“একদম ছোট একটা স্কুল, সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল একশ জনের মত। প্রত্যেক গ্রেডে বিশ জনেরও কম। কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটিতে পুলে সবসময় ভিড় থাকত।”
সূর্যের সাদা আলোকরশ্মির ভেতর বাচ্চারা সারাক্ষণ পুলে দাপাদাপি করত। পুলে শুয়ে কান পানির নিচে দিয়ে রাখলে পাহাড় থেকে ভেসে আসা পোকামাকড়ের ঝিঁঝি শব্দ শুনে মনে হত যেন দেয়াল টেয়াল ভেঙে পড়ছে।
“পুলের আশেপাশে সবসময় দুই-চারজন বয়স্ক মানুষ থাকত যারা খেয়াল রাখত যেন কোন বিপদ না ঘটে। কখনো শিক্ষকেরা, কখনো কখনো অভিভাবকেরা এই দায়িত্ব পালন করত। বেশিরভাগ সময়ই কিছু ঘটত না। তারা স্রেফ পাশের ছাউনির বেঞ্চে বসে একজন আরেকজনের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে থাকত।
একদিন দুই বোন ঠিক করল পানিতে ডোবার ভান করে বড়দের চমকে দেবে। তারা উপুড় হয়ে দমবন্ধ করে পানিতে ভেসে থাকল, দেখে যেন মনে হয় মরে ভেসে আছে।
আশেপাশের হৈচৈ করা ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিশ্চয়ই ওদেরকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল। দুটো মেয়ে উপুড় হয়ে পানিতে ভাসছে, তাদের লম্বা কালো চুল সামুদ্রিক আগাছার মত চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কোন নড়াচড়া নেই। দম শেষ হয়ে এলে ওরা মাথাটা অল্প তুলে দম নিয়ে আবার মরে যেত।
“আমরা যা আশা করেছিলাম তারচেয়ে প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল।”
পাহারায় ছিল ওদের কয়েকজন ক্লাসমেটদের মা। ওনারা যখন ওদেরকে অনড় ভাসতে দেখলেন তখন একজন লাফিয়ে উঠে চিৎকার শুরু করলেন। সব ছেলেমেয়ে চমকে বেঞ্চের দিকে তাকাল। ছোট বাচ্চারা যারা দাপাদাপি করছিল, একটু বড়রা যারা সাঁতার প্র্যাকটিস করছিল সবাই বুঝতে পারল কোন অঘটন ঘটেছে। আরেকজন মহিলা যিনি চিৎকার করেননি তিনি ওদের বাঁচাতে দৌড় দিলেন। কিন্তু পুলের পাশে দৌড়ানো বিপজ্জনক।
“মহিলা পিছলে পড়ে মাথায় বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যে মহিলা চিৎকার করেছিলেন তিনি গেলেন এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে। ইয়ু আর আমি দম শেষে উঠে দেখি আশেপাশের সবাই আতঙ্কে আছে। মনে হচ্ছিল যেন নরক নেমে এসেছে। ছোট বাচ্চারা ভয় পেয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। অজ্ঞান মহিলার পাশে একটা ছেলে তার মায়ের কাঁধ ধরে মা মা করে ঝাঁকাচ্ছিল। ছেলেটা আমাদেরই একজন ক্লাসমেট ছিল।”
যমজ দু-জন একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারপর টু শব্দ না করে তাড়াতাড়ি পুল থেকে উঠে পালিয়ে গেল। পরনের ভেজা পোশাকও বদলালো না।
“আমরা পেছনের দরজা দিয়ে বের হলাম। আমাদের এক হাতে ব্যাগ, ভেতরে কাপড় আর ভোয়ালে। আরেক হাতে জুতো। সুইমস্যুট পরা অবস্থায় ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড় লাগালাম আমরা। দূর থেকে শুনতে পেলাম এ্যাম্বুলেন্সের পর এ্যাম্বুলেন্স আসছে। ঐ মহিলা কয়জনকে ডুবতে দেখেছিল কে জানে? অন্তত পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স এসেছিল সেদিন।”
স্কুলটা ছিল পর্বতের গোড়ায়, পাশ দিয়ে যতদূর চোখ যায় খালি ধান ক্ষেত। সবুজ চারাগুলো পুরো এলাকার উঁচু নিচু মাটি ঢেকে রেখেছিল। মনে হত যেন সমতল ভুমি। যমজ মেয়ে দুটো সেই ধানক্ষেতের পাশের পথ ধরে হেঁটে গেল।
“ধারালো ঘাসে আমাদের পা কেটে গিয়েছিল।”
অ্যাম্বুলেন্স স্কুলে পৌঁছানোর পরে কি হয়েছিল সে ব্যাপারে ওদের কোন ধারণা ছিল না। ওরা সেটা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাও করেনি। বাড়ি ফিরে খেয়ে ঘুম দিয়েছিল।
“সেবারই যে শুধু আমরা মরা মরা খেলেছিলাম তা নয়। আমরা একজন আরেকজনের মুখে কেচাপ ছিটিয়ে ভান করতাম যেন সেটা রক্ত।”
ওরা রেফ্রিজারেটরের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুলে কেচাপ নিয়ে একজন আরেকজনের মুখে মাখিয়ে দিত। ওদের ফ্যাকাসে সাদা ত্বক কেচাপে লাল হয়ে যেত।
“কেচাপ গড়িয়ে পড়তে লাগলে আমরা তা চেটে চেটে খেতাম। তারপর এক সময় বিরক্ত হয়ে গেলে সসেজ দিয়ে মাখিয়ে খেয়ে ফেলতাম।”
আরেকবার তারা ঘর থেকে একটা মিট সসের ক্যান নিয়ে এসেছিল।
ওদের বাড়ি থেকে অল্প খানিকটা দূরে একবার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া একটা ছেলে গাড়ি চাপা পড়ে সেখানে মারা যায়। ইয়ু সেই জায়গায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।
‘শুরু কর,” সে বলল। আর আমি ওর মুখের উপর ক্যানের পুরো মিট সস ঢেলে দিলাম। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে এসেছে। আমি ইয়কে বললাম যাই ঘটুক না কেন ও যেন একদম নড়াচড়া করে। ও আস্তে করে মাথা নেড়ে সায় দিল। চোখ বন্ধ করে ছিল যেন সস চোখে না ঢোকে।”
ইয়োরু গিয়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকল। কখন কে এসে দেখে চিৎকার করে উঠে সে অপেক্ষায় থাকল। বাচ্চারা যখন দেখল, বড়দের মত অতটা অবাক হলো না। তারা কাছে এসে দেখে ধরে নিয়েছিল কোন ধরনের খেলা হবে বা কিছু।
“এমনকি বড়রাও দেখে প্রথমে চিৎকার করলেও একটু পরেই ধরে ফেলেছিল যে জিনিসটা মিট সস। তারপর তারা হেসে ফেলত। আমরা এরকম কান্ডকারখানা অনেক করেছি আগে, প্রতিবেশিরা সবাই জানত আমাদের শয়তানি।”
“কোন গাড়ি যায়নি?”
যেহেতু ওখানে আগে ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তার মানে কোন না কোন সময় তো সেখান দিয়ে গাড়ি যাওয়ার কথা। আর ইয়ু রাস্তায় পড়েছিল, বিপদ হতে পারত।
আমি যখন প্রশ্নটা করলাম, মোরিনো কোন অনুভূতি না প্রকাশ করে বলল, “একটা গাড়ি এসেছিল। ইয়ু চোখ বন্ধ করে ছিল তাই টের পায়নি। গাড়িটা ওর সামনে এসে কষে ব্রেক করে থেমেছিল। গাড়ি থামার শব্দে ইয়ু উঠে বসেছিল। মুখ থেকে সস মুছে তাকিয়ে দেখে মুখের সামনে গাড়ির বাম্পার। বাম্পারটা সিলভার পলিস করা ছিল, ওর চেহারার প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল..”
