তৌরিত গ্রন্থের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —
১. ত্বকচ্ছেদ –অর্থাৎ পুরুষের লিঙ্গগ্রের চর্ম কর্তন করা। ইহা ইহুদিদের জাতীয় চিহ্ন। ইহা না করিলে সে ইহুদিদের স্বজাতীয় বলিয়া গণ্য হয় না। (লেবীয় ১২; ৩)
২. খাদ্য ও অখাদ্য নির্ণয় –খাদ্যাখাদ্য নির্ণয়ে তৌরিতের বিধান এইরূপ — “পশুগণের মধ্যে যে কোনো পশু সম্পূর্ণ দ্বিখণ্ড খুর বিশিষ্ট ও জাবর কাটে, তাহা তোমরা ভোজন করিতে পার। … আর শূকর তোমাদের পক্ষে অশুচি। কেননা সে সম্পূর্ণ দ্বিখণ্ড খুর বিশিষ্ট বটে, কিন্তু জাবর কাটে না। তোমরা তাহাদের মাংস ভোজন করিও না; এবং তাহাদের শবও স্পর্শ করিও না; তাহারা তোমাদের পক্ষে অশুচি।
“জলজন্তুদের মধ্যে তোমরা এই সকল ভোজন করিতে পার –জলাশয়ে, সমুদ্রে কি নদীতে স্থিত জন্তুর মধ্যে ডানা ও আঁইশ বিশিষ্ট জন্তু তোমাদের খাদ্য।… পক্ষীদের মধ্যে এই সকল তোমাদের পক্ষে ঘৃণাহ হইবে –ঈগল, হাড়গিলা, কুরল, চিল, … কাক, উষ্ট্রপক্ষী, রাত্রিশ্যেন, গাংচিল, শ্যেন, পানি ভেলা, পেঁচক, মাছরাঙ্গা, মহাপেঁচক, দীর্ঘগল হংস, শকুনী, সারস, বক, টিভি ও বাদুড়, … আর তোমাদের কোনো পশু মরিলে, যে কেহ তাহার শব স্পর্শ বা ভক্ষণ করিবে, সে সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে।” (লেবীয় পুস্তক ১১; ৩, ৬৯, ১৩–১৯, ৩৯)
৩. অশুচিতা –অশৌচ সম্বন্ধে তৌরিতের বিধান এইরূপ — “আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি ইস্রায়েল সন্তানগণকে বল, যে স্ত্রী গর্ভধারণ করিয়া পুত্র প্রসব করে, সে সাতদিন অশুচি থাকিবে, … পরে অষ্টম দিনে বালকটির ত্বকচ্ছেদ হইবে [ত্বকচ্ছেদ নিয়মটির প্রবর্তক হজরত ইব্রাহিম (আদিপুস্তক ১৭; ১০-১২) ]। আর সে স্ত্রী তেত্রিশ দিন পর্যন্ত আপনার শৌচার্থ রক্তস্রাব অবস্থায় থাকিবে। যাবত শৌচাৰ্থ দিন পূর্ণ না হয়, তাবৎ সে কোনো পবিত্র বস্তু স্পর্শ করিবে না এবং ধর্মধামে প্রবেশ করিবে না।… আর যে স্ত্রী রজস্বলা হয়, তাহার শরীরস্থ রক্তক্ষরণে সাত দিবস তাহার অশৌচ থাকিবে। আর অশৌচকালে সে যে কোনো শয্যায় শয়ন করিবে, তাহা অশুচি হইবে ও যাহার উপর বসিবে, তাহা অশুচি হইবে।” (লেবীয় পুস্তক ১২; ১৪ ও ১৯; ১৯-২০)
৪. রেতস্থলন –“আর যদি কোনো পুরুষের রেতপাত হয়, তবে সে আপনার সমস্ত শরীর জলে ধৌত করিবে।… আর যে কোনো বস্ত্রে কি চর্মে রেতপাত হয়, তাহা জলে ধৌত করিতে হইবে।… আর স্ত্রীর সহিত পুরুষ রেতশুদ্ধ শয়ন করিলে, তাহারা উভয়ে জলে স্নান করিবে। (লেবীয় ১৫; ১৬-১৮)
৫. বিবাহ নিষিদ্ধ নারী –তৌরিত গ্রন্থে নিম্নলিখিত আত্মীয়া রমণীগণের সহিত বিবাহ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। মাতা, বিমাতা, ভগিনী, নাতিনী, বৈমাত্র ভগিনী, পিসী, মাসী, চাচী, পুত্রবধূ, ভ্রাতৃবধূ, স্ত্রীর নাতিনী (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত), স্ত্রীর কন্যা (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত), শাশুড়ী। (লেবীয় ১৮; ৬-১৭)
৬. অশৌচকালে যৌনমিলন নিষিদ্ধ –“কোনো স্ত্রীর অশৌচকালে তাহার আবরণীয় অনাবৃত করিতে তাহার নিকটে যাইও না।” (লেবীয় পুস্তক ১৮; ১৯)
৭. ঈশ্বর নামের নিন্দায় জীবনদণ্ড –“আর যে সদাপ্রভুর নামের নিন্দা করে, তাহার প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে। সমস্ত মণ্ডলী তাহাকে প্রস্তরাঘাতে বধ করিবে, বিদেশীয় হউক আর স্বদেশীয় হউক, সেই নামের নিন্দা করিলে উহার প্রাণদণ্ড হইবে।” (লেবীয় পুস্তক ২৪; ১৬)
অহিংসা পরম ধর্ম –এই বাক্যটিতে সকল ধর্মই একমত। অথচ ধর্মে-ধর্মে হিংসার অন্ত নাই, বিশেষত ঈশ্বর সম্বন্ধে। নিরীশ্বরবাদী (নাস্তিক) মানুষের সংখ্যা জগতে খুবই অল্প এবং প্রায় সকল ধর্মই ঈশ্বরবাদী এবং ঈশ্বরের সংজ্ঞাও প্রায় একই, তখন সমস্ত জগতে সর্বসম্মত একজন ঈশ্বর থাকা উচিত। কিন্তু আছে কি?
নামে পরিবর্তনে বিশেষ কিছু আসে যায় না। বিভিন্ন ভাষায় সূর্যের নাম বিভিন্ন। কিন্তু উহার আকৃতি ও প্রকৃতি সর্বত্রই একরূপ। কিন্তু পরমেশ্বর, অহুর মজদা, জাভে, পরমপিতা ও আল্লাহ প্রভৃতি ঈশ্বরবাচক নামগুলি যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তেমন তাহার স্বভাব-চরিত্রও ধর্মজগতে ভিন্ন ভিন্ন। আবার প্রত্যেক ধর্মই অপর ধর্মাবলম্বী মানুষকে বলে বিধর্মী। ধর্ম বলিতে যাহা বুঝায়, তাহা যেন তাহার নিজেরটিই; অন্য আর একটিও ধর্ম নহে, ঐসব কুসংস্কার।
প্রত্যেক ধার্মিকের কাছেই আপন ঈশ্বর প্রেমের পাত্র এবং ভক্তরা তাহার প্রশংসায় মুখর। কিন্তু অন্যদের ঈশ্বর যেমন প্রশংসার অযোগ্য, তেমন ঘৃণার পাত্র। এমতাবস্থায় বিধর্মী মাত্রেই ঈশ্বরনিন্দুক এবং তৌরিতের মতে তাহারা বধের যোগ্য। কাজেই ইহাতে সৃষ্ট হইল বিজাতিবিদ্বেষ ও তাহার পরিণামে ধর্মযুদ্ধ। কে বলিতে পারে যে, কত মানুষ প্রাণ দিয়াছে পুরোহিততন্ত্রের আমলের ধর্মযুদ্ধে? সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, গণতন্ত্রের যুগে ধর্মযুদ্ধ হইয়াছে অচল বা বাতিল। কিন্তু নির্বাণোন্মুখ প্রদীপের মতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা এখনও ঘটিয়া থাকে।
৮. খুনের বদলে খুন –এই বিষয়ে তৌরিতের শিক্ষা এইরূপ — “আর যে কেহ কোনো মানুষকে বধ করে, তাহার প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে।” (লেবীয় পুস্তক ২৪; ১৭)
ইহুদি জাতির উক্ত নীতিটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করিয়াছিল — শূলদণ্ড ও ফাঁসিকাষ্ঠে। তবে বর্তমানে উহা অনেকেই পছন্দ করেন না।
