বরাহপুরাণ অনুযায়ী ব্ৰহ্মার দক্ষিণ অঙ্গ থেকে ধর্মের জন্ম হয় । বামনপুরাণ মতে ধর্মের স্ত্রী অহিংসা। এর গর্ভে চারিটি পুত্র হয়–সন্যকার, সনাতন, সনক ও সনন্দ । মহাভারত অনুযায়ী ধর্মের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। পুরাণ মতে ধর্ম ও যম একই। বলা হয়েছে যে দেবগণের মধ্যে যম সর্বাপেক্ষা পূণ্যবান বলে ওঁর নাম ধৰ্মরাজ । কিন্তু তার জন্মবৃত্তান্ত ভিন্ন দেওয়া আছে। সূর্যের ঔরসে ও তার স্ত্রী সংজ্ঞার গর্ভে যমের জন্ম বলা হয়েছে। যম পাপ পুণ্যের বিচারকর্তা । চিত্রগুপ্ত তাঁর পাপপুণ্যের হিসাবরক্ষক। ঋগ্বেদে বিবস্বান ও সরন্যুর সন্তান যম-যমী-যমজ ভ্ৰাতা ও ভগিনী । ঋগ্বেদে যমী যমের সহবাস আকাঙ্খা করেছেন। (আগে দেখুন )। যমলোক মনুষ্যলোক হতে ৮৬,০০০ যোজন দূরে অবস্থিত।
পৌরাণিক যুগের তিন শ্রেষ্ঠ দেবতা- ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। শিবের কথা আমরা আগেই বলেছি। ব্ৰহ্মার কথা পরে বলব। এখানে বিষ্ণুর কথাই বলছি। বিষ্ণু বৈদিক দেবতা। বেদে বিষ্ণুকে সূর্যের সঙ্গে অভিন্ন করা হয়েছে। পুরাণ মতে প্রজাপতি কশ্যপের ঔরসে অদিতির গর্ভে বিষ্ণু জন্মগ্রহণ করেন । বিষ্ণুর দুই স্ত্রী–লক্ষ্মী ও সরস্বতী। পুত্ৰ কামদেব। বিষ্ণু পালন কর্তা । বলা হয়েছে পৃথিবীর কল্যাণের জন্য দেবতাদের সাহায্য করবার জন্য ও দানব দলনের জন্য ইনি যুগে যুগে আবির্ভূত হন । বিষ্ণুর এইরূপ আবির্ভাবকে অবতার বলা হয়। বিভিন্ন যুগে বিষ্ণু মৎস্য, কুৰ্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, রাম, পরশুরাম, বলরাম, বুদ্ধ ও কল্কি–এই দশ অবতাররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। প্ৰলয়সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় নারায়ণরূপে মনুষ্যদেহধারী হয়ে বিষ্ণু শেষনাগের ওপর শায়িত ছিলেন । এঁর নাভিপদ্ম থেকে ব্ৰহ্মার উৎপত্তি হয়েছিল । জগৎ সৃষ্টির কালে মধু ও কৈটভ নামে দুই দানবকে হত্যা করে তাদের মেদ থেকে তিনি মেদিনী সৃষ্টি করেছিলেন।
মহাপ্রলয়ের শেষে বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে ব্ৰহ্মার উৎপত্তি হয়। জলে তিনি সৃষ্টির বীজ নিক্ষেপ করেন । ওই বীজ অণ্ড হয়ে দুভাগে বিভক্ত হলে, একভাগ আকাশে ও অন্যভাগ ভূমণ্ডলে পরিণত হয়।
এরপর ব্ৰহ্মা মন থেকে মরীচি, অত্ৰি, অঙ্গিরা, পুলস্তা, ক্রতু, বশিষ্ঠ, ভুগু, দক্ষ, নারদ এই দশজন প্ৰজাপতিকে সৃষ্টি করেন। ব্ৰহ্মার স্ত্রী সরস্বতী ও দুই কন্যা দেবসেনা ও দৈত্যসেনা । দেবসেনা ষষ্ঠী নামেও পরিচিতা । ইনি মাতৃকাশ্রেষ্ঠ ও শিশুপালিকা। দেবসেনার ভগিনী দৈত্যসেনাকে একবার কেশীদানব হরণ করে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিবাহ করে । ইন্দ্ৰ দেবসেনাপতি কার্তিককে বলেন যে, এই কন্যার ( দেবসেনার ) জন্ম না হতেই ব্ৰহ্মা একে আপনার স্ত্রী বলে নিদিষ্ট করেছেন। কাৰ্তিকের সঙ্গে এর বিবাহ হয়।
ব্ৰহ্মার প্রথমে পাঁচটা মুখ ছিল। একবার শিবকে তাচ্ছিল্য করায় শিব তঁর তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে ব্ৰহ্মার একটি মস্তক দগ্ধ করে । সেই থেকে ব্ৰহ্মার চার মস্তক । ব্ৰহ্মা চতুর্ভূজ ও রক্তবর্ণ। অপর এক কাহিনী অনুযায়ী বিশ্বকৰ্মা যখন অপ্সরা তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করে, এবং সৃষ্টির পর তিলোত্তম যখন দেবতাদের প্রদক্ষিণ করে, তখন তাকে দেখবার জন্য ব্ৰহ্মার চারদিকে চারটি মুখ সৃষ্টি হয় ।
অথর্ববেদে কামদেব স্রষ্টা হিসাবে পুজিত হয়েছেন। কিন্তু পুরাণে তিনি যৌনাকাঙ্খার দেবতা । মৎস্যপুরাণে আছে ব্ৰহ্মার হৃদয় হতে কামদেবের জন্ম ৷ ব্ৰহ্মা নিজে তার শরে জর্জরিত হয়ে নিজ কন্যা শতরূপায় উপগত হন । মহাদেবের তপস্যা ভঙ্গ করতে গিয়ে কাম শিবের তৃতীয় নয়নদ্বারা ভস্মীভূত হয়েছিল। অভিশাপের ফলে কাম শ্ৰীকৃষ্ণের পুত্ৰ প্ৰদ্যুম্নরূপে জন্মগ্রহণ করে। তারপর বিদ্যাধরদের পিতা হয়ে দেবত্ব লাভ করে । কামের স্ত্রী রতি। রতি দক্ষের কন্যা । ইনি যৌন আকাঙ্ক্ষার দেবী । কালিকাপুরাণ অনুযায়ী দক্ষ নিজ কন্যা রীতিকে দেখিয়ে কামদেবকে বলেন, এ আমার দেহজাত কন্যা এবং গুণে তোমার অনুরূপ । এই বলে তিনি রতিকে কামদেবের হাতে সমর্পণ করেন । রতিকে দেখে দেবতারা তার প্রতি অনুরক্ত হন । শিবের অভিশাপের ফলে কামদেব যখন শ্ৰীকৃষ্ণের পুত্ৰ প্ৰদ্যুম্নরূপে জন্মগ্রহণ করে, রতি তখন মর্ত্যলোকে তাঁর স্ত্রী মায়াবতী রূপে জন্মান ।
কুবের মহাদেবের ধনরক্ষক। পিতা পৌলস্ত্য বা বিশ্রবা, মাতা ভরদ্বাজ-কন্যা দেববর্ণিনী ৷ ব্ৰহ্মার বরে তিনি উত্তর দিগন্তের দিকপাল ও ধনাধিপতি হন। ব্ৰহ্মা তার আবাসস্থান নির্দেশ না করায় পিতার নির্দেশে ত্ৰিকুট-শিখরস্থ লঙ্কাপুরীতে গিয়ে বাস করেন। কিন্তু কুবেরের বৈমাত্রেয় ভাই রাবণ লঙ্কাপুরীর অধিকার চাইলে, পিতার উপদেশে লঙ্কা ত্যাগ করে কৈলাসে যান। সেইখানেই তঁর বাসস্থান ঠিক হয়। কুবের একদা হিমালয়ে তপস্যাকালে দৈবাৎ দেবী রুদ্রাণীকে দর্শন করেন। ফলে তার দক্ষিণ চক্ষু দগ্ধ ও বামচক্ষু ধূলিকলুষিত ও পিঙ্গলবৰ্ণ হয় । বহু বৎসর ধরে কঠোর তপস্যায় মহেশ্বরকে গ্ৰীত করেন ও তার সঙ্গে সখ্য স্থাপন করেন। কুবেরের চেহারা খুব কুৎসিৎ ছিল। তার তিনটি পা ও আটটি দাঁত ছিল । আহুতি তাঁর স্ত্রী, নলকুবের ও মনিগ্রীব তাঁর দুই পুত্র ও মীনাক্ষী তাঁর কন্যা । কুবের যক্ষরাজ নামেও পরিচিত ।
মুনি-ঋষিদের যৌনজীবন
“পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা৷” এটাই ছিল প্ৰাচীন ভারতের যৌন জীবনের সনাতন ধর্ম। নরক থেকে পূৰ্বপুরুষদের উদ্ধার করবার জন্যই পুত্র উৎপাদন করা হত। সেজন্য ধর্মশাস্ত্রকারগণ পুত্র উৎপাদনের প্ৰয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব অৰ্পণ করেছিলেন । এটা যে সাধারণ লোকের জন্যই ব্যবস্থিত হয়েছিল, তা নয়। মুনি-ঋষিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। অগস্ত্য ও জরৎকারু মুনির কাহিনী এ সম্মন্ধে বিশেষ আলোকপাত করে । তার মানে, মাত্র সাধারণ মানুষরাই যে বিবাহ করতেন, তা নয়। মুনিঋষিরাও করতেন। ঋষিদের মধ্যে সপ্তর্ষিরাই হচ্ছেন প্রধান, কেননা তাঁরা হচ্ছেন মন্বন্তর বা যুগ প্রবর্তক । সপ্তর্ষিরা হচ্ছেন মরীচি, অত্ৰি, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্ৰতু, অঙ্গিরা ও বশিষ্ট । এঁরা সকলেই বিবাহ করেছিলেন । এঁদের স্ত্রীদের নাম যথাক্রমে কলা, অনুসূয়া, ক্ষমা, হবিভূ, সন্নতি, শ্রদ্ধা ও অরুন্ধতী। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী এঁরা সকলেই লোকজননী ।
