বিশাল জেনারেল স্টোরের আশেপাশে একদমই কিছু ছিল না। শুধু খোলা মাঠ আর শুকনো ঘাসে ঢাকা খালি জায়গা। সেগুলোর মাঝ দিয়ে নতুন পিচ ঢালা পথ এগিয়ে গিয়েছে। একসময় হয়তো এখানে অনেক কিছু হবে, সময় লাগবে তার জন্য।
রাস্তার এক পাশে বেঞ্চ বসানো বাসস্টপ ছিল, মোরিনো গিয়ে সেখানে বসল। যেসব বাস এখানে থামে তার একটা ওর বাসার দিকে যায়।
সূর্য নিচের দিকে নামছিল। আকাশ তখনো নীল। খালি মেঘগুলো গোলাপি রং ধারন করেছে।”তোমার বোন সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?” আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম। সে চুপচাপ বসে থাকল। কোন উত্তর দিল না।
রাস্তায় খুব একটা গাড়ি ছিল না। মাঝে মধ্যে দু-একটা শশা শো করে চলে যাচ্ছিল। বেশিরভাগ সময়ই খালি চওড়া পিচঢালা রাস্তা আর গার্ড রেইলের পরে শুকনো মরা ঘাসসহ ধুধু প্রান্তর। অনেক দূরে একটা আয়রন টাওয়ার, দিগন্তে বিন্দুর মত ফুটে আছে।
“কী জানতে চাও?” সে একসময় বলল।
২
“ইয়ু মারা গিয়েছিল যখন আমরা সেকেন্ড গ্রেডে পড়ি। তাই আমার খালি ওকে ছোট অবস্থাতেই মনে আছে। এমনকি যখন ওর বয়স আট বছরও নয়…সে সময় আমরা গ্রামে থাকতাম। সেখানে চারপাশে খামারের পর খামার ছাড়া আর কিছু ছিল না।”
ওদের বাড়ি ছিল এক পর্বতের ঢালে। পেছন দিকে বন, বাড়ি থেকে বনে পাখিদের ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যেত।
“ইয়ু আর আমি একই রুমে এক বিছানায় ঘুমাতাম। যখন রাত হত আর আমরা ঘুমাতে যেতাম তখন বিছানায় শুয়ে বাইরে অন্ধকারে প্যাঁচার ডাক শুনতে পেতাম।”
বাড়িটা ছিল পুরনো, কাঠের তৈরি। মেঝে, পিলার সব কিছু বয়সের ভারে কালো হয়ে গিয়েছিল। আগাছা জন্মেছিল ছাদের টাইলসের ফাঁকে। বাড়ির আশেপাশে ভাঙা টাইল্স পড়ে থাকত। অবশ্য বাড়িটা বেশ বড় আর আরামদায়ক ছিল। তাতামি ফ্লোর ছিল-সব রুমে, শুধু কিচেন বাদে। কিচেনে পরে লাগানো হয়েছিল। যমজ মেয়ে দুটো, ইয়োরু আর ইয়ু ঐ বাড়িতে তাদের বাবা-মা আর নানা-নানির সাথে বাস করত।
মোরিনোর বাবা প্রতিদিন দুই ঘন্টা ড্রইভ করে শহরে যেতেন কাজের জন্য। ওর নানা-নানিও বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকতেন। ধানক্ষেতে পানি দিতেন কিংবা ছাউনি থেকে কৃষিকাজের জিনিসপত্র আনা-নেয়া করতেন। মাঠ আর ধানক্ষেতগুলো বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের মত হাঁটা দূরত্বে ছিল। ওরা যেসব ডায়কন আর বাঁধাকপি খেত সেগুলো এই ক্ষেতেই চাষ হতো।
“কিন্তু আমাদের ক্ষেতের ডায়কন দোকানের ডায়কনের মত দেখতে এত সুন্দর হত না। আর একটু হলদেটে ধরনের ছিল।”
উঠোনে অনেক গাছ ছিল। উঠোনের খোলা মাটি বৃষ্টি হলে কাদার পুকুরে পরিণত হতো। বৃষ্টির সময় বাইরে গেলে মনে হত মাটি জোর করে টেনে আছাড় খাওয়াতে চায়।
বাড়ির বামদিকে ছিল ছোট্ট একটা ছাউনি, বাড়ির দেয়াল ঘেঁসে দাঁড় করানো। কৃষিকাজের সব যন্ত্রপাতি ওখানে রাখা হতো। ছাউনির ছাদটা এক টাইফুনের সময় উড়ে গিয়েছিল। সেটা ঠিক না করে বরং উপরে শ্রেফ একটা নীল রঙের তারপুলিন বিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটার ফুটো দিয়ে পানি পড়ত কিন্তু ছাউনির ভেতর যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কিছু না থাকায় কোন সমস্যা হয়নি।
“আমি আর আমার বোন সারাক্ষণ খেলাধুলা করতাম।”
যখন ওরা এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকল তখন হাত ধরাধরি করে পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেত। পাহাড়ি পথটা ছিল সরু আর প্রচুর বাতাস। পথের একধারে ঢাল খাড়া উপরে উঠে গিয়েছিল, সেইসাথে গাছপালায় ভর্তি। অন্য দিকেও গাছপালা ছিল কিন্তু সেগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে দূরের দৃশ্য দেখা যেত। পথের উপর মরা বাদামি পাতা পড়ে থাকত, বৃষ্টির সময় পেছল করে তুলত। লম্বা গাছগুলোর ডালপালা সূর্যের আলো আসতে বাঁধা দিত। যে কারনে পথটা সবসময়ই কেমন ভ্যাপসা আর গুমোট হয়ে থাকত।
“পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে স্কুলে যেতে হতো, সেটা আমাদের জন্য সহজই ছিল। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় আমরা হাঁপিয়ে কাহিল হয়ে যেতাম।”
ইয়োরু আর ইয়ুর চেহারা ছিল হুবহু একইরকম। চোখের নিচের তিল পর্যন্ত একই জায়গায়, দু-জনেরই একইরকম কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন চুল। আর ওরা প্রায় সময়ই একইরকম পোশাক পড়ত। আমার কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছিল না যে, একই রকম দেখতে দুটো মেয়ে হাত ধরাধরি করে সবুজে ঢাকা পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
“আমরা দেখতে একইরকম ছিলাম। এমনকি আমাদের মা পর্যন্ত আমাদেরকে আলাদা করে চিনতে পারত না। মাঝে মাঝে গোসল করার সময় আমরা পোশাক খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম।”
সেসময় ওদের মা ঠাহর করতে পারতেন না কে বড় আর কে ছোট।
“কিন্তু আমাদের অভিব্যক্তি আর স্বভাবে পার্থক্য ছিল। তাই আমরা কথা বললেই সবাই বুঝে ফেলত।”
ছোটবেলায় ওদের মা ওদেরকে আলাদা করে চিনতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকলে ইয়ুর খুব মজা লাগত। আর ঠিক যখনই বোঝা যেত ইয়ু মজা পাচ্ছে তখনই ওদের মা ধরে ফেলে বলতেন, “এই যে এটা ইয়োর, আর ওটা ইয়ু।”
ইয়ু সবসময়ই তার বড় বোনের চেয়ে সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করত। ও যখন ওর বাবা-মায়ের সাথে কথা বলত, সবসময় হাসিমুখ করে রাখত।
“সেসময় আমাদের প্রিয় খেলা ছিল ছবি আঁকা আর মরার ভান করা।”
গ্রীষ্মের ছুটিতে এলিমেন্টারি স্কুলের সুইমিং পুল খোলা ছিল আর ওরা সেখানে যতক্ষণ চাইত সাঁতার কাটতে পারত।
