“না রে পুত, আঁরা যাইতে পাইত্যাম নয়।” (নারে বাবা, আমরা দেখতে পারবো না।) ছেলের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে জবাব দেয় মনোমোহনের বউ।
“ক্যা মা? (কেন মা?) মনোমোহনের ছেলে শশাভন আশ্চর্য হয়ে গেলো।
“তোর হাজেরা পিসী মুসলমান, মুসলমান মইলে চাই ন পারে, নিষেধ আছে।” (তোর হাজেরা পিসী মুসলমান, মুসলমান মরলে অন্যে দেখতে পারে না, নিষেধ আছে।)
“কার নিষেধ মা?”
“ধর্মের।”
“মুসলমান মইলে চাই ন পারে? (মুসলমান মরলে অন্যে দেখতে পারে না?)
“না।”
“আঁরা মইলেও চাইত ন পারিব হাজেরা পিসীরা?” (আমরা মরলেও হাজেরা পিসীরা দেখত পারবে না?)
“না, পাইরত নয়।” (না, দেখতে পারবে না।)
“আরা কি?” (আমরা কি?)
“আরা হিন্দু।” (আমরা হিন্দু)
“মুসলমান মানুষ নয় মা?”
“মুসলমানও মানুষ, তবে মুসলমান মানুষ–”
“আর আঁরা হিন্দু মানুষ না?” (আমরা হিন্দু মানুষ না মা?)
“অয়।” (হাঁ।)
“সব মানুষ এক মানুষ নয় ক্যা মা? আঁই যে আবদুলের লগে মার্বেল খেইলতাম মা, কিছু দোষ অইব না?” (সব মানুষ এক মানুষ নয় কেন মা? আমি যে আবদুলের সঙ্গে মার্বেল খেলতাম, সেজন্য কিছু দোষ হবে?)
মনোমোহনের বউ জানায় যে, এক সঙ্গে মার্বেল খেলতে কোনো দোষ নেই।
শোভন আবার বলেঃ
“আঁর পরাণ পোড়ের মা, আঁই একবার চাইতাম যাইয়ম।” (মা, আমার প্রাণ পুড়ছে, একবার আমি দেখতে যাবো।)
“না,” দৃঢ় কণ্ঠে বলে এবার মনোমোহনের বউ।
“আইচ্ছা মা, সব মানুষ এক মানুষ নয় ক্যা?” (আচ্ছা মা, সব মানুষ এক নয় কেন?)
“ধর্ম দুই রকম, হিথার লায়।” (ধর্ম দু’রকম, তাই।)
“ধর্ম দু’রকম ক্যা?” (ধর্ম দু’রকম কেন?)
মনোমোহনের বউ সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অবোধ শিশুর অবুঝ প্রশ্ন। অধরবাবুর সোনা-রূপোয় ভর্তি আলমারী, জাহেদ বকসুর দ্রোন দ্রোন সম্পত্তি, ফয়েজ মস্তানের কেতাব কবচ, রামাই পণ্ডিতের প্রমাণ-পঞ্জি সংহিতাতে এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। তেজেনের ঝুলন্ত মৃত্যুতে এ প্রশ্নই ঝলকিত হয়ে উঠেছিলো, চোখের ভাষায়। কিন্তু হাতির মতো বলশালী তেজেনদাও অবোধ শিশুর মতো এমন সরলভাবে প্রশ্নটি তুলে ধরতে পারে নি।
হাজেরার মরা ছেলেকে দাফন করতে পাড়ার কেউ আসেনি। সেই সকালবেলা মরেছে। মরা ছেলের শিয়রে বোবা হয়ে বসে আছে হাজেরা। তার চোখের পানির ধারা শুকিয়ে গেছে। পাতার নীচে চোখের পানির মরা খালটি এখনো জেগে আছে। শোকের চেয়ে আতঙ্কটাই এখন হাজেরার বেশি। ওলাউঠার রোগী যদি কবর দিতে না পারে? খলুর দাঙ্গায় জান দিতে মানুষের অভাব হয় না। জাহেদ বকসুর ছেলের বিয়েতে বেগার খাটতে মানুষের অভাব হয় না। অভাব কেবল হাজেরার ছেলেকে কবর দেওয়ার বেলা। একা কি করতে পারে হাসিম?
কিছুক্ষণ পরে মনির আহমদ এলো, সঙ্গে কৃষক সমিতির ক’জন কর্মী। এসেই মনির আহমদ হাজেরার সামনে হাতজোড় করে বললোঃ
“আগে খবর ন পাই। হেয় কথার লায় দেরী অইয়েদে বইন। কি গইরগম, পাড়ার মানুষ ন আগায় ডরে। যুগী পাড়াত একজনেরে পোড়ন পড়িল। আরেকজনের কবর দিলাম।” (আগে খবর পাইনি তাই দেরী হয়ে গেলো বোন। কি করবো, পাড়ার মানুষ ডরে এগিয়ে আসে না। যুগী পাড়ার একজনকে পুড়তে হলো, আরেক জনকে কবর দিলাম।)
তারা কাজে লেগে গেলো। কবর খুঁড়ে ফেললো দু’জনে। আরেকজন আবুলকে গোসল দিয়ে দিলো। সে নিদারুণ অভাবের দিনে কোথায় পাবে কাফনের শাদা কাপড়। স্বামীহারা হাজেরার একমাত্র সন্তান আবুল ছেঁড়া কাপড়েই কবরে নামলো। জননী ডুকরে কেঁদে ওঠলো। আকাশ-বাতাস ছাপিয়ে প্রতিধ্বনি জাগলো।
সেদিনই মনির আহমদ এবং কৃষক সমিতির অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে হাসিমের পয়লা পরিচয়। মোহিত হয়ে গেলো হাসিম। মানুষের অন্তরে এতো দয়ামায়া থাকতে পারে? কলেরার সময় গা ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ। এক বাড়িতে কারো কলেরা লাগলে বাড়ির মানুষ উধাও। আর এরা সারাটা ইউনিয়ন ঘুরে ঘুরে দেখছে, কোথায় মানুষ মরে আছে, কোথায় মৃতের সকার হচ্ছে না। তারা হিন্দু? তারা মুসলমান? তারা কোন্ জাত? হাসিম অবাক হয়ে মনির আহমদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বেঁটে-খাটো মানুষটি। রোদের ছ্যাকা লেগে লাল হয়ে উঠেছে গাল। চুলগুলো ফ্যাড়ফ্যাড়ে। এলোমেলো বাতাসে উড়ছে। ক’দিন গোসল করে নি, ক’দিন ঠিকমতো খায় নি তার হিসাব নেই। গায়ে একটা চেক চেক-হাফশার্ট। তাতে বিস্তর ময়লা। তবু কাজে এতোটুকু বিরক্তি নেই। স্বভাবে একটুও অহঙ্কার নেই। পরোপকারে কোনও দ্বিধা নেই। কণ্ঠস্বরটা মোলায়েম ভেজা ভেজা বাঁশির সুরের মতো। হিমাংশু বাবুটাও তেমন। ভালো বললে এদের ছোটো করা হয়। এদের মনোবলকে অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে হয় এদের মনোভাব। সকলে দল বেঁধে তেজেনদার বাগিয়ে ধরা সে মৃত্যুকালীন প্রশ্ন আর মনোমোহন আচার্যের অবোধ ছেলের অবুঝ কৌতূহলের জবাব দেবার জন্যে কঠিন শপথ নিয়ে পথে বেরিয়েছে যেন। চেয়ে দেখে হাসিম। তাদের কারো মুখের আদল খলু অধরবাবু কিংবা জাহেদ বকসুর মতো নয়। তাদের অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো; কিন্তু পারলো না; কথা সরলো না জিভ দিয়ে। সে ছেটোলোকের চাইতে ছোটোলোক।
এদের সম্পর্কে ছধর বাপ তসবীহ টিপতে টিপতে নবীর দোকানে বসে কতো খারাপ কথা বলেছে। ফয়েজ মস্তান এদেরকে কাফের বলেছে। রামাই পণ্ডিত কাঁধের পৈতা দুলিয়ে বলেছে, সব ব্যাটা গাঁজাখোঁর পাড় মাতাল। কাফের কাকে বলে হাসিম জানে না। কাফেরদের কেমন চোখ? কেমন মুখ? কেমন নাক? তারা কি মানুষের মতো? কেমন করে জানবে হাসিম। সেতো আবার কোরান কেতাব পড়ে নি অতো। বলতে গেলে সে শুদ্ধভাবে আরবী ভাষায় বিসৃমিল্লাহও উচ্চারণ করতে পারবে না। গান সে গায় বটে, কিন্তু গান তার শিখতে হয় নি। বরগুইনির পাড়ে মানুষদের কারো শিখতে হয় না গান । বরগুইনির পাড়ে গান ভেসে ভেসে বেড়ায়। ইচ্ছে করে গলার ভেতর ধরে রাখলে গলা দিয়ে আপনা-আপনিই বেরিয়ে আসে।
