৬. নাসারন্ধে হাত দিবার ফল বিভীষিকাদর্শন।
৭. কপালে হাত রাখিবার ফল নিদ্রা।
৮. খাদ্যদ্রব্য লৌহপাত্রে ঢাকা দিয়া রাখিলে উহা দানবের আশ্রয়স্থল হয়। ইত্যাদি।
এই দেশেও ঐ ধরণের কতগুলি প্রথা আছে, যাহা গ্রামাঞ্চলে বেশ প্রচলিত। যেমন—
১. লাউ, কুমড়া বা সীমের মাচায় কালো পাতিল রাখা। উহাতে নাকি লোকের কুদৃষ্টি এড়ানো যায় এবং গাছ সতেজ হয়।
২. শিশুর গলায় রুদ্রাক্ষ, ঝাটার শলা, তাবিজ-কবচ দেওয়া এবং কপালে তিলক কাটা। উহাতে নাকি ভূতপ্রেত বা দেও-দানবের আছর ও রোগের প্রকোপ এড়ানো যায়।
৩. মেয়েলোকের যমজ ফল না খাওয়া। খাইলে নাকি যমজ সন্তান হয়।
৪. সাধু-সজ্জন ও দেবতার নামে ছেলে-মেয়েদের নাম রাখা। ইহাতে নাকি দেশে চোর, বদমায়েশ ও অসৎ লোক কমিয়া থাকে।
৫. নানাবিধ রোগারোগ্য ও অভীষ্টসিদ্ধির জন্য মানত করা। ইত্যাদি।
————
৩৪. প্রাচীন মিশর, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ৪৬।
৩৫. প্রাচীন ইরাক, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ ১১৩-১১৫।
৩৬. প্রাচীন প্যালেস্টাইন, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ২১৩-২১৮।
৩৭. প্রাচীন ইরাক, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ৮, ৯।
৩৮. প্রাচীন ইরাক, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ১০৪।
১৫. কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি
কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি
সভ্য মানব সমাজে ধর্ম বহু এবং ধর্মগ্রন্থও অনেক। উহার মধ্যে কয়েকটিকে বলা হয় ঐশ্বরিক বা অপৌরুষেয় গ্রন্থ। এইখানে কয়েকখানা প্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইল।
# ১. বেদ
হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ। এই দেশের আর্য হিন্দুদের একান্ত বিশ্বাস যে, পরমপিতা ভগবান অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অগিরা– এই চারিজন ঋষিকে সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধচিত্ত দেখিয়া ঘঁহাদিগের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হইয়া, এই চারিজনের মুখ দিয়া ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারি বেদ প্রকাশ করিয়াছেন। আবার কেহ কেহ বলেন যে, বেদ সেই অনাদি অনন্ত ঈশ্বরের নিঃশ্বাসে সৃষ্ট, কোনো মানুষ ইহার রচয়িতা নহেন। বেদ অপৌরুষেয়।
হিন্দু ধর্মের যাবতীয় একান্ত করণীয় বিষয়ই বেদে বর্ণিত আছে। ঋকবেদ প্রধানত একখানি স্তোত্রগ্রন্থ। আর্য ঋষিগণ যে সকল মন্ত্র দ্বারা ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণের আরাধনা করিতেন, সেই মন্ত্রগুলিই ঋকবেদের মূলসূত্র। ঐতিহাসিকদের মতে, বেদ ঐশ্বরিক পুঁথি নহে। কেননা ইহাতে প্রাচীন মুনি-ঋষিদের ও আর্য রাজাদের ইতিহাস পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জনপদ, যুদ্ধবর্ণনা ইত্যাদি বেদে উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাদের মতে, ইহা আর্য সভ্যতার ইতিহাস মাত্র।
ঈশ্বর সর্বজ্ঞ। তাহার প্রণীত গ্রন্থে কখনও একদেশদর্শিতা দোষ থাকিতে পারে না। কিন্তু বেদে উহা আছে। বেদের যাবতীয় কারবা ভারতবর্ষেই সীমাবদ্ধ। ভারতের বাহিরের বর্ণনা বিশেষ কিছু বেদে পাওয়া যায় না।
ঋগ্বেদে ২১৪ জন ঋষির নাম পাওয়া যায় এবং স্ত্রীলোকের নামও আছে ১২টি। বোধ হয় যে, উহারা সকলেই বেদের কোনো না কোনোও অংশের রচয়িতা। বস্তুত বেদে লিখিত শ্লোকগুলি তৎকালীন আর্য ঋষিদের ধ্যান-ধারণা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সৃষ্টি।
বেদ যে ঋষিগণ কর্তৃক রচিত, তৎপ্রমাণ ঋগ্বেদেই রহিয়াছে। এইখানে আমরা ঋগ্বেদের কয়েকটি সূত্রের অনুবাদ লিপিবদ্ধ করিলাম। যথা —
১. হে অশ্বযোজক ভগবান! গৌতমাদি ঋষিরা তোমার উদ্দেশে এই মন্ত্র রচনা করিয়াছেন।
২. হে মরুত! এই নমস্কারজনক স্তোত্র অন্তরে রচিত হইয়া কায়মনে তোমাতে নিবেদিত হইল।
৩. আমাদিগের যজ্ঞবর্ধক বৈশ্যানর অগ্নির উদ্দেশে পবিত্র ঘৃততুল্য এক মন্ত্র রচনা করিয়াছি।
৪. সোমরস অভিযুত না হইলে ইন্দ্রের প্রীতি জন্মে না, আবার অভিযুত না হইলেও মন্ত্র ব্যতিরেকে তাহার প্রীতি জন্মে না, অতএব তাহার উদ্দেশে এক মনোহর স্তোত্র রচনা করিলাম।
৫. হে মিত্রাবরুণ! দীর্ঘত যজ্ঞশীল মহর্ষি বশিষ্ঠ তোমাদিগের উদ্দেশে এক সম্মানাহ স্তোত্র প্রেরণ করিতেছেন।
বেদ যে মনুষ্য (ঋষি) প্রণীত, তাহা উক্ত মন্ত্রগুলির অবস্থা দেখিলেই বুঝা যায়।
বেদের উৎপত্তিকাল সম্বন্ধে নানা মত দেখিতে পাওয়া যায়। কেহ বলেন খ্রী. পূ. ২,০০০ বৎসর, কেহ বলেন ৫,০০০ বৎসর। বাল গঙ্গাধর তিলক বেদমন্ত্র হইতেই বেদের বয়স গণনা করিয়াছেন ৮,০০০ বৎসর। পণ্ডিতবর উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয় বলিয়াছেন যে, বেদের বয়স অন্যূন ২১,৬০,০১৭ বৎসর। আবার কেহ বলেন, বেদ অনাদি। বেদের রচনাকাল সম্বন্ধে এতই। মতানৈক্য যে, কাহারও মতেই আস্থা স্থাপন করা যায় না। তবে এইকথা স্বীকার্য যে, বৈদিক স্তোত্রনিচয় এক সময়ে রচিত নহে, উহা সময়ে সময়ে ঋষিগণ দ্বারা এক এক অংশে রচিত হইয়াছিল। বর্তমান বেদ যাহা এখন জনসমাজে ব্যবহৃত ও পঠিত হইতেছে, ব্যাস-এর পূর্বে উহা এইরূপ ছিল না। অধুনাতন পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ বেদকে পৃথিবীর আদিগ্রন্থ বলিয়া নির্দেশ করেন।
বেদের রচনাকাল সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা থাকিলেও উহার সংকলন বা লিপিবদ্ধ করিবার কাল কিছু আন্দাজ করা চলে। হিন্দুদের মতে, কলি যুগ আরম্ভ হইয়াছে প্রায় ৫,০০০ বৎসর আগে। পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির রাজত্ব করিতেন দ্বাপর যুগের শেষ ও কলি যুগের শুরুতে এবং বেদগ্রন্থের সম্পাদক মহর্ষি ব্যাস ছিলেন তাঁহার পিতামহ। সুতরাং ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, গ্রন্থাকারে বেদের বয়স কিঞ্চিদধিক পাঁচ হাজার বৎসর।
