তুমি সুন্দর, যৌবনঘন রসময় তব মূর্তি
তুমি সুন্দর, যৌবনঘন রসময় তব মূর্তি,
দৈন্যভরণ বৈভব তব অপচয়পরিপূর্তি॥
নৃত্য গীত কাব্যছন্দ কলগুঞ্জন বর্ণ গন্ধ–
মরণহীন চিরনবীন তব মহিমাস্ফুর্তি॥
তোমা লাগি, নাথ, জাগি জাগি হে
তোমা লাগি, নাথ, জাগি জাগি হে–
সুখ নাহি জীবনে তোমা বিনা ॥
সকলে চলে যায় ফেলে চিরশরণ হে–
তুমি কাছে থাকো সুখে দুখে নাথ,
পাপ তাপে আর কেহ নাহি ॥
তোমা-হীন কাটে দিবস হে প্রভু
তোমা-হীন কাটে দিবস হে প্রভু,
হায় তোমা-হীন মোর স্বপন জাগরণ–
কবে আসিবে হিয়ামাঝারে।
তোমার এই মাধুরী ছাপিয়ে আকাশ ঝরবে
তোমার এই মাধুরী ছাপিয়ে আকাশ ঝরবে,
আমার প্রাণে নইলে সে কি কোথাও ধরবে?।
এই-যে আলো সূর্য গ্রহে তারায় ঝ’রে পড়ে শতলক্ষ ধারায়,
পূর্ণ হবে এ প্রাণ যখন ভরবে ॥
তোমার ফুলে যে রঙ ঘুমের মতো লাগল
আমার মনে লেগে তবে সে যে জাগল গো।
যে প্রেম কাঁপায় বিশ্ববীণায় পুলকে সঙ্গীতে সে উঠবে ভেসে পলকে
যে দিন আমার সকল হৃদয় হরবে ॥
তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও
তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও সে ঘুম আমার রমণীয়–
জাগরণের সঙ্গিনী সে, তারে তোমার পরশ দিয়ো ॥
অন্তরে তার গভীর ক্ষুধা, গোপনে চায় আলোকসুধা,
আমার রাতের বুকে সে যে তোমার প্রাতের আপন প্রিয় ॥
তারি লাগি আকাশ রাঙা আঁধার-ভাঙা অরুণরাগে,
তারি লাগি পাখির গানে নবীন আশার আলাপ জাগে।
নীরব তোমার চরণধ্বনি শুনায় তারে আগমনী,
সন্ধ্যবেলার কুঁড়ি তারে সকালবেলায় তুলে নিয়ো ॥
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি
আমি ডুবতে রাজি আছি আমি ডুবতে রাজি আছি॥
সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো–
রেখো না আর, বেঁধো না আর কূলের কাছাকাছি॥
মাঝির লাগি আছি জাগি সকল রাত্রিবেলা,
ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।
ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে–
দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফান পেলে বাঁচি।
তোমার আনন্দ ওই এল দ্বারে
তোমার আনন্দ ওই এল দ্বারে, এল এল এল গো। ওগো পুরবাসী
বুকের আঁচলখানি ধুলায় পেতে আঙিনাতে মেলো গো ॥
পথে সেচন কোরো গন্ধবারি মলিন না হয় চরণ তারি,
তোমার সুন্দর ওই এল দ্বারে, এল এল এল গো।
আকুল হৃদয়খানি সম্মুখে তার ছড়িয়ে ফেলো ফেলো গো ॥
তোমার সকল ধন যে ধন্য হল হল গো।
বিশ্বজনের কল্যাণে আজ ঘরের দুয়ার খোলো গো।
হেরো রাঙা হল সকল গগন, চিত্ত হল পুলকমগন,
তোমার নিত্য আলো এল দ্বারে, এল এল এল গো।
তোমার পরানপ্রদীপ তুলে ধোরো, ওই আলোতে জ্বেলো গো ॥
তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই
তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই–
কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই॥
মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ,
তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই॥
হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে–
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই, নিশিদিন কাঁদি তাই।
অন্তরগ্লানি সংসারভার পলক ফেলিতে কোথা একাকার
জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই॥
তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে
তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে
কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে ॥
তবু যে পরানমাঝে গোপনে বেদনা বাজে–
এবার সেবার কাজে ডেকে লও সন্ধ্যাকালে ॥
বিশ্ব হতে থাকি দূরে অন্তরের অন্তঃপুরে,
চেতনা জড়ায়ে রহে ভাবনার স্বপ্নজালে।
দুঃখ সুখ আপনারই সে বোঝা হয়েছে ভারী,
যেন সে সঁপিতে পারি চরম পূজার থালে ॥
তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল।
সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল ॥
আপনি কেটেছে আপনার মূল– না জানে সাঁতার, নাহি পায় কূল,
স্রোতে যায় ভেসে, ডোবে বুঝি শেষে, করে দিবানিশি টলোমল ॥
আমি কোথা যাব, কাহারে শুধাব, নিয়ে যায় সবে টানিয়া।
একেলা আমারে ফেলে যাবে শেষে অকূল পাথারে আনিয়া।
সুহৃদের তরে চাই চারি ধারে, আঁখি করিতেছে ছলোছল,
আপনার ভারে মরি যে আপনি কাঁপিছে হৃদয় হীনবল ॥
তোমার কাছে এ বর মাগি
তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি
গানের সুরে॥
যেমনি নয়ন মেলি যেন মাতার স্তন্যসুধা-হেন
নবীন জীবন দেয় গো পুরে গানের সুরে॥
সেথায় তরু তৃণ যত
মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতো।
আলোক সেথা দেয় গো আনি
আকাশের আনন্দবাণী,
হৃদয়্মাঝে বেড়ায় ঘুরে গানের সুরে॥
তোমার কাছে শান্তি চাব না
তোমার কাছে শান্তি চাব না,
থাক্-না আমার দুঃখ ভাবনা ॥
অশান্তির এই দোলায় ‘পরে বোসো বোসো লীলার ভরে,
দোলা দিব এ মোর কামনা ॥
নেবে নিবুক প্রদীপ বাতাসে,
ঝড়ের কেতন উড়ুক আকাশে–
বুকের কাছে ক্ষণে ক্ষণে তোমার চরণ-পরশনে
অন্ধকারে আমার সাধনা ॥
তোমার দুয়ার খোলার ধ্বনি ওই গো বাজে হৃদয়মাঝে
তোমার দুয়ার খোলার ধ্বনি ওই গো বাজে হৃদয়মাঝে ॥
তোমার ঘরে নিশি-ভোরে আগল যদি গেল সরে
আমার ঘরে রইব তবে কিসের লাজে?।
অনেক বলা বলেছি, সে মিথ্যা বলা।
অনেক চলা চলেছি, সে মিথ্যা চলা।
আজ যেন সব পথের শেষে তোমার দ্বারে দাঁড়াই এসে–
ভুলিয়ে যেন নেয় না মোরে আপন কাজে ॥
