কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করাই তান্ত্রিক সাধনার উদ্দেশ্য। এই শক্তি মূলাধারস্থ পদ্মমৃণালে (যোনিমূলে ) কুণ্ডলাকারে সর্পবৎ সুপ্ত অবস্থায় নিহিত থাকে । জাগ্রত করলে ইহা দেহস্থ সূক্ষ্মতন্তুবৎ ও সুষুম্না নাড়ীর ( মেরুদণ্ড ) মধ্য দিয়ে ছয়টি পদ্ম বা চক্রের পথে প্রবাহিত হয়, ও একে জাগরিত করে । (‘আদৌ পু্রকযোগেন স্বাধারে যোজয়েন্মনঃ। গূদমেঢ্রান্তরে শক্তিং তামাকুঞ্চ্য প্ৰবোধয়েৎ’ ।। ) শ্ৰীশ্ৰীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গে বিবৃত হয়েছে — “ইহজন্মে এবং পূর্বপুর্ব জন্মান্তরে যত মানসিক পরিবর্তন বা ভাবজীবের উপস্থিত হইতেছে ও হইয়াছিল তৎসমূহের সূক্ষ্ম শারীরিক প্ৰতিকৃতি অবলম্বনে অবস্থিত মহা ওজস্বিনা প্রেরণাশক্তিকেই পতঞ্জলি প্রমুখ ঋষিগণ ঐ আখ্যা প্ৰদান করিয়াছেন । যোগী বলেন উহা বদ্ধ জীবে প্ৰায় সম্পূর্ণ সুপ্ত বা অপ্ৰকাশিত অবস্থায় থাকে । উহার ঐরূপ সুপ্তাবস্থাতেই জীবের স্মৃতি কল্পনা ইত্যাদি বৃত্তির উদয় । উহা যদি কোনরূপে সম্পূৰ্ণ জাগরিত বা প্রকাশ্যাবস্থা প্ৰাপ্ত হয় তবেই জীবকে পূর্ণজ্ঞান লাভে প্রেরণ করিয়া শ্ৰীভগবানের সাক্ষাৎ করাইয়া দেয় ।”
রাত্রিকালে সাধক ‘আমি শিব’ ( ধ্যাত্বা শিবোহমতি’ ) এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে নগ্ন অবস্থায় নগ্ন রমণী রমণ করত ( “ততে নগ্নাং স্ক্রিয়ং নগ্নং রমণ ক্লেদযুতোহপি বা” ) রাত্রির তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত নিজ সাধন কার্যে লিপ্ত থাকবে । কুলাৰ্ণবতন্ত্র অনুযায়ী এই সাধন-প্রক্রিয়া কি, তা আমি আর বাংলায় অনুবাদ করব না । মূল সংস্কৃত শ্লোকই এখানে উদ্ধৃত করছি—
“আলিঙ্গনং চুম্বনঞ্চ স্তনয়োর্মদনস্তথা ।
দর্শনং স্পৰ্শণং যোনেৰ্বিকাশে লিঙ্গঘর্ষনম্ ।।
প্ৰবেশ স্থাপনং শক্তের্ণব পুষ্পানিপূজনে” ।
সাধারণ পাঠককে তন্ত্রের গুহ্য রহস্যময় জগতে আর নিয়ে যেতে চাই না । সেজন্য এ সম্বন্ধে এখানেই থেমে যাচ্ছি ।
।| সাত ।।
বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবতামণ্ডলীর ন্যায়, হিন্দু তান্ত্রিক দেবতামণ্ডলীতেও অসংখ্য দেবদেবী আছেন । তবে তাঁদের মধ্যে দশমহাবিদ্যাই হচ্ছেন প্ৰধান । এই দশমহাবিদ্যা হচ্ছেন- “কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী । ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধূমাবতী তথা । বগল সিদ্ধবিদ্যা চ মাতঙ্গী কমলাত্মিকা । এতা দশমহাবিদ্যাঃ সিদ্ধবিদ্যাঃ প্ৰকীৰ্ত্তিতাঃ।” এই সকল দেবতার ধ্যানমন্ত্র থেকে আমরা তাদের আকৃতির পরিচয় পাই। কালী উলঙ্গিনী, সহস্যবদনা, চতুর্ভূজা, কৃষ্ণবর্ণা, দিব্যরূপিণী, গলদেশে নরমুণ্ডমালা, বামভাগের নীচের হাতে অভয়মুদ্রা ও ওপর হাতে বরমুদ্রা । তিনি শিবরূপ শবের ওপর দণ্ডয়ামান । তারা ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা খর্ব, লম্বোদরী, ভয়ঙ্করাকৃতি, গলদেশে নরমুণ্ডরচিত মালা, চতুর্ভূজা ও নবযুবতীরূপা । শবহৃদয়ে তাঁর বাম পদ বিন্যস্ত। ষোড়শী ‘বালাকমণ্ডলাভাসাং চতুর্বাহুংত্ৰিলোচনাম্। পাশাংকুশ শরাংশ্চাপান্ ধারয়ন্তীং শিবং ভজে”। ভুবনেশ্বরীর উদিত সূর্যের ন্যায় দেহকান্তি, কপালে অর্ধচন্দ্র, মস্তকে মুকুট, পীনোন্নত পয়োধরা, ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সহাস্যবদন । ভৈরবীর উদয়কালীন সূর্যের ন্যায়৷ দেহকান্তি, কপালে অর্ধচন্দ্র, রক্তবর্ণা, ক্ষৌমবস্ত্ৰপরিহিতা, গলায় মুণ্ডমালা, রক্ত অনুলিপ্তস্তনা, মাথায় মুকুট ও চতুর্ভূজা। তাঁর হাতে যথাক্রমে জপমালা, পুস্তক, অভয়মুদ্রা ও বরমুদ্রা আছে। ছিন্নমস্তার সদা ষোড়শবর্ষীয়া যুবতীর ন্যায় আকৃতি, স্তনদ্বয় স্থূল ও উন্নত, আলুলায়িত কেশ, বিবসনা ও ভয়ঙ্করী। তিনি বাম করে আপনি ছিন্নমস্তক ধারণ করেন ও নিজকণ্ঠোত্থিত রক্ত পানে রত। ধূমাবতী ‘বিবর্ণা চঞ্চলা রুষ্টা দীর্ঘা চ মলিনাম্বরা । বিবর্ণকুন্তলা রক্ষা বিধবা বিরলাদ্বিজা ৷’’ ইনি কাকধ্বজ রথে আরোহণ করে থাকেন । বগলা সুধাসাগর মধ্যে মণিময়মণ্ডপো রত্ননির্মিত বেদীর ওপর সিংহাসনে উপবিষ্টা, পীতবর্ণা, মাল্য বিভূষিতা দ্বিভূজা ও পীতবর্ণ বস্ত্ৰ পরিহিতা । মাতঙ্গী শ্যামবর্ণা, অর্ধচন্দ্ৰদ্ধারিণী ও ত্রিনয়না। ইনিও রত্ননির্মিত সিংহাসনে উপবিষ্টা । কমলার দেহকান্তি কাঞ্চনের ন্যায়। তিনি চতুর্ভূজা, তাঁর মস্তক রত্নমুকুটে বিভূষিতা । তাঁর করে পঞ্চবস্তু ও তিনি পদ্মের ওপর উপবিষ্টা ।
তান্ত্রিক সাধকরা তাদের সাধনা করেন বীজমন্ত্র ও যন্ত্রের সাহায্যে । কয়েকটি যন্ত্রের নাম যথা, নবদুর্গা যন্ত্র, ত্রিপুরা যন্ত্র, বিন্ধ্যবাসিনী যন্ত্র, কালী যন্ত্রম্, শিব যন্ত্রম্ ইত্যাদি। এ সকল যন্ত্রের অর্থ যেমন গূঢ়, বীজমন্ত্রসমূহও তাই । যেমন কালীর বীজমন্ত্র হচ্ছে–“ক্রাং ওঁ ক্ৰীং কালিকায়ৈ স্বাহা ।” তারার বীজমন্ত্ৰ—“ওঁ হ্রং স্ত্রীং হুং ফট।” এ সকল বীজমন্ত্রের ভাষা সহজে বোধগম্য নয়। ভাষা বোধ হয় আদিম কালের হবে ।
।। আট ।।
তন্ত্রের ধর্ম যে মাত্র বৌদ্ধদের প্রভাবান্বিত করেছিল তা নয় । সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণব ধর্মকেও প্রভাবান্বিত করে বৈষ্ণব সহজিয়া সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেছিল । শ্ৰীচৈতন্য প্রেমের ধর্ম প্রচার করেছিলেন । সে ধর্ম স্বমহিমার ধর্ম । তিনি নিজের মধ্যেই কৃষ্ণ ও রাধা- এই উভয়ের সত্তা অনুভব করেছিলেন । ‘কৃষ্ণের যতেক খেলা, সর্বোত্তম নরলীলা, নরবাপু তাঁহার স্বরূপ।’ কিন্তু চৈতন্যোত্তরকালে বৈষ্ণবরা প্রেমের সঙ্গে কামের সমীকরণ করে ফেলেন। তাঁরা নররূপ স্বরূপকে কৃষ্ণ ও নারীরূপ স্বরূপকে রাধা বলে উঠলেন । রূপের মিলনে যখন স্বরূপের মিলন সংঘটিত হবে, তখনই আসবে অনাবিল সাম্যরসের অনুভূতি । এর ফলে সমাজে ব্যভিচারের প্লাবন ঘটে। ব্যভিচারের স্রোত তো আগে থেকেই এসেছিল যখন কপট হিন্দু তান্ত্রিকরা সাধক সেজে তন্ত্রবচনের দোহাই দিয়ে নারীকে প্ৰলুব্ধ করত সাধিকা হতে । এই ব্যভিচারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে দক্ষিণাচারীরা । এরা তন্ত্রের অপর এক সাধক-সম্প্রদায় । এরা বামাচারীদের মত পঞ্চমকারের সাহায্যে সাধনা করেন না । এরা নিজের স্বরূপে মধ্যেই শক্তির স্বরূপ উপলব্ধি করেন। শিবগমে বলা হয়েছে—’শক্তি শিবঃ শিব শক্তিঃ শক্তি ব্ৰহ্মা জনাৰ্দন । শক্তিরিদ্রো রবিঃ শক্তিং শক্তিশ্চন্দ্রো গ্ৰহা ধ্রুবম্। শক্তিজপং জগৎ সর্বম্ যে ন জানাতি নারকী ।” তার মানে–‘শক্তিই শিব, শিবই শক্তি, ব্ৰহ্মা শক্তি, জনাৰ্দন শক্তি, ইন্দ্ৰ শক্তি, সূর্য শক্তি, চন্দ্ৰ শক্তি, গ্ৰহগণ শক্তি স্বরূপ, অধিক কি, এই নিখিল জগৎকেই যে শক্তিরূপে বুঝিতে পারে না, সে নরকগামী ।’
