মুনিঋষিরা যে মাত্র নিজ পূৰ্বপুরুষদের মঙ্গলের জন্যই বিবাহ করতেন, তা নয়। রাজারাজড়ারাও তাদের ডাকতেন। তঁদের দিয়ে নিজ নিজ স্ত্রীদের গর্ভে পুত্র উৎপাদনের জন্য ।
সাধারণ মানুষের মত মুনিঋষিদেরও যৌনবাসনা থাকত। আমরা অনেক ঊর্ধ্বরেতা মুনিঋষিদের দেখি, সুন্দরী অন্সরাদের দেখে রেতঃপাত করছেন। ( ঊর্ধ্বরেতা মানে যার বীর্য উৰ্ব্বরেতা হয়েছে, এবং যার কখনও রেতঃস্থলন হয় না ) । মাত্র পাণ্ডবরাই বহুপতিক ছিলেন না । মুনিঋষিরাও ছিলেন । গৌতমবংশীয়া জটিলা সাতটি ঋষিকে একসঙ্গে বিবাহ করেছিলেন । আবার বার্ক্ষী নামে অপর এক ঋষিকন্যা একসঙ্গে দশ ভাইকে বিবাহ করেছিলেন ।
।। দুই ।।
অগস্ত্য ও জরতকারু কাহিনী নিয়েই শুরু করা যাক । অগস্ত্য বেদের একজন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি । বশিষ্টও একজন বড় ঋষি । ইনি সূর্যবংশের কুলগুরু ও কুল-পুরোহিত। আদিত্য যজ্ঞে মিত্র ও বরুণ উৰ্বশীকে দেখে যজ্ঞ কুম্ভের মধ্যে শুক্রপাত করেন। সেই কুণ্ডে পতিত শুক্র হতে অগস্ত্য ও বশিষ্টের জন্ম হয় । অগস্ত্য প্ৰতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি চিরকাল অকৃতদার থাকবেন । কিন্তু একদিন ভ্ৰমণ করতে করতে দেখতে পেলেন যে তাঁর পিতৃপুরুষরা এক গুহার মধ্যে পা উপরে ও মাথা নীচের দিকে করে ঝুলছেন। তাদের জিজ্ঞাসা করে তিনি জানতে পারলেন যে বংশরক্ষা না করলে তঁদের সদগতি নেই। তখন অগস্ত্য বিবাহ করা স্থির করলেন । নিজ তপোবলে পৃথিবীর সমস্ত প্ৰাণীর সুন্দর ও শ্ৰেষ্ঠ অংশ নিয়ে তিনি এক পরমাসুন্দরী নারী সৃষ্টি করলেন। সমস্ত জীবের সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ অংশ এই নারী লোপ করে নিয়েছিল বলে, এই নারীর নাম হল লোপামুদ্রা। লোপামুদ্রাকে পালন করবার ভার তিনি বিদর্ভরাজের ওপর দিলেন । মেয়েটি বড় হলে, অগস্ত্য তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করলেন। তখন তিনি লোপমূদ্রাকে সম্বোধন করে বললেন—“প্রিয়ে ! তোমার অভিলাষ বল, তুমি আমার দ্বারা কতগুলি সন্তানের জননী হতে চাও, একটি, না একশত, না এক সহস্ৰ ?” এরপর অগস্ত্য দৃঢ়স্যু নামে এক পুত্র উৎপাদন করলেন ।
জরতকারু ছিলেন একজন ঊর্ধ্বরেতা, ব্ৰহ্মচারী, মহাতপা মুনি। একদিন ভ্ৰমণ করতে করতে তিনি কতকগুলি লোককে নীচের দিকে মাথা করে বৃক্ষ শাখা থেকে ঝুলতে দেখলেন। প্রশ্নের উত্তরে তারা বললেন যে জরতকারু নামে তাদের এক পুত্র বিবাহ ও সন্তান উৎপাদন না করায় তাঁরা বংশলোপের আশঙ্কায় এরূপভাবে ঝুলছেন। জরতকারু আত্মপরিচয় দিয়ে বললেন যে পিতৃপুরুষদের মুক্তির জন্য তিনি সমনামা কোন মেয়েকে বিবাহ করতে পারেন, যদি ওই মেয়ের আত্মীয়রা স্বেচ্ছায় তাঁকে ভিক্ষাস্বরূপ কন্যা দান করে । তারপর জরতকারু মুনিকন্যাভিক্ষায় বেরিয়ে বাসুকীর ভগিনী জগৎকারুকে বিবাহ করেন । বিয়ের শর্ত হয় যে তিনি স্ত্রীর ভরণপোষণ করবেন না এবং স্ত্রী কিছু অন্যায় করলে তাকে ত্যাগ করবেন । কিছুদিন পরে জরতকারুর একটি পুত্র হয়। একদিন মহর্ষি নিজ স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে নিদ্রিত আছেন । এমন সময় সায়ংসন্ধ্যাবন্দনাদির সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে দেখে স্ত্রী মহর্ষির নিদ্রাভঙ্গ করেন । এই ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে মহর্ষি স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান ।
।। তিন ।।
সপ্তর্ষিদের অন্যতম বশিষ্টের স্ত্রী অরুন্ধতী কর্দম প্ৰজাপতির ঔরসে দেবাহুতির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন । পতিভক্তি ও পাতিব্ৰত্যের জন্য তিনি আদর্শ রমণী বলে গণ্য হন। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে লিখিত আছে পতিসেবারূপ ধর্মপথ যে নারী অনুসরণ করেন, তিনি অরুন্ধতীর মত স্বর্গেও পূজিত হন। সেজন্য বিবাহের কুশণ্ডিকাকালে মন্ত্র উচ্চারণের সময় নববধূকে অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখানো হয়। বশিষ্টের শতপুত্র ছিল। কল্মাষপদ রাক্ষস বশিষ্টের শতপুত্রের সকলকেই ভক্ষণ করে। একমাত্র জ্যেষ্টপুত্ৰ শক্তির স্ত্রী অদৃশ্যন্তী গর্ভবতী ছিল। তার গর্ভেই পরাশরের জন্ম হয় । একদিন মৎস্যগন্ধা নামে এক ধীবর কন্যা যমুনায় নৌকা পারাপারে নিযুক্ত ছিল। পরাশর তখন সেই নৌকায় যাচ্ছিলেন। মৎস্যগন্ধাকে দেখে পরাশর কামাতুর হয়ে মৎস্যগন্ধার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করেন । সেই সঙ্গমের ফলেই বেদের বিভাগকর্তা ও পুরাণসমূহের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাসের জন্ম হয়।
কল্মাষপাদের কথা এখনও শেষ হয়নি । একদিন পথিমধ্যে কল্মাষপাদ বশিষ্টকে দেখে, তাঁকেও খেতে গেলে, বশিষ্ট কল্মাষপাদের গায়ে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিলে কল্মাষপাদ শাপমুক্ত হন ও নিজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে রাজ্যশাসন করতে থাকেন । তিনি বশিষ্টকে তার স্ত্রীর গর্ভে এক সন্তান উৎপাদন করতে বলেন । বশিষ্টের সঙ্গে এই সঙ্গমের ফলে রাজমহিষী গর্ভবতী হন । কিন্তু ১২ বছর কেটে গেলেও সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় না। তখন রাজমহিষী এক পাষাণখণ্ড দিয়ে নিজের উদর বিদীর্ণ করে এক পুত্র প্রসব করেন । এই পুত্রের নাম অশ্মক ।
।। চার ।।
বিশ্বামিত্র বৈদিক যুগের একজন ব্রহ্মর্ষি এবং ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলের সমস্ত সূক্তের মন্ত্রগুলির অভিবক্তা। ক্ষত্ৰিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও কঠোর তপস্যাবলে তিনি ব্ৰাহ্মণত্ব লাত করেন। তিনি ঊর্ধ্বরেতা ঋষি । এক সময় পুষ্করতীর্থে তিনি উগ্ৰ তপস্যায় রত ছিলেন। সেই সময় ইন্দ্রের প্রেরণায় অপ্সরা মেনকা পুষ্করতীর্থে স্নান করতে গেলে, বিশ্বামিত্র তার রূপে মুগ্ধ হন এবং তাঁর সহবাসে দীর্ঘ দশবছর অতিবাহিত করেন । এই সহবাসের ফলে মেনকার গর্ভে শকুন্তলা নামে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। মেনকা কন্যাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। পরিত্যক্ত কন্যাকে কন্ধমুনি পালন করেন ।
