ভৃঙ্গী ও মহাকাল দুজনেই শিবের অনুচর। শিব যখন একবার পাৰ্বতীর সঙ্গে বিহার করছিলেন, ভূঙ্গী ও মহাকাল দ্বাররক্ষক রূপে নিযুক্ত ছিল। গোপনে তারা শিব ও শিবানীর বিহার দেখে। এতে শিবানী ক্রদ্ধ হয়ে এদের মনুষ্যযোনিতে জন্ম হবে বলে অভিশাপ দেন । তখন ভৃঙ্গী ও মহাকাল শিবানীর কাছে প্রার্থনা করে যে শিব ও শিবানীও যেন মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করেন, কেননা তারা শিবানীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করতে চায় । শিব দক্ষের পৌত্র পৌষ্যের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করে। তখন তাঁর নাম হল চন্দ্ৰশেখর। ওদিকে শিবানী ইক্ষাকুবংশীয় রাজা কুকুৎস্থের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন । তখন, তার নাম হল তারাবতী । চন্দ্ৰশেখরের সঙ্গে তারাবতীর বিবাহ হয় । তঁদের দুটি বানর পুত্র জন্মগ্রহণ করে । তারাই হচ্ছে বেতাল ও ভৈরব। এটা কালিকাপুরাণের কাহিনী । বামনপুরাণের অপর এক কাহিনী অনুযায়ী অন্ধকাসুরের সঙ্গে মহাদেবের যখন যুদ্ধ হয়, অন্ধক তখন মহাদেবের মাথায় পদাঘাত করে । তাতে মহাদেবের মাথা চারভাগে বিভক্ত হয়ে রক্তধারা নিৰ্গত হতে থাকে । এই রক্তধারা থেকে ভৈরবের জন্ম হয়। এ ভৈরবের নাম লম্বিতরাজ। তবে এছাড়া আরও ভৈরব ছিল যথা নন্দী, ভৃঙ্গী, মহাকাল ও বেতাল ।
গণদেবতারাও শিবের অনুচর। এদের অধিপতি গণেশ । গণেশের নিবাস কৈলাস। গণদেবতারাও কৈলাসে বাস করেন ।
যোগিনীরা শিবানীর সহচরী। তারা বিভিন্ন সময়ে শিবানীকে সাহায্য করে ও তাঁর আদেশ অনুসারে কাজ করে । যোগিনীরা সংখ্যায় চৌষট্টি জন । তাদের মধ্যে প্ৰধান হচ্ছে ভৈরবী । তিনি দশমহাবিদ্যার অন্যতমা ।
দেবদেবীর কুলজী
বৈদিক দেবতাগণের মধ্যে ইন্দ্ৰই শ্রেষ্ঠ । তঁর উদ্দেশ্যে ঋগ্বেদে যত সূক্ত আছে। অন্য কোন দেবতার উদ্দেশ্যে তত নেই। পুরুষসূক্তে ( ১০।৯০৷১৩) ইন্দ্র ও অগ্নি পুরুষের মুখ থেকে উৎপন্ন বলা হয়েছে। অন্যত্র অদিতি তাঁর মা বলা হয়েছে। তিনি মাতৃগৰ্ভ থেকে মাতার পার্শ্বভেদ করে জন্মাবার চেষ্টা করেন । তিনি জন্মাবধিই যোদ্ধা এবং অসুরবধের জন্য সৃষ্ট হয়েছিলেন । প্ৰধান প্ৰধান অসুর যথা বৃত্ৰ, নমুচি, বল, জম্ভ, অহি, চুমুরি, ধুনি, পিপিন, শুষ্ণ প্রভৃতি তাঁর হাতেই নিহত হয়েছিল। তিনি অসুরগণের নগরসমূহ ধ্বংস করেছিলেন বলে, পুরন্দর আখ্যা পেয়েছিলেন।
ইন্দ্রের স্ত্রী শচী বা ইন্দ্ৰানী । তৈত্তিরীয়ব্ৰাহ্মণ অনুযায়ী ইন্দ্ৰ ইন্দ্ৰাণীর যৌনআবেদনে আকৃষ্ট হয়ে অন্যান্য সুন্দরীদের প্রত্যাখান করে ইন্দ্ৰাণীকে বিয়ে করেছিলেন । অন্যান্য গ্রন্থে আছে যে তিনি ইন্দ্ৰাণীর সতীত্ব নষ্ট করে তাকে বিবাহ করেছিলেন । পুলোবা তার শ্বশুর। ইন্দ্রের পুত্রের নাম জয়ন্ত ।
মহাভারতে আছে গৌতম মুনির অনুপস্থিতিতে ইন্দ্ৰ তাঁর রূপ ধরে তাঁর স্ত্রী অহল্যার সতীত্ব নষ্ট করেছিলেন। মহাভারতে আরও আছে যে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন ইন্দ্রের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে । ইন্দ্রের রেতঃ থেকে বালীরও জন্ম হয়েছিল ।
অগ্নিও ঋগ্বেদের এক প্রধান দেবতা । ঋগ্বেদে অগ্নি সম্বন্ধে যতগুলি সূক্ত আছে, ইন্দ্র ভিন্ন আর কোন দেবতার তত নেই। অগ্নি দ্যাবা পৃথিবীর পুত্র । আবার বলা হয়েছে। অরণিদ্বয় অগ্নির জনক-জননী । জাতমাত্রই অগ্নি জনক-জননীকে ভক্ষণ করেছিলেন । আবার মহাভারতে আছে যে ধর্মের ঔরসে বসুভাৰ্যার গর্ভে অগ্নির জন্ম। তিনি দক্ষের মেয়ে স্বাহাকে বিবাহ করেছিলেন। বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী অগ্নির তিন পুত্র–পাবক, পবমান ও শুচি।
অগ্নি সর্বভূক। মহাভারতে আছে। অগ্নি শ্বেতকী রাজার যজ্ঞে অতিরিক্ত হবি ভক্ষণ করে দুঃসাধ্য অগ্নিমান্দ্য রোগে আক্রান্ত হন । ব্ৰহ্মা উপদেশ দেন অগ্নি যদি সমস্ত জীবজন্তু সমেত খাণ্ডকবন দাহন করতে পারে, তা হলে রোগ থেকে মুক্তি পাবে । কিন্তু খাণ্ডববন দেবরক্ষিত বলে ইন্দ্ৰ ওতে বাধা নি । কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্যে অগ্নি খাণ্ডবদাহন করে রোগমুক্ত হন।
সূৰ্যও আর্যদের একজন উপাস্য দেবতা । নানা নামে যথা সুৰ্য, সবিতা, আদিত্য, বিবস্বান, বিষ্ণু ইত্যাদি নামে সূর্যের স্তুতি দেখতে পাওয়া যায় । যাস্ক বলেন–আকাশ হতে যখন অন্ধকার যায় ও কিরণ বিস্তৃত হয়, সেই সবিতার কাল। সায়ন বলেন, উদােয়র পূর্বে সূর্যের যে মূর্তি তাহাই সবিতা, উদয় হতে অস্ত পর্যন্ত যে মূর্তি তাহা সূর্যের উদয়গিরিতে আরোহন, মধ্য আকাশে স্থিতি, এবং অস্তাচলে অস্তগমন, এই তিনটি বিষ্ণুর পদ-বিক্ষেপ ।
সূর্য পুরুষের চক্ষু হতে উৎপন্ন। সূর্যের মাতা অদিতি । উষাকেও সূর্যের জনয়িত্রী বলা হয়েছে । আবার বলা হয়েছে সূর্য প্রণয়ীর ন্যায় ঊষার অনুগমন করেন । রামায়ণ ও মহাভারত অনুযায়ী সূর্য কশ্যপ ও অদিতির পুত্র। বিশ্বকৰ্মার কন্যা সংজ্ঞার সহিত সূর্যের বিবাহ হয় । সংজ্ঞার গর্ভে সূর্যের বৈবস্বত মনু, যম ও যমুনা নামে তিন সন্তান হয় । সংজ্ঞা সূর্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে, নিজের অনুরূপ ছায়াকে সৃষ্টি করে সূর্যের কাছে রেখে অশ্বীর রূপ ধারণ করে উত্তর কুরুতে পালিয়ে যায়। ছায়ার গর্ভে সূর্যের সাবৰ্ণি মনু ও শনি নামে দুই পুত্র ও তপতী নামে এক কন্যা হয়। পরে সূর্য যখন সংজ্ঞার শঠতা বুঝতে পারে তখন অশ্বরূপ ধারণ করে উত্তর কুরুতে গিয়ে সংজ্ঞার সঙ্গে মিলিত হয় । এর ফলে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের জন্ম হয়। মহাভারত অনুযায়ী সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয় । ঋক্ষরজার গ্রীবায় পতিত সূর্যের বীর্য থেকে সুগ্ৰীবের জন্ম হয় ।
