তুমি কি এসেছ মোর দ্বারে
তুমি কি এসেছ মোর দ্বারে
খুঁজিতে আমার আপনারে?।
তোমারি যে ডাকে
কুসুম গোপন হতে বাহিরায় নগ্ন শাখে শাখে,
সেই ডাকে ডাকো আজি তারে ॥
তোমারি সে ডাকে বাধা ভোলে,
শ্যামল গোপন প্রাণ ধূলি-অবগুণ্ঠন খোলে
সে ডাকে তোমারি
সহসা নবীন উষা আসে হাতে আলোকের ঝারি,
দেয় সাড়া ঘন অন্ধকারে ॥
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
আমি অবাক্ হয়ে শুনি কেবল শুনি॥
সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী॥
মনে করি অমনি সুরে গাই,
কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে—
হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে,
আমায় তুমি ফেলেছ কোন্ ফাঁদে
চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি॥
তুমি ছেড়ে ছিলে, ভুলে ছিলে ব’লে হেরো গো কী দশা হয়েছে
তুমি ছেড়ে ছিলে, ভুলে ছিলে ব’লে হেরো গো কী দশা হয়েছে–
মলিন বদন, মলিন হৃদয়, শোকে প্রাণ ডুবে রয়েছে ॥
বিরহীর বেশে এসেছি হেথায় জানাতে বিরহবেদনা;
দরশন নেব তবে চ’লে যাব, অনেক দিনের বাসনা ॥
“নাথ নাথ’ ব’লে ডাকিব তোমারে, চাহিব হৃদয়ে রাখিতে–
কাতর প্রাণের রোদন শুনিলে আর কি পারিবে থাকিতে?
ও অমৃতরূপ দেখিব যখন মুছিব নয়নবারি হে–
আর উঠিব না, পড়িয়া রহিব চরণতলে তোমারি হে ॥
তুমি জাগিছ কে
তুমি জাগিছ কে?
তব আঁখিজ্যোতি ভেদ করে সঘন গহন
তিমিররাতি ॥
চাহিছ হৃদয়ে অনিমেষ নয়নে,
সংশয়চপল প্রাণ কম্পিত ত্রাসে ॥
কোথা লুকাব তোমা হতে স্বামী–
এ কলঙ্কিত জীবন তুমি দেখিছ, জানিছ–
প্রভু, ক্ষমা করো হে।
তব পদপ্রান্তে বসি একান্তে দাও কাঁদিতে আমায়,
আর কোথা যাই ॥
তুমি জানো, ওগো অন্তর্যামী
তুমি জানো, ওগো অন্তর্যামী,
পথে পথেই মন ফিরালেম আমি ॥
ভাবনা আমার বাঁধল নাকো বাসা,
কেবল তাদের স্রোতের ‘পরেই ভাসা–
তবু আমার মনে আছে আশা,
তোমার পায়ে ঠেকবে তারা স্বামী ॥
টেনেছিল কতই কান্নাহাসি,
বারে বারেই ছিন্ন হল ফাঁসি।
শুধায় সবাই হতভাগ্য ব’লে,
“মাথা কোথায় রাখবি সন্ধ্যা হলে।’
জানি জানি নামবে তোমার কোলে
আপনি যেথায় পড়বে মাথা নামি ॥
তুমি ধন্য ধন্য হে, ধন্য তব প্রেম
তুমি ধন্য ধন্য হে, ধন্য তব প্রেম,
ধন্য তোমার জগতরচনা ॥
একি অমৃতরসে চন্দ্র বিকাশিলে,
এ সমীরণ পুরিলে প্রাণহিল্লোলে ॥
একি প্রেমে তুমি ফুল ফুটাইলে,
কুসুমবন ছাইলে শ্যাম পল্লবে ॥
একি গভীর বাণী শিখালে সাগরে,
কী মধুগীতি তুলিলে নদীকল্লোলে!
একি ঢালিছ সুধা, মানবহৃদয়ে,
তাই হৃদয় গাইছে প্রেম-উল্লাসে ॥
তুমি বন্ধু তুমি নাথ নিশিদিন তুমি আমার
তুমি বন্ধু, তুমি নাথ, নিশিদিন তুমি আমার।
তুমি সুখ, তুমি শান্তি, তুমি হে অমৃতপাথার ॥
তুমিই তো আনন্দলোক, জুড়াও প্রাণ, নাশো শোক,
তাপহরণ তোমার চরণ অসীমশরণ দীনজনার ॥
তুমি যত ভার দিয়েছ সে ভার করিয়া দিয়েছ সোজা
তুমি যত ভার দিয়েছ সে ভার করিয়া দিয়েছ সোজা।
আমি যত ভার জমিয়ে তুলেছি সকলই হয়েছে বোঝা।
এ বোঝা আমার নামাও বন্ধু, নামাও–
ভারের বেগেতে চলেছি কোথায়, এ যাত্রা তুমি থামাও ॥
আপনি যে দুখ ডেকে আনি সে-যে জ্বালায় বজ্রানলে–
অঙ্গার ক’রে রেখে যায়, সেথা কোনো ফল নাহি ফলে।
তুমি যাহা দাও সে-যে দুঃখের দান
শ্রাবণধারায় বেদনার রসে সার্থক করে প্রাণ ॥
যেখানে যা-কিছু পেয়েছি কেবলই সকলই করেছি জমা–
যে দেখে সে আজ মাগে-যে হিসাব, কেহ নাহি করে ক্ষমা
এ বোঝা আমার নামাও বন্ধু, নামাও–
ভারের বেগেতে ঠেলিয়া চলেছি, এ যাত্রা মোর থামাও ॥
তুমি যে চেয়ে আছ আকাশ ভ’রে
তুমি যে চেয়ে আছ আকাশ ভ’রে,
নিশিদিন অনিমেষে দেখছ মোরে ॥
আমি চোখ এই আলোকে মেলব যবে
তোমার ওই চেয়ে-দেখা সফল হবে,
এ আকাশ দিন গুনিছে তারি তরে ॥
ফাগুনের কুসুম-ফোটা হবে ফাঁকি
আমার এই একটি কুঁড়ি রইলে বাকি।
সে দিনে ধন্য হবে তারার মালা
তোমার এই লোকে লোকে প্রদীপ জ্বালা
আমার এই আঁধারটুকু ঘুচলে পরে ॥
তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি
তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি।
কেন যে মোরে কাঁদাও আমি সে জানি ॥
এ আলোকে এ আঁধারে কেন তুমি আপনারে
ছায়াখানি দিয়ে ছাও আমি সে জানি ॥
সারাদিন নানা কাজে কেন তুমি নানা সাজে
কত সুরে ডাক দাও আমি সে জানি।
সারা হলে দে’য়া-নে’য়া দিনান্তের শেষ খেয়া
কোন্ দিক-পানে বাও আমি সে জানি ॥
তুমি যে এসেছ মোর ভবনে
তুমি যে এসেছ মোর ভবনে রব উঠেছে ভুবনে ॥
নহিলে ফুলে কিসের রঙ লেগেছে, গগনে কোন্ গান জেগেছে,
কোন্ পরিমল পবনে ॥
দিয়ে দুঃখসুখের বেদনা আমায় তোমার সাধনা।
আমার ব্যাথায় ব্যথায় পা ফেলিয়া এলে তোমার সুর মেলিয়া,
এলে আমার জীবনে ॥
তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে
তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে,
এ আগুন ছড়িয়ে গেল সব খানে॥
যত সব মরা গাছের ডালে ডালে
নাচে আগুন তালে তালে রে,
আকাশে হাত তোলে সে কার পানে॥
আঁধারের তারা যত অবাক হয়ে রয় চেয়ে,
কোথাকার পাগল হাওয়া বয় ধেয়ে।
নিশীথের বুকের মাঝে এই-য়ে অমল
উঠল ফুটে স্বর্ণকমল রে,
আগুনের কী গুণ আছে কে জানে॥
