে গান গাহিবারে।।
ফুলে ফুলে তারায় তারায়
বলেছে সে কোন্ ইশারায়
দিবস-রাতির মাঝ-কিনারায় ধূসর আলোয় অন্ধকারে।
গাই নে কেন কী কব তা,
কেন আমার আকুলতা–
ব্যথার মাঝে লুকায় কথা, সুর যে হারাই অকূল পারে।।
যেতে যেতে গভীর স্রোতে ডাক দিয়েছ তরী হতে।
ডাক দিয়েছ ঝড়-তুফানে
বোবা মেঘের বজ্রগানে,
ডাক দিয়েছ মরণপানে শ্রাবণরাতের উতল ধারে।
যাই নে কেন জান না কি–
তোমার পানে মেলে আঁখি
কূলের ঘাটে বসে থাকি, পথ কোথা পাই পারাবারে।।
তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি
তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।
তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভকতি ॥
আমি তাই চাই ভরিয়া পরান দুঃখের সাথে দুঃখের ত্রাণ,
তোমার হাতের বেদনার দান এড়ায়ে চাহি না মুকতি।
দুখ হবে মম মাথার ভূষণ সাথে যদি দাও ভকতি ॥
যত দিতে চাও কাজ দিয়ো যদি তোমারে না দাও ভুলিতে,
অন্তর যদি জড়াতে না দাও জালজঞ্জালগুলিতে।
বাঁধিয়ো আমায় যত খুশি ডোরে মুক্ত রাখিয়ো তোমা-পানে মোরে,
ধুলায় রাখিয়ো পবিত্র ক’রে তোমার চরণধূলিতে–
ভুলায়ে রাখিয়ো সংসারতলে, তোমারে দিয়ো না ভুলিতে ॥
যে পথে ঘুরিতে দিয়েছ ঘুরিব– যাই যেন তব চরণে,
সব শ্রম যেন বহি লয় মোরে সকলশ্রান্তিহরণে।
দুর্গম পথ এ ভবগহন, কত ত্যাগ শোক বিরহদহন–
জীবনে মৃত্যু করিয়া বহন প্রাণ পাই যেন মরণে–
সন্ধ্যাবেলায় লভি গো কুলায় নিখিলশরণ চরণে ॥
তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি
তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।
বুঝতে নারি কখন্ তুমি দাও-যে ফাঁকি ॥
ফুলের মালা দীপের আলো ধূপের ধোঁওয়ার
পিছন হতে পাই নে সুযোগ চরণ-ছোঁওয়ার,
স্তবের বাণীর আড়াল টানি তোমায় ঢাকি ॥
দেখব ব’লে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি,
আছে তো মোর তৃষা-কাতর আপন আঁখি।
কাজ কী আমার মন্দিরেতে আনাগোনায়–
পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়,
সরল প্রাণে নীরব হয়ে তোমায় ডাকি ॥
তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে
তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে সত্য ক’রে পায় সে আপনারে ॥
দুঃখে শোকে নিন্দা-পরিবাদে
চিত্ত তার ডোবে না অবসাদে,
টুটে না বল সংসারের ভারে ॥
পথে যে তার গৃহের বাণী বাজে, বিরাম জাগে কঠিন তার কাজে।
নিজেরে সে যে তোমারি মাঝে দেখে,
জীবন তার বাধায় নাহি ঠেকে,
দৃষ্টি তার আঁধার-পরপারে ॥
তোমার বীণা আমার মনোমাঝে
তোমার বীণা আমার মনোমাঝে
কখনো শুনি, কখনো ভুলি, কখনো শুনি না যে॥
আকাশ যবে শিহরি উঠে গানে
গোপন কথা কহিতে থাকে ধরার কানে কানে—
তাহার মাঝে সহসা মাতে বিষম কোলাহলে
আমার মনে বাঁধনহারা স্বপন দলে দলে।
হে বীণাপাণি, তোমার সভাতলে
আকুল হিয়া উন্মাদিয়া বেসুর হয়ে বাজে॥
চলিতেছিনু তব কমলবনে,
পথের মাঝে ভুলালো পথ উতলা সমীরণে।
তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে,
তোমার সুর অশোকশাখে অরুণরেণুরাগে।
সে সুর বাহি চলিতে চাহি আপন-ভোলা মনে
গুঞ্জরিত-ত্বরিত-পাখা মধুকরের সনে।
কুহেলী কেন জড়ায় আবরণে—
আঁধারে আলো আবিল করে, আঁখি যে মরে লাজে॥
তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে
তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে
দেবে কি গো বাসা আমায় একটি ধারে?।
আমি শুনব ধ্বনি কানে,
আমি ভরব ধ্বনি প্রানে,
সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে॥
আমার নীরব বেলা সেই তোমারি সুরে সুরে
ফুলের ভিতর মধুর মতো উঠবে পুরে।
আমার দিন ফুরাবে যবে,
যখন রাত্রি আঁধার হবে,
হৃদয়ে মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে॥
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার।
জননী গো, গাঁথব তোমার গলার মুক্তাহার॥
চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার দুখের অলঙ্কার॥
ধন ধান্য তোমারি ধন কী করবে তা কও।
দিতে চাও তো দিয়ো আমায়, নিতে চাও তো লও।
দুঃখ আমার ঘরের জিনিস, খাঁটি রতন তুই তো চিনিস—
তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস এ মোর অহঙ্কার॥
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার।
জননী গো, গাঁথব তোমার গলার মুক্তাহার ॥
চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার দুখের অলঙ্কার ॥
ধন ধান্য তোমারি ধন কী করবে তা কও।
দিতে চাও তো দিয়ো আমায়, নিতে চাও তো লও।
দুঃখ আমার ঘরের জিনিস, খাঁটি রতন তুই তো চিনিস–
তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস এ মোর অহঙ্কার ॥
