কানা আফজল, জাহেদ বকসু আরো অনেকে এসেছে দোকানে। জাহেদ বকসুর ছেলেমেয়ে দুজনের বিয়ে এক সঙ্গে। সোনা কিনতে এসেছে। তাদের সঙ্গে খোশগল্প করছে অধরবাবু। আর নীরবে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে।
জাহেদের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে সুতীক্ষ্ণ বিষয়বুদ্ধির ছটা। কানা আফজল কথা বলছে হরদম। কথার ফাঁকে ফাঁকে হেসে উঠছে। ছোটো করে ছাটা দাঁড়িতে এক ধরনের ভাব বিকীরিত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে নতুন ধনী জাহেদ বকসু। ছেলেমেয়ের বিয়েতে অলঙ্কার কেনার জন্য আরো দশজন ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছে। পছন্দ করার চাইতে মেয়েকে কতো খরচ করে বিয়ে দিচ্ছে আর ছেলের বৌকে কতো টাকার অলঙ্কার দিয়ে ঘরে এনেছে, সেকথা জানানোই তার মুখ্য উদ্দেশ্য।
অধরবাবু রুমালে সমস্ত আলঙ্কার একটা পুটুলি বেঁধে হাতে নিয়ে আফজলকে ডাকলোঃ
“হাজী সাব… অ হাজী সাব”
কানা আফজল পাশের লোকটির সঙ্গে আসন্ন ইলেকশন সম্বন্ধে আলাপ করছিলো। অধরবাবু আবার ডাকলোঃ
“অ চেয়ারম্যান সাব?”
এবার শুনতে পেলো। তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ
“কি অধরবাবু?”
“আল্লাহর নাম লৈ গছি লন অলঙ্কার।” (আল্লাহর নামে অলঙ্কার বুঝে নিন।)
মনে মনে বিড় বিড় করে সশব্দে বললো, “দেও, কই?”
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম।” (পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।)।
জাহেদ বকসুর সে দিকে খেয়াল নেই। আড়চোখে অলঙ্কারের পুঁটুলির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ
“দাম কতো চেঁয়া অইল?” (মূল্য কতত টাকা হলো?)
“কডে টেঁয়া, অনেরার লায় মুতের ফেনা। মোডে ষোলো শ পঞ্চাশ টেঁয়া।” (কোথায় টাকা, এই টাকা তো আপনাদের জন্য প্রস্রাবের ফেনা। মোটে ষোলশ পঞ্চাশ টাকা।)।
জাহেদ বকসু মানিব্যাগ থেকে দশখানা জিন্নাহ মার্কা একশো টাকার নোট গুণে দিয়ে বললোঃ
“বাকী টেঁয়া পরে দিলে অসুবিধা অইবো?” (বাকী টাকা পরে দিলে কি কোনো অসুবিধা হবে?)।
“আরে, ছি, কি কন, এই টেঁয়াও পরে দিয়ন?” (আরে ছি, কি যে বলেন, এই টাকাও পরে দেবেন?)
“না, জামাই আবার বি. এ. পাশ’ত। ঘড়ি আর খাট-পালং কিনিবার লায় শহরত যন পড়ের। বেশি টেঁয়া ন আনি লগে।” (জামাই আবার বি. এ. পাশ কিনা। ঘড়ি আর খাট-পালং কিনতে শহরে যেতে হচ্ছে, সঙ্গে করে বেশি টাকা আনি নি।)
আরো কিছুক্ষণ বসে চা খায়, গল্প করে। চন্দ্রকান্ত চোতাটা এগিয়ে দেয় অধরবাবুর দিকে। অধরবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে হাসিম আর চক্রান্তের দিকে তাকায়। তার কপালে কুঞ্চিত রেখা। সে তীব্র ঘৃণার। অধরবাবু লোহার আলমারীর গভীর থেকে কালো মোটা মহাজনী খাতাটা হাত দিয়ে টেনে বের করে পাতা খুলে হিসেব করে বললোঃ
“বাইশ টেঁয়া আসল আর সুদ দুই চেঁয়া সাড়ে দশ আনা। নয়া পৈসা অইলে পঁষট্টি পৈসা দে।” (বাইশ টাকা আসল আর সুদ দু’টাকা সাড়ে দশ আনা, যদি নয়া পয়সা হয় তাহলে দেবে পঁয়ষট্টি পয়সা।)
“বাবু ভাংতি পৈসাগুন কম দিতাম।” (বাবু, খুচরো পয়সাগুলো কম দেই।) অনুরোধ করে চন্দ্রকান্ত।
“না, না, এক পৈসাও কম অইত নয়, আঁর হক।” (না, না, এক পয়সাও কম হবে না, আমার হক।)
পঁচিশটি টাকা দিয়ে কানের ফুল জোড়া ও বাকী সাড়ে পাঁচ আনা পয়সা ফেরত নেয়।
জাহেদ বকসু, কানা আফজল এবং অন্যান্য সকলে অলঙ্কারের পুঁটুলিসহ বেরিয়ে যাচ্ছিলো। কোণের বেঞ্চিতে হাসিমকে দেখতে পেয়ে সিগারেট টানতে টানতে থেমে বললো জাহেদ বকসুঃ।
“এ্যাই বানিয়ার পুত, সোমবারের বৈরাতির লগে বেয়াই বাড়িতে যাবি। হাত ধোয়ান পড়িব। আইজকাল দাস-গোলামের এতো অভাব দেশত।” (এই বেনের ছেলে, সোমবার বরযাত্রীর সঙ্গে বেয়াই বাড়িতে যাবি। হাত ধোয়ানো লাগবে। আজকাল দেশে দাস-গোলামের এতো অভাব।)
অধরবাবু জাহেদ বকসুর দিকে চেয়ে ম্লান হেসে বললোঃ
“জাহেদ সা’ব গরীবের মিক্যা খেয়াল রাখিবান।” (জাহেদ সাহেব, গরীবের দিকে দৃষ্টি রাখবেন।)
ঘড়েল হাসি হেসে জাহেদ বকসু জবাব দিলোঃ
“আইচ্ছা।”
হাসিম অভিশপ্ত লোহার আলমারীটার দিকে একবার, আরেকবার অধরবাবুর দিকে, আবার অপসৃয়মাণ জাহেদ বকসুর দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সে নিশ্বাসে চন্দ্রকান্ত চকিত হয়ে উঠলো। কতত বেদনাসিক্ত, ব্যথাদীর্ণ এ দীর্ঘশ্বাস। চন্দ্ৰকান্তের বুক ছুঁয়ে গেলো। চঞ্চল হয়ে উঠলো চন্দ্রকান্ত।
“চল চল হাসিম। বেলা অই গেল।” (চল চল হাসিম, বেলা হয়ে গেলো।) তারা দু’জনে পথ দিলো।
আজকের মহাজনের সোনার দোকানে সুফিয়ার কানফুল জোড়া খালাস করতে গিয়ে যে শিক্ষা হাসিমের হয়েছে তার জুড়ি নেই। জাহেদ বকসুর কথাগুলো সুঁচের মতো তার চেতনায় বিধে আছে। কেমন অবলীলাক্রমে উচ্চারণ করে গেলো কথাগুলো। দুপুরে খাওয়ার পর ঘরের দাওয়ায় বসে ভাবছে, সে লোহার আলমারীটার কথা। যে আলমারী থেকে তার বাপ সোনা আর টাকা এনে কাজী রহমতের হাতে দিয়ে চিরতরে দাস হয়ে গেলো। তাকেও দাস করে গেলো। আজ সে আলমারী থেকে জ্বলন্ত সোনা কিনে নিলো জাহেদ বকসু। তারা কাজীদের দাস নাকি ছিলো দুপুরুষ আগে। সে জাহেদ বকসু তাকে দাস করতে চায়। দাস বিয়ে শাদীতে হাত ধুয়ে দিলে টাকা পায়, বাতাসার হাঁড়ি বয়ে নিলে টাকা পায়। সপের একপাশে বসে কুকুর বেড়ালের মতো খেতে পায়। তার বাপ কাজী বাড়ির দাস ছিলো এখন তার বাপ বেঁচে নেই। কাজীদের এখন দাস রাখার ক্ষমতা নেই। এককালের কাজী পরিবারের দাস জাহেদ বকসুর টাকা হয়েছে। জাহেদ বকসু তাকে দাস করতে চায়। কেন সে দাস হতে যাবে?
