তিমিরবিভাবরী কাটে কেমনে
তিমিরবিভাবরী কাটে কেমনে
জীর্ণ ভবনে, শূন্য জীবনে–
হৃদয় শুকাইল প্রেম বিহনে ॥
গহন আঁধার কবে পুলকে পূর্ণ হবে
ওহে আনন্দময়, তোমার বীণারবে–
পশিবে পরানে তব সুগন্ধ বসন্তপবনে ॥
তুই কেবল থাকিস সরে সরে
তুই কেবল থাকিস সরে সরে,
তাই পাস নে কিছুই হৃদয় ভরে ॥
আনন্দভাণ্ডারের থেকে দূত যে তোরে গেল ডেকে–
কোণে বসে দিস নে সাড়া, সব খোয়ালি এমনি করে ॥
জীবনটাকে তোল্ জাগিয়ে,
মাঝে সবার আয় আগিয়ে।
চলিস নে পথ মেপে মেপে আপনাকে দে নিখিল ব্যেপে–
যে ক’টা দিন বাকি আছে কাটাস নে আর ঘুমের ঘোরে ॥
তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ
তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ,লহো।
এবার তুমি ফিরো না হে–
হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো।
যে দিন গেছে তোমা বিনা তারে আর ফিরে চাহি না,
যাক সে ধুলাতে।
এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে যেন জাগি অহরহ॥
কী আবেশে কিসের কথায় ফিরেছি হে যথায় তথায়
পথে প্রান্তরে,
এবার বুকের কাছে ও মুখ রেখে তোমার আপন বাণী কহো॥
কত কলুষ কত ফাঁকি এখনো যে আছে বাকি
মনের গোপনে,
আমায় তার লাগি আর ফিরায়ো না,
তারে আগুন দিয়ে দহো।
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে।
এসো গন্ধে বরনে, এসো গানে।
এসো অঙ্গে পুলকময় পরশে,
এসো চিত্তে অমৃতময় হরষে,
এসো মুগ্ধ মুদিত দু নয়ানে॥
এসো নির্মল উজ্জ্বল কান্ত,
এসো সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত,
এসো এসো হে বিচিত্র বিধানে।
এসো দু:খে সুখে, এসো মর্মে,
এসো নিত্য নিত্য সব কর্মে;
এসো সকল-কর্ম-অবসানে॥
তুমি একলা ঘরে বসে বসে কী সুর বাজালে
তুমি একলা ঘরে বসে বসে কী সুর বাজালে
প্রভু, আমার জীবনে!
তোমার পরশরতন গেঁথে গেঁথে আমায় সাজালে
প্রভু, গভীর গোপনে ॥
দিনের আলোর আড়াল টানি কোথায় ছিলে নাহি জানি,
অস্তরবির তোরণ হতে চরণ বাড়ালে
আমার রাতের স্বপনে ॥
আমার হিয়ায় হিয়ায় বাজে আকুল আঁধার যামিনী,
সে যে তোমার বাঁশরি।
আমি শুনি তোমার আকাশপারের তারার রাগিণী,
আমার সকল পাশরি।
কানে আসে আশার বাণী– খোলা পাব দুয়ারখানি
রাতের শেষে শিশির-ধোওয়া প্রথম সকালে
তোমার করুণ কিরণে ॥
তুমি খুশি থাক আমার পানে চেয়ে চেয়ে
তুমি খুশি থাক আমার পানে চেয়ে চেয়ে
তোমার আঙিনাতে বেড়াই যখন গেয়ে গেয়ে ॥
তোমার পরশ আমার মাঝে সুরে সুরে বুকে বাজে,
সেই আনন্দ নাচায় ছন্দ বিশ্বভুবন ছেয়ে ছেয়ে ॥
ফিরে ফিরে চিত্তবীণায় দাও যে নাড়া,
গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া দেয় সে সাড়া।
তোমার আঁধার তোমার আলো দুই আমারে লাগল ভালো–
আমার হাসি বেড়ায় ভাসি তোমার হাসি বেয়ে বেয়ে ॥
তুমি এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে
তুমি এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে?
আমি ঘরের দ্বারে বসে বসে দেখি যে সব চেয়ে ॥
ভাঙিলে হাট দলে দলে সবাই যাবে ঘরে চলে
আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে ॥
দেখি সন্ধ্যাবেলা ও পার-পানে তরণী যাও বেয়ে।
দেখে মন যে আমার কেমন করে, ওঠে যে গান গেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে ॥
কালো জলের কলকলে আঁখি আমার ছলছলে,
ও পার হতে সোনার আভা পরান ফেলে ছেয়ে।
দেখি তোমার মুখে কথাটি নাই ওগো খেয়ার নেয়ে–
কী যে তোমার চোখে লেখা আছে দেখি যে সব চেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে।
আমার মুখে ক্ষণতরে যদি তোমার আঁখি পড়ে
আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে ॥
তুমি ডাক দিয়েছ কোন্ সকালে কেউ তা জানে না
তুমি ডাক দিয়েছ কোন্ সকালে কেউ তা জানে না,
আমার মন যে কাঁদে আপন মনে কেউ তা মানে না ॥
ফিরি আমি উদাস প্রাণে, তাকাই সবার মুখের পানে,
তোমার মতো এমন টানে কেউ তো টানে না ॥
বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর, কেঁপে ওঠে বন্ধ এ ঘর,
বাহির হতে দুয়ারে কর কেউ তো হানে না।
আকাশে কার ব্যাকুলতা, বাতাস বহে কার বারতা,
এ পথে সেই গোপন কথা কেউ তো আনে না ॥
তুমি বাহির থেকে দিলে বিষম তাড়া
তুমি বাহির থেকে দিলে বিষম তাড়া
তাই ভয়ে ঘোরায় দিক্বিদিকে,
শেষে অন্তরে পাই সাড়া ॥
যখন হারাই বন্ধ ঘরের তালা–
যখন অন্ধ নয়ন, শ্রবণ কালা,
তখন অন্ধকারে লুকিয়ে দ্বারে
শিকলে দাও নাড়া ॥
যত দুঃখ আমার দুঃস্বপনে,
সে যে ঘুমের ঘোরেই আসে মনে–
ঠেলা দিয়ে মায়ার আবেশ
কর গো দেশছাড়া।
আমি আপন মনের মারেই মরি,
শেষে দশ জনারে দোষী করি–
আমি চোখ বুজে পথ পাই নে ব’লে
কেঁদে ভাসাই পাড়া ॥
তুমি হঠাৎ-হাওয়ায় ভেসে-আসা ধন
তুমি হঠাৎ-হাওয়ায় ভেসে-আসা ধন–
তাই হঠাৎ-পাওয়ায় চমকে ওঠে মন॥
গোপন পথে আপন-মনে বাহির হও যে কোন্ লগনে,
হঠাৎ-গন্ধে মাতাও সমীরণ॥
নিত্য যেথায় আনাগোনা হয় না সেথায় চেনাশোনা,
উড়িয়ে ধুলো আসছে কতই জন।
কখন পথের বাহির থেকে হঠাৎ বাঁশি যায় যে ডেকে,
পথহারাকে করে সচেতন॥
মি আপনি জাগাও মোরে তব সুধাপরশে
তুমি আপনি জাগাও মোরে তব সুধাপরশে–
হৃদয়নাথ, তিমিররজনী-অবসানে হেরি তোমারে ॥
ধীরে ধীরে বিকাশো হৃদয়গগনে বিমল তব মুখভাতি ॥
তুমি আমাদের পিতা
তুমি আমাদের পিতা,
তোমায় পিতা ব’লে যেন জানি,
তোমায় নত হয়ে যেন মানি,
তুমি কোরো না কোরো না রোষ।
হে পিতা, হে দেব, দূর করে দাও যত পাপ, যত দোষ–
যাহা ভালো তাই দাও আমাদের, যাহাতে তোমার তোষ।
তোমা হতে সব সুখ হে পিতা, তোমা হতে সব ভালো।
তোমাতেই সব সুখ হে পিতা, তোমাতেই সব ভালো।
তুমিই ভালো হে তুমিই ভালো সকল-ভালোর সার–
তোমারে নমস্কার হে পিতা, তোমারে নমস্কার ॥
