তন্ত্রগ্রন্থসমূহ সব একই পন্থাবলম্বী নয়। বলা যেতে পারে যে, যত গ্ৰন্থ তত পন্থ । মোট কথা, সব তন্ত্রের উপাস্য দেবতা ও উপাসনাপদ্ধতি এক নয়। কারুর উপাস্য দেবতা শিব, কারুর শক্তি, কারুর বিষ্ণু, কারুর সূর্য, আবার কারুর গণপতি । এই উপাস্য দেবতার বিভেদ অনুযায়ী উপাসকদের শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর ও গাণপত্য নামে অভিহিত করা হয়। তবে এদের মধ্যে শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণবরাই সংখ্যায় অধিক । এই সব মূল সম্প্রদায় ছাড়া. আবার বহু উপসম্প্রদায় আছে । নানা শাখা-উপশাখায় বিভক্ত হওয়ার দরুন, তন্ত্র সম্বন্ধে কোন সঠিক ধারণা করা খুব কঠিন । বস্তুত তল্পের জগৎ অতি জটিল জগৎ । তবে তন্ত্রের উপাসনা পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এই সব বৈশিষ্ট্যের অন্তৰ্ভুক্ত হচ্ছে-মূলমন্ত্র, বীজমন্ত্র, মুদ্রা, আসন, ন্যাস, দেবতার প্রতীক স্বরূপ বর্ণরেখাত্মক যন্ত্র, সাধনার সময় মৎস, মাংস্য, মদ্য, মুদ্রা ও মৈথুন এই পঞ্চ-মকারের ব্যবহার, উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য মারণ, উচ্চাটন, বশীকরণ প্রভৃতি যট্কর্মের আশ্রয় গ্রহণ ও যোগানুষ্ঠান। তবে সব সম্প্রদায়ের উপাসনার মধ্যেই যে এ সব বৈশিষ্ট্য আছে তা নয়। যথা, যারা বামাচারী তান্ত্রিক সাধক তারাই মৎস্য, মাংস, মদ্য, মুদ্রা ও মৈথুন এই পঞ্চ-মকারের আশ্রয় গ্ৰহণ করে । নারীসঙ্গমই এই উপাসনার ভিত্তি । এই সাধনায় নারীসঙ্গমের ভূমিকা সম্বন্ধে তাঁরা যে ব্যাখ্যা করেন, তার সমস্তটাই হচ্ছে রহস্যময়, গূঢ় ও গুহ্য । তন্ত্রমতে নারীর দুই স্বরূপ-কামিনী ও জননী-একই । যাদের পক্ষে নৈতিক হিসাবের স্ত্রী ও জননী পৃথক সংস্কার, তাদের পক্ষে এ ধারণা করা খুবই কঠিন। একজন ভৈরবের ভাষায় বলি-মাতৃভাবই বল, আর কামিনী ভােবই বল, দুই তো আরোপিত ভাব, আসলে তো সে একই কামিনীর দুটি রূপ বা ভাব । গোড়াতেই তো প্ৰকৃতি কামিনী, সৃষ্টিতে সম্ভোগার্থেই তো তার সার্থকতা । তারপর যখন সৃষ্টি হয়ে গেল, সেই সৃষ্টজীবের অসহায় ও দুর্বল অবস্থায় তার লালন পালন ও বৃদ্ধির জন্যই তো জননী ভাবটি । নারীমাত্রেই পরমাপ্রকৃতি আদ্যশক্তির অংশ । মানুষ সমাজের একটা নৈতিক সংস্কারকে সনাতন সত্য বলে মেনে নিলে তত্ত্বের দিক থেকে সত্য উদ্ধার অসম্ভব হবে । প্ৰকৃতির আসল ভাব অতি গুহ্য, অনির্বচনীয় । কেবলানন্দময়ী ভাব । তার বর্ণনা নেই। এই জন্যই পরমহংসদেব এক সময় মা ঠাকরুণকে ‘আমি’ তোমার কে ?’–এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন–’তুমি আমার আনন্দময়ী গো ।’
তান্ত্রিক সাধনায় তিনটি অধিকারভেদ আছে। উত্তম, মধ্যম ও অধম অধিকারভেদে দিব্যাচার, বীরাচার ও পশ্বাচার। ভোগ না হলে, ত্যাগ আসে না, সেজন্যই তান্ত্রিক সাধনার প্রথম ধাপ পশ্বাচার। এই ধাপে সাধক কামকে সম্পূর্ণভাবে জয় করেন। পশ্বাচারের পর সাধক বীরাচারে প্রবৃত্ত হয় । এই সাধনায় ভয়ের ভাব মন থেকে দূর হয়ে যায়। অমাবস্যার নিশায় শবের ওপরে বসে সাধনায় প্ৰবৃত্ত হয় । পাশমুক্ত হওয়াই এই সাধনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। যখন সকল পাশগুলিকে সাধক মন থেকে সমূলে উৎপাটিত করে, তখন সে দিব্যাচারে প্রবৃত্ত হয়। তখনই সে প্ৰকৃত শক্তির অধিকারী হয় । তান্ত্রিক সাধনায় মৈথুন কামমার্গ নয়। মৈথুন সম্বন্ধে শিবের মুখ দিয়ে তন্ত্রে বলা হয়েছে :
‘মৈথুনং পরমং তত্ত্বং সৃষ্টিস্থিত্যন্তকারণম ।
মৈথুনাজায়তে সিদ্ধি ব্ৰহ্মজ্ঞানং সুদুর্লভম্ ৷।
রেফন্তু কুণ্ডমাভাস: কুণ্ডমধ্যে ব্যবস্থিতঃ ।
মকারাশ্চ বিন্দুরূপে মহাযোগৌ স্থিতঃ প্রিয়ে ৷।
আকারহংসমারুহ্য একতা চ যদঃ ভবেৎ ।
তদা জাতং মহানন্দং ব্ৰহ্মজ্ঞানং সুদৰ্লভম ।।
বস্তুতঃ তন্ত্রগ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে যে ‘মৈথুন’ ছাড়া কুলপূজা হয় না । যেমন গুপ্তসংহিতায় বলা হয়েছে-“কুলশক্তিম বিনা দেবী যো জপেত স তু পামর ।” আবার বলা হয়েছে যে, সে নারী নিজের স্ত্রী হলে চলবে না । এ সম্বন্ধে নিরুত্তরতন্ত্রে বলা হয়েছে ‘বিবাহিতা পতিত্যাগে দুষণমন কুলার্চনে।’ তার মানে কুলপূজার জন্য সধবা স্ত্রীলোক যদি তার পতিত্যাগ করে, তবে তার কোন দোষ হয় না । মাত্ৰ সধবা হলেই চলবে না । সে ষোড়শী, সুন্দরী, কামবর্জিতা ও বিপরীতরমণদক্ষ হওয়া চাই । ( ‘বিপরীতরতা সা তু ভাবিত হৃদয়োপরি’ ) । এরূপ কুলপূজায়রত নারীকে কুলনায়িকা বলা হয়। কুমারীতন্ত্রে বলা হয়েছে যে নটী, কাপালিকা, বেশ্য, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, মালাকার কন্যা, নাপিত স্ত্রী, রাজকী ও গোপালকন্যা, এই নববিধ কন্যাই এই কার্যে প্ৰশস্ত । বিকলাঙ্গী, বিকৃতাঙ্গা, সন্দিগ্ধচিত্তা, বৃদ্ধা, পাপযুক্ত, হুঙ্কারকারিণী, অর্থলুব্ধ, অভক্তিচিত্তা এবং কাতরা রমণীকে এই কার্যে ত্যাগ করবে। কুলচুড়ামণিতন্ত্রে বলা হয়েছে বিশেষভাবে লীলাচাতুর্য থাকলে যাবতীয় কুলাঞ্জনাই শক্তিরূপে গৃহীত হতে পারে। ( বিশেষবৈদদ্ধ যুতঃ সৰ্ব্ব এব কুলাঙ্গনা ) । কুলচূড়ামণিতন্ত্রে আরও বলা হয়েছে যে, অন্য রমণী যদি না আসে তা হলে নিজের কন্যা, নিজের কনিষ্ঠ বা জ্যেষ্ঠা ভগিনী, মাতুলানী, মাতা বা বিমাতাকে নিয়ে কুলপূজা করবে । ( অন্যা যদি ন গচ্ছেত্তু, নিজকন্যা নিজানুজা । অগ্ৰজা মাতুলানী বা মাত৷ বা তৎ সপত্নিকা ৷ পূৰ্বাভাবে পরা পূজ্যা মদংশা যোযিতো মতাঃ। এক চেৎ কুলশাস্ত্রজ্ঞ পূজার্হা তত্ৰ ভৈরব ।।’
