জাহেদ বকসু কিসের বলে দাসের খাতায় তাকে দিয়ে দাসখত লিখাতে চায়? টাকার বলে? আর ভাবতে পারে না। গলা দিয়ে রক্ত আসতে চায়। অগ্নিময়ী চিন্তা তার বুকের ভেতর।
সুফিয়ার শরীর দিনে দিনে ভারী হয়ে উঠেছে। তার অস্বস্তি বাড়ছে দিন দিন। উদরের দেয়ালের মাংসল আবেষ্টনীতে অন্তরালবর্তী সন্তান আঘাত করছে। হাসিমের রক্ত-মাংস-বীর্যের প্রভাবে সুফিয়ার মধ্যে আরো একটা প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
আরেকটা বাড়তি প্রাণের ভার সুফিয়া কিছুতেই ধরতে পারছে না। অনাগত শিশুর দায় মেটাতে গিয়ে সুফিয়া নড়তে পারছে না, চড়তে পারছে না। সারা শরীর কাঁচা হয়ে উঠেছে। কাঁচা শরীর নিয়ে শুয়ে আছে। স্ফীত উদরের কাছটিতে পরনের বসন খসে পড়েছে। জ্বলজ্বলে মসৃণ তৈলাক্ত তলপেটের দিকে চেয়ে ফলবান সবুজ কোনো শষ্যক্ষেতের কথা চিন্তা করে। একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। চেয়ে চেয়ে আশ মেটে না। পিড়ি থেকে উঠে সুফিয়ার বিস্রস্ত বসন ঠিক করে দেয়। এ উথলানো সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখার অধিকার যেনো অন্য কারো নেই।
এক ছিলিম তামাক কল্কিটাতে ভরে আগুনের জন্য বাইরের মালসাটার খোঁজ করতে গিয়ে দেখলো জোহরা কাঁঠাল গাছের পাশ দিয়ে হাসিমকে দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যাচ্ছে। হাসিম ডাক দিলো। জোহরার মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেলো। সে রাতের পর জোহরা আর কোনোদিন হাসিমের সামনে আসে নি। সুফিয়াকে দেখতে এসেছিলো। অন্যান্য দিন, এ সময়ে হাসিম ঘরে থাকে না। হাসিমকে দেখে তার ডাক শুনে ভয়ে বুকটা চুরচুর করে। যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো হাসিমের সামনে এসে দাঁড়ালো। কাঁপছে। বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছে কাঁপুনি, জীবনে কোনোদিন থামবে না।
“কি, আইয়্যারে চলি যর ক্যা জোহরা?” (কি জোহরা, এসে চলে যাচ্ছো কেন?)।
হাসিম জিজ্ঞেস করে। জোহরা জবাব দেয় না।
“কি, কথা ন কস ক্যা? (কি, কথা কও না কেন?)
“হাসিম বাই, কি কথা কইতাম?” (হাসিম ভাই, কি কথা বলবো?)
জোহরা জবাব দেয়। জোহরার চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নামে। ফোঁটা ফোঁটা পানি টস টস করে গণ্ডদেশে ঝরে পড়ে। হ্যাঁ জোহরার বলার কোনো কথা নেই। সকল কথা সে রাতে– তার বুকের ফুলের স্তবকের মতো গোপন গভীর সকল কথা, তার চাচা খলু আর দারোগা মিলে থেঁতলে দিয়ে গেছে। হাসিম পৃথিবীতে তার একমাত্র সাক্ষী।
গা ঘোয় নি জোহরা। চুল বাঁধে নি। পরনে কাপড়খানা মলিন। এলোমেলো রুক্ষ চুল বাতাসে উড়ছে। দু’চোখে একটু আগে পানি ঝরেছে। টলটলে চোখের মণি আর ফর্সা সুগৌর মুখোনিতে কী এক থমথমে বিষণ্ণতা। কী অপরিসীম ক্লান্তি। ক্লান্তির ভারে লুটিয়ে পড়েছে জোহরা। পৃথিবীতে কেউ আর তার ভার ধরতে পারবে না। ভারসাম্য চিরদিনের মতো সে হারিয়ে ফেলেছে। পুরোনো কক্ষপথে সে ফিরে আসবে না, আসতে পারবে না। হাসিমের মুখোমুখী দাঁড়াবার কোনো সাহস জোহরার নেই। টলতে টলতে পালিয়ে গেলো। হাসিমের দৃষ্টি থেকে নয়, সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি থেকে পালিয়ে যেতে পারলে সে যেন বাঁচে।
হাসিম কল্কিটা মেটে হুঁকোর ‘গাপ্টায় বসিয়ে ক’টা মরা টান মারে। ধোঁয়া বেরোয়। আরো ক’টা টান মারে। প্রবৃত্তি হয় না। চিন্তার অতন্দ্র প্রহরীরা তাকে ঘিরে ধরেছে। একপাশে কোটা রেখে দেয়। মাথাটা ঝিম ঝিম করে। বাইরে সূর্যের ঝলমলানো রোদে হাসিম তেলীপাড়ার তেজেনের ছুরির ফলার মতো বাগিয়ে ধরা দু’চোখের দৃষ্টিকে দেখতে পায়। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ভগ্নাংশ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রামে ওলাউঠা নেমেছে। জিনিসপত্রের দাম ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। হাজেরার ছোটো আট বছরের ছেলেটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো। মরে গিয়ে বেঁচেছে। কানা আফজল, জাহেদ বকসু, অধরবাবু আর খলু মাতব্বরদের জগতে হাজেরার ছেলেদের বাঁচবার ঠাই কই?
চন্দ্রকান্ত এসে খবর দিয়ে গেছে। লোকটার মায়া-মমতা যদি কোনো মন্ত্রবলে টাকা-পয়সা অথবা ধান-চাল হয়ে যেতো তাহলে বরগুইনির দু’পাড়ের কারো অভাব-দুঃখ থাকতো না। জাহেদ বকসু, কানা আফজল, খলু মাতব্বর সকলে যদি চন্দ্ৰকান্তের মতো হয়ে যেতো, তাহলে? তাহলে কেমন হতো? কিন্তু তা হবে না, কোনও দিন না। জাহেদ বকসু আর খলু, জাহেদ বকসু খলু হয়েই জন্মগ্রহণ করেছে, আর চন্দ্রকান্ত, চন্দ্রকান্ত হয়েই জন্মগ্রহণ করেছে। অভাবে জ্বলবে, কষ্ট পাবে, দুঃখ পাবে, বুক ঠেলে পরের উপকার করতে চাইবে, দোতরা বাজিয়ে রাধা কানুর পীরিতির গান গাইবে। ওরা জোর করবে, জুলুম করবে, লাঠির জোরে পরের জমি দখল করবে, চেয়ারম্যান হবে, মেম্বার হবে। এজন্যেই তারা জন্মগ্রহণ করেছে।
দাম-ঘেরা পুকুরটার পুব পাড় পেরিয়ে আচার্য পাড়ার রাস্তায় উঠে এলো হাসিম। হাজেরার ঘর আর দূরে নয়। চেকন রাস্তার দু’ধারে বেতঝাড় আর মেহেদী কাটার বন। বেত-ঝোঁপের বাঁ দিকে ছোট্ট আধ-ভাঙা ঘরটি থেকে একটি শিশু-কণ্ঠের আওয়াজ তার কানের পর্দায় আঘাত করে। মনোমোহন আচার্যের ছোটো ছেলেটি তার মাকে জিজ্ঞেস করেঃ।
“আইচ্ছা মা, হাজেরা পিসীর পুত আবুল মরি গেইয়ে না, আজিয়া? (আচ্ছা মা, আজ হাজেরা পিসীর ছেলে আবুল মারা গেছে, না?)
“অয় পুত, অয়।” (হাঁ বাবা, মারা গেছে) মনোমোহনের বউ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয়।
“মা, আঁই একবার আবুলরে চাইবাললাই যাইতাম, তুঁই যাইবানি আঁর লগে?” (মা আমি একবার আবুলকে দেখতে যাবো, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?)
