গেলো অসুখের সময় সুফিয়া কানের ফুল দুটো অধর বাবুর কাছে বন্ধক দিয়ে চিকিৎসা আর ওষুধ-পথ্য যুগিয়েছিলো। ও দুটো সুফিয়ার মা’র। মরবার সময় তাকে দিয়ে গিয়েছিলো। মার হাতের সোনার জিনিস ভয়ঙ্কর মায়া। একাধিকবার আকারে ইঙ্গিতে সে কথা হাসিমকে জানিয়েছে। হাসিম সুফিয়ার কথা বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করেছে। কেন না, খালাস করে আনতে গেলে পয়সার দরকার। সাফ কথা, পয়সা এখন হাসিমের নেই। সুদ-আসল এক সমান হয়ে দাঁড়ালেও হাসিমের কিছু করার নেই। সুফিয়া হাসিমের মনোগত অভিপ্রায় হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছে। তাই গতকাল বৰ্গা পাওয়া গরুর বাচ্চাটাকে যুগীপাড়ার চন্দ্রকান্তকে দিয়ে বাজারে বেচে এক কুড়ি মোল টাকা আট আনা পয়সা যোগাড় করেছে। দাম হয়েছিলো এককুড়ি সতের টাকা। আট আনা গেছে রসিদের খরচ। হাসিম কিছুই বলে নি। তার বলবার কিছু নেই। পরের দিন সকালে চন্দ্রকান্তকে একেবারে ঘরে ডেকে নিয়ে এসেছে। গতকালের রাখা পান্তাভাতগুলো বড়ো বড়ো গেরাসে গিলছিলো পোড়া মরিচ দিয়ে। চন্দ্রকান্তকে তামাক জ্বেলে দিয়ে তেরছা করে কাটা একটি বাঁশের চোঙ্গা বের করে দু’খানা দশ টাকার আর একখানা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললো সুফিয়াঃ
“চন্দ্রকান্ত চাচা, কিছু কম দিবার চেষ্টা গরি চাইও।” (চন্দ্রকান্ত চাচা, কিছু কম দেবার চেষ্টা করে দেখবে।)।
হাসিম মাটির সোরাহীটার পানি ঢক ঢক করে গিলে খেয়ে হাথিনায় চন্দ্রকান্তের পাশে একখানা সিঁড়ি টেনে নিয়ে বসলো। চন্দ্রকান্ত অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে। হাসবার সময় বাবড়িটা তার দুলে দুলে ওঠে। মুখ দিয়ে গান বেরিয়ে আসে। সুখের সময়, দুঃখের সময় চন্দ্ৰকান্তের গলা দিয়ে গান ঝরেঃ।
“পাগলা মনরে কি করি রাখিমু তোরে ভুলাইয়া
শিশুরে ভুলাইয়া রাখি বুকের তন দিয়া,
যুবারে ভুলাইয়া রাখি বিবাহ করাইয়া।
ও পাগলা মনরে…।”
“ভাতিঝি, অধরবাবুরে ভোলান যাইত নয়। হাতের ফাঁক দি পানি ন গলে যার, তার নাম অধরবাবু। বুঝিলি ভাতিঝি।” (ভাইঝি অধরবাবুকে ভোলানো যাবে না। যার হাতের ফাঁক দিয়ে জল গলে না, তারই নাম অধরবাবু। বুঝলে ভাইঝি।)।
“চেষ্টা গরি চাইও না চাচা, দুই চার আনা পৈসা নি কম দিবার পার।” (তবু চেষ্টা করে দেখবে, দু-চার আনা পয়সা কম দেয়া যায় কিনা।)
“না রে মা, আঁই পারতাম নয়। হাসিমেরে ক’ তার চাচাত ভাই, ভাইয়ের থুন ভাইয়ে পৈসা একেবারে না লইতও পারে।” (না মা, আমি পারবো না। হাসিমকে বলো, তার খুড়তুত ভাই, ভাই থেকে ভাই পয়সা একেবারে নাও নিতে পারে।)
হাসিমের মুখে একটা কালো ছায়া নামে। চন্দ্রকান্ত নিজের অজ্ঞাতে হাসিমের বড়ো দুঃখের বড়ো বেদনার স্থানটিতে আঘাত দিয়ে ফেলেছে। মুখ দেখে সুফিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারে, কষ্ট পেয়েছে হাসিম। আবহাওয়াকে তরল করবার জন্যে হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পায় না। তাদের মুখ দেখে থতোমতো খেয়ে যায় চন্দ্রকান্ত। বড় আফশোস হয় তার। সুফিয়া হাসিমের জামাটা নিয়ে অসে। পিঠের কাছটিতে ছিঁড়ে গেছে। সময় মতো সেলাই করে না রাখার জন্যে দুঃখ হয়। সুফিয়া বললোঃ
“ঠিক আছে চাচা, কম ন লইলে ন লউক। টেঁয়া পৈসা মইরলে ত আর লগে যইত নয়। অধর বও রাজত্বি গরুক। তুই আঁর কানফুল দুয়া আনি দেও।” (ঠিক আছে চাচা, কম না নিলে না নেবে। টাকা-পয়সা তো আর কেউ মরবার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। অধরবাবু রাজত্ব করুক। তুমি আমার নাকফুল দুটো এনে দাও।)।
হাসিমের দিকে চেয়ে সুফিয়া করুণ মিনতি মেখে বললোঃ
“চন্দ্রকান্ত চাচার লগে তুই অ যও না।” (চন্দ্রকান্ত চাচার সঙ্গে তুমিও যাও না।) নিজের বউটির দিকে চেয়ে বড় মায়া হয়। পরনের একটা কাপড় দিতে পারে না, দু’বেলা ভাত দিতে পারে না পেট পুরে। তবু বউটা কেমন জননীর মতো মেহে তাকে সমস্ত বিপদ-আপদ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করে আসছে। টুললাটুলো স্ফীত তলপেটের দিকে চেয়ে করুণার প্রস্রবণ বয়ে যায় মনের ভেতর। সুফিয়ার আপাদ মস্তক দেখতে থাকে। মা হতে চলেছে সুফিয়া। সেদিনের সুফিয়া পাঁচ বছর আগেও ডুরে কাপড় পরে রাস্তায় ধুলো খেলা করে বেড়াতো। তার সারা শরীরে মাতৃত্বের লক্ষণ পরিস্ফুট। হাসিমের কাছে এ বড়ো আনন্দের কথা। যাবে না বললে সুফিয়া ব্যথা পাবে। জামাটা কাঁধে ফেলে চন্দ্রকান্তকে ডেকে বললোঃ
“ল চাচা যাই।” (চল চাচা যাই।)
কাজী পুকুরের ধার ঘেঁষে, বরগুইনির পাড় বেয়ে, ঢেউ খেলানো আউশ ধানের সবুজ মাঠের কিনারা দিয়ে হেঁটে হেঁটে হাসিম আর চন্দ্রকান্ত খাঁর হাটের অধরবাবুর দোকানে এসে পৌঁছলো। দু’জনের মনের ভেতর লুকিয়েছিলো অনেক কথা। কিন্তু কোনো বৈচিত্র্য নেই বলে সাহস করে কেউ কথা বললো না। বরগুইনির পাড়ে মানুষ মহাজন বাড়ি যাওয়ার সময় একে অপরের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ শুনতে পায়।
মানুষে অধরবাবুর ঘর ভরে গেছে। গদীতে বসেছে অধরবাবু। দু’ভাই চোতা লিখছে একযোগে। কৃশ কাঠির মতো শরীরে কেমন একটা মেদ মেদ আভা
বেরিয়েছে অধরবাবুর। নীচে আগুন জ্বালিয়ে কারিগরেরা হাতুরি ঠক ঠক করে সোনার কাজ করছে। সোনাকে এ্যাসিডে গলাচ্ছে। কষ্টি পাথরে ঘষে দেখছে। লোহার আলমারীর ভারী পাল্লা দুটো হাট করে খোলা। কাঁচের আবরণীর ভেতর দিয়ে ঝিলিক দিচ্ছে নানা রকম সোনার অলঙ্কারের প্রতিভাময় রূপ। এ আলমারীর তালা ভেঙে তার বাপ হরিমোহন আধসের পাকা সোনা আর পাঁচ হাজার রূপোর টাকা চুরি করে রাতের অন্ধকারে কানা আফজলের সাক্ষাতে কাজী রহমতের হাতে তুলে দিয়েছিলো। রাতের অন্ধকারে সে আদান-প্রদানের কথা নিজের বিবরে লুকিয়ে রাখতে পারে নি। এখনো বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে। তার মনেও আছে তরুণ বেদনার মতো। পুরনো হয় না, পুরনো হতে জানে না।
