উপরোক্ত আলোচনা হইতে বুঝা যায় যে, জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব কমপক্ষে খ্রী. পূ. ১৭৯৩ সালে। সুতরাং জেন্দ-আভেস্তা গ্রন্থখানার বর্তমান বয়স প্রায় পৌনে চারি হাজার বৎসর।
জেন্দ-আভেস্তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —
১. উপাসনা পদ্ধতি –পারসিকগণের উপাসনার সময় একজন বিজ্ঞ ও ধার্মিক ব্যক্তি সম্মুখে দণ্ডায়মান হন, অন্যান্য সকলে তাহার পশ্চাতে শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকেন। প্রথমে তাহারা যুক্তকরে দণ্ডায়মান থাকিয়া একবার মস্তক নত করেন, পরে ভূমিলগ্ন হইয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করেন ও পুনরায় সরলভাবে দণ্ডায়মান হন।
২. ঈশ্বরের নামোচ্চারণপূর্বক কার্যারম্ভ করা। কোনো কাজের শুরুতে পারসিকগণ বলিয়া থাকেন, “বানাম বাজদ বাকসিস গারদার”।
৩. অদ্বৈত ও দ্বৈতবাদের সংমিশ্রণ। পারসিকগণ অদ্বৈতবাদ স্বীকার করেন এবং বলেন, “নেস্তেযাদ মগর যাজদান”–অর্থাৎ ঈশ্বর অদ্বিতীয়। আবার বলেন, সৎকাজের উদ্যোক্তা অহুর মজদা (পারসিকদের ঈশ্বর) এবং অসৎকাজের সৃষ্টিকর্তা আহরিমান। অর্থাৎ সৎকাজের প্রেরণাদাতা একজন এবং অসৎকাজের প্রেরণাদাতা আরেকজন। এমতাবস্থায় স্বভাবত ইহাই মনে হয় যে, হয়তো আহরিমানের কাজে বাধাদানের ক্ষমতা অহুর মজদার নাই, নতুবা তিনি ইচ্ছাপূর্বক বাধা দেন না। অর্থাৎ তিনি চক্রান্তকারী বা ভণ্ড।
৪. পরলোক সম্বন্ধে জেন্দ-আভেস্তার শিক্ষা —
ক. মৃত্যুর পর মানবদেহ দানবে অধিকার করে।
খ. মৃত্যুর পর দণ্ড ও পুরস্কার আছে।
গ. পরলোকে প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিনাভাদ নামক পুল পার হইতে হয়। পুণ্যবানগণ অনায়াসে উহা পার হইতে পারে। কিন্তু পাপীগণ দুখ নামক দুঃখার্ণবে নিপতিত হইয়া অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে।
ঘ. উপাসনা ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যস্থতায় কাহারও কাহারও দুঃখভোগের কাল হ্রাসপ্রাপ্ত হইয়া থাকে।
ঙ. এই যুগের শেষ ভাগে সওসন্ত নামক একজন মহাপুরুষ অবতীর্ণ হইবেন।
চ. ছয় দিনে জগতসৃষ্টি এবং উহার শেষদিনে মানুষসৃষ্টি। আদি মানুষটির নাম গেওমাড। ইত্যাদি।
.
# ৪. বাইবেল
পবিত্র বাইবেল গ্রন্থ ৬৬খানা ক্ষুদ্র পুস্তকের সমষ্টি এবং উহা দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগকে বলা হয় পুরাতন নিয়ম (Old Testament), ইহাতে পুস্তকের সংখ্যা ৩৯ এবং দ্বিতীয় ভাগকে বলা হয় নূতন নিয়ম (New Testament), ইহাতে পুস্তকের সংখ্যা ২৭। মুসলমানগণ যাহাকে তাউরাত (তৌরিত) ও জব্দুর কেতাব বলেন, উহা পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত এবং নূতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত ইঞ্জিল কেতাব। যাহারা পুরাতন নিয়ম মানিয়া চলেন, তাহাদিগকে বলা হয় ইহুদি এবং যাহারা নূতন নিয়ম অনুসরণ করিয়া চলেন, তাহাদিগকে বলা হয় খ্রীস্টিয়ান। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই উক্ত গ্রন্থাবলীকে ঐশ্বরিক বলিয়া মনে করেন।
কিন্তু মুসলমানগণ তৌরিত, জব্বর ও ইঞ্জিল –এই নাম কয়টিকে ঐশ্বরিক বলিয়া স্বীকার করেন, গ্রন্থকে নহে। কেননা বলা হইয়া থাকে যে, হাল আমলে প্রচলিত গ্রন্থসমূহ আসল নহে, উহা কৃত্রিম। সে যাহা হউক, বাইবেলের অন্তর্গত তৌরিত, জব্বর ও ইঞ্জিল –এই গ্রন্থত্রয়ের পৃথক পৃথক আলোচনা করা যাইতেছে।
তৌরিত
ইহুদিদের মতে, একদা হজরত মূসা তুর পর্বতের চূড়ায় ভগবান জাভে (ইহুদিদের ঈশ্বর)-এর দর্শন লাভ করেন ও তাহার বাণী শ্রবণ করেন এবং জাভে-এর স্বহস্তে লিখিত দশটি আদেশ সম্বলিত দুইখানা পাথর প্রাপ্ত হন। উহাই তৌরিত গ্রন্থের মূলসূত্র। অতঃপর বহুদিন যাবত হজরত মূসা উক্ত পর্বতে যাতায়াত করিয়া ও অন্যত্র বিভিন্ন সময়ে জাভের নিকট হইতে যে সমস্ত আদেশ-উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাও উক্ত গ্রন্থে হান পাইয়াছে।
হজরত মূসার ঈশ্বরের দর্শনলাভ সম্বন্ধে তৌরিতের বিবরণটি এইরূপ — “মিশর দেশ হইতে ইস্রায়েল সন্তানদের বাহির হইবার পর তৃতীয় মাসে … পরে তৃতীয় দিন প্রভাত হইলে মেঘগর্জন ও বিদ্যুৎ এবং পর্বতের উপরে নিবিড় মেঘ হইল, আর অতিশয় উচ্চরবে তুরিধনি হইতে লাগিল; তাহাতে শিবিরস্থ সমস্ত লোক কাপিতে লাগিল … তখন সমস্ত সীনয় পর্বত ধূমময় ছিল। কেননা সদাপ্রভু অগ্নিসহ তাহার উপর নামিয়া আসিলেন, আর ভাটির ধূমের ন্যায় তাহা হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং সমস্ত পর্বত অতিশয় কপিতে লাগিল। আর তুরির শব্দ ক্রমশ অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, তখন মোশি (মূসা আ.) কথা কহিলেন এবং ঈশ্বর বাণী দ্বারা তাঁহাকে উত্তর দিলেন।” (যাত্রাপুস্তক ১৯; ১, ১৬, ১৮, ১৯)
অন্যত্র হজরত মূসা বলেন, “সদাপ্রভু পর্বতের অগ্নির, মেঘের ও ঘোর অন্ধকারের মধ্য হইতে তোমাদের সমস্ত সমাজের নিকটে এই সমস্ত বাক্য মহারবে বলিয়াছিলেন, আর কিছুই বলেন নাই। পরে তিনি এই সমস্ত কথা দুইখানা প্রস্তরফলকে লিখিয়া আমাকে দিয়াছিলেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৫; ২২)
উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, ঐদিন তূর পর্বত ধূম্রবৎ মেঘে আচ্ছন্ন ছিল এবং মুহুর্মুহু মেঘগর্জন হইতেছিল ও বিদ্যুৎচমকে পর্বতটি অগ্নিময় দেখাইতেছিল। প্রিয় পাঠকগণের স্মরণ থাকিতে পারে যে, পার্শি ধর্ম প্রবর্তক জোরওয়াস্টারও অনুরূপ বজ-বিদ্যুতের মধ্যে পাহাড়চূড়ায় তাঁহার ধর্মবিধি জেন্দ-আভেন্তা গ্রন্থখানা পাইয়াছিলেন।
ইস্রায়েল বংশীয় মহাভাববাদী হজরত মূসা মিশর দেশে জন্মগ্রহণ করেন খ্রী. পূ. ১৩৫১ সালে এবং তূর পর্বতে খোদাতা’লার নূর দেখিতে, বাণী শুনিতে ও দশ আদেশ খচিত প্রস্তরফলক পান খ্রী. পূ. ১২৮৫ সালে। অতঃপর ৫৪ বৎসরকাল স্বীয় ধর্মমত (ইহুদি ধর্ম) প্রচার করিয়া নিবো পাহাড়ে দেহত্যাগ করেন খ্রী. পূ. ১২৩১ সালে। কাজেই তৌরিত গ্রন্থের সৃষ্টি খ্রী. পূ. ১২৮৫ ১২৩১ সালের মধ্যে। সুতরাং তৌরিত গ্রন্থের বর্তমান বয়স অন্যূন ৩,২০০ বৎসর।
