মহর্ষি ব্যাস বেদের মন্ত্র সংকলন ও বিভাগ করেন বলিয়া তাহার আর এক নাম বেদব্যাস। হার রচিত মহাভারত ‘পঞ্চম বেদ’ নামে কথিত এবং অষ্টাদশ পুরাণ ইহারই রচিত বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই পুরাণাদি গ্রন্থসমূহও হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বলিয়া পরিগণিত হয়। যদিও হিন্দু ধর্মকে বৈদিক ধর্ম বলা হইয়া থাকে, তথাপি বর্তমান হিন্দু ধর্ম হইল বৈদিক ও পৌরাণিক মতের সংমিশ্রণ। সে যাহা হউক, বৈদিক ও পৌরাণিক শিক্ষার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —
১. ঈশ্বর এক (একমেবাদ্বিতীয়ম)।
২. বিশ্বজীবের আত্মাসমূহ এক সময়ের সৃষ্টি।
৩. মরণান্তে পরকাল এবং ইহকালের কর্মফল পরকালে ভোগ।
৪. পরলোকের বা পরজগতের দুইটি বিভাগ –স্বর্গ ও নরক।
৫. নরক অগ্নিময় এবং স্বর্গ উদ্যানময়।
৬. স্বর্গ সাত ভাগে এবং নরক সাত ভাগে বিভক্ত।
৭. স্বর্গ ঊর্ধদিকে এবং নরক নিম্নদিকে অবস্থিত।
৮. পুণ্যবানদের স্বর্গপ্রাপ্তি এবং পাপীদের নরকবাস।
৯. যমদূত কর্তৃক মানুষের জীবন হরণ।
১০. ভগবানের স্থায়ী আবাস ‘সিংহাসন’।
১১. স্তব-স্তুতিতে ভগবান সন্তুষ্ট। অর্থাৎ ভগবান তোষামোদপ্রিয়।
১২. মন্ত্র দ্বারা উপাসনা।
১৩. মানুষের আদিপিতা একজন মানুষ।
১৪. নরবলি হইতে পশুবলির প্রথা প্রবর্তন।
১৫. বলিদানে পুণ্যলাভ।
১৬. ঈশ্বরের নামে উপবাসে পুণ্যলাভ।
১৭. তীর্থভ্রমণে পাপের ক্ষয়।
১৮. ঈশ্বরের দূত আছে।
১৯. জানু পাতিয়া উপাসনায় বসা।
২০. সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত।
২১. করজোড়ে প্রার্থনা।
২২. মালা জপ।
২৩. নিত্য উপাসনার স্থান মন্দির।
২৪. নির্দিষ্ট সময়ে উপাসনা করা।
২৫. ধর্মগ্রন্থ পাঠে পুণ্যলাভ।
২৬. কার্যারম্ভে ঈশ্বরের নামোচ্চারণ। যথা –নারায়ণং নমস্কৃত্যং নবৈষ্ণব নরোত্তমম।
২৭. গুরুর নিকট দীক্ষা বা মন্ত্র গ্রহণ।
২৮. স্বর্গে গণিকা আছে। যথা– গন্ধর্ব, কিন্নরী, অপ্সরা ইত্যাদি।
২৯. উপাসনার পূর্বে অঙ্গ প্রক্ষালন।
৩০. দিগনির্ণয়পূর্বক উপাসনায় বসা। ইত্যাদি।
.
# ২. আমদুয়াত, ফটক ও মৃতের গ্রন্থ
প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মপুস্তক ছিল আমদুয়াত গ্রন্থ, ফটকের গ্রন্থ এবং মৃতের গ্রন্থ। প্রাচীন মিশরীয়রা ঐগুলিকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া মনে করিত। কেননা উক্ত গ্রন্থত্রয়ের প্রত্যক্ষ কোনো রচয়িতা নাই এবং উহার আলোচ্য বিষয়সমূহের অধিকাংশই মানবজ্ঞানের বহির্ভূত। গ্রন্থত্রয়ের আলোচ্য বিষয়ের প্রায় সমস্তই পারলৌকিক জীবন বিষয়ক। মিশরীয়রা মনে করিত যে, পারলৌকিক জীবন বিষয়ক কোনো আলোচনা করা মানবীয় জ্ঞানে সম্ভব নহে। কেননা অতল ভবিষ্যতের খবর মানুষ জানিবে কি করিয়া? উহা হইবে অলৌকিক জ্ঞানসম্পন্ন কোনো অতিমানবের রচনা। সুতরাং গ্রন্থত্রয়ের রচয়িতা জ্ঞানের দেবতা থৎ এবং হাতের লেখাও তাহারই।
প্রাকপিরামিড যুগের মিশরবাসীগণ তাহাদের সমাধিমন্দিরগুলির গায়ে অথবা প্যাপিরাসে লিখিয়া বা অঙ্কিত করিয়া রাখিত মৃতের পরলোক বিষয়ক নানা রকম কম্পিত চিত্র। কালক্রমে ঐগুলির লেখক বা রচয়িতা কে কাহারা, তাহার কোনো হদিস পাওয়া যাইত না। পরবর্তী যুগের মানুষ মনে করিত যে, ঐ সমস্ত দৈব বা ঐশ্বরিক বাণী।[৩৯]।
আর্য ঋষিদের রচিত শ্লোকগুলিকে যেমন সংকলনপূর্বক উহা চারি ভাগে বিভক্ত করিয়া গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন মহর্ষি ব্যাস, প্রাচীন মিশরীয়দের সমাধিগাত্রে ও প্যাপিরাসে খচিত বিক্ষিপ্ত বাণীগুলিকেও তেমন সংকলনপূর্বক উহাকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন সেকালের কোনো ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি।
পরলোক বা অধঃজগতের বিবরণ আছে বলিয়া প্রথম গ্রন্থটির নাম আমদুয়াত গ্রন্থ। দ্বিতীয়টির নাম ফটকের গ্রন্থ দেওয়া হইয়াছে এই জন্য যে, পরলোকে প্রত্যেকটি ঘণ্টার ব্যবধানে একটি করিয়া ফটক বা গেট আছে এবং মৃতকে সেই ফটকের ভিতর দিয়া একস্থান হইতে অন্যস্থানে যাইতে হয়। তৃতীয়টি, মৃতের গ্রন্থ, পরলোকবাসীদের জীবনবৃত্তান্ত। অর্থাৎ মরার পরের জীবন। গ্রন্থত্রয়ের মধ্যে মৃতের গ্রন্থ খানাই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। উহাতে আছে পরজগতের বিস্তৃত বর্ণনা ও ইহজগতে থাকিয়া পরজগতের জীবনকে সুখী করিবার মন্ত্র ও ফরমুলা। উহার অধিকাংশই পিরামিড যুগের অর্থাৎ প্রায় খ্রী. পূ. ৩,০০০ অব্দের রচনা এবং কতক তাহারও আগের।
আলোচ্য গ্রন্থত্রয়ের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই –
১. স্বর্গদূত কর্তৃক সমাধিস্থ ব্যক্তির সত্যপাঠ গ্রহণ।
২. পাপ-পুণ্য পরিমাপের জন্য দাড়িপাল্লা ব্যবহার।
৩. মৃত ব্যক্তির পুনর্জীবন লাভ।
৪. পাপ-পুণ্যের বিচার।
৫. পরজগতের সুখের চাবিকাঠি ইহজগতেই। ইত্যাদি।
.
# ৩. জেন্দ-আভেস্তা
পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ ‘জেন্দ-আভেস্তা’। পারসিকেরা উহাকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলেন। তাঁহারা বলেন যে, তাঁহাদের ধর্মগুরু জোরওয়াস্টার একদা কোনো পর্বতশিখরে উপাসনায় আসীন থাকাকালে সেখানে বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎস্ফুরণের মধ্যে তাঁহার আরাধ্য দেবতা ‘অহুর মজদা’র আবির্ভাব হয় এবং তাহার নিকট হইতে তিনি জেন্দ-আভেস্তা গ্রন্থখানা প্রাপ্ত হন।
জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব সম্বন্ধে নানা মত দৃষ্ট হয়। কেহ কেহ বলেন যে, বিখ্যাত ট্রয় যুদ্ধের পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে জোরওয়াস্টার বিদ্যমান ছিলেন। ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল খ্রী. পূ. ১১৯৩ সালে। এই হিসাবে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাবকাল প্রায় খ্রী. পূ. ৬১৯৩ সাল। বেরোসাসের মতে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব খ্রী. পূ. ২৮০০ সালে। ডাইওনিসাস লেবার্টিয়াসের মতে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব খ্রী. পূ. ১৭৯৩ সালে এবং স্পিগেলের মতে খ্রী. পূ. ১৯২০ সালে। স্পিগেলের মত মানিয়া লইলে, জোরওয়াস্টার ও মহাপ্রবর ইব্রাহিম একই সময়ের মানুষ। কেননা হজরত ইব্রাহিম (আ.) খ্রী. পূ. ১৯২০ সাল বা তাহার কাছাকাছি সময়ে মিশর ভ্রমণে গিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।[৪০]
