কিছুক্ষণ পর একজন পৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে সালামালায়কুম দিলেন। ভদ্রলোক বেশ বুড়ো। চোখের ভূরু পর্যন্ত পেকে গেছে। শাহ আসগর আলী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও দাঁড়াতে হলো। শাহ সাহেব বললেন, ইনি হান্নান সাহেব, আবদুল ওয়াহেদের চাচা। উনার সঙ্গে কথাবার্তা বলুন। তারপর পৌঢ় হান্নান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ইয়ে জয় বাংলাকা আদমী হ্যায়। তাজ্জব কা বাত ইয়ে হ্যায় কভি আবদুল ওয়াহেদ কো নাম নেহি শুনা।
হান্নান সাহেবের সঙ্গে আমাকে বসিয়ে দিয়ে শাহ আসগর আলী সাহেব কাজের দোহাই দিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। হান্নান সাহেব আমার সঙ্গে বিশুদ্ধ বাংলায়। কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, এই কোলকাতা শহরে এক সময়ে তাঁরা মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খেতে পারতেন না। দোকানের বাইরে মুসলমানদের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগলেন, তখনো আপনাদের জন্ম হয়নি। সে জন্য পাকিস্তান কি চীজ বুঝতে পারবেন না। আমি বিনীতভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, পাকিস্তান কি বস্তু সে বিষয়ে কিছুটা কঠিন জ্ঞান আমাদের হয়েছে। পাকিস্তানীরা তিরিশ বছর আমাদের ওপর শোষণ করেছে। বিগত পঁচিশে মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তারা আমাদের দেশের লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে। স্মৃতি ভারাতুর বৃদ্ধকে যতোই বোঝাতে চেষ্টা করিনে কেন, তিনি তার স্মৃতি স্বপ্নের জগৎ থেকে এক তিলও অগ্রসর হতে রাজী নন। ফের তিনি বলে যেতে লাগলেন, জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তানের ডাক দিয়েছেন। কিছু কিছু এলেমদার মানুষকে সংগঠিত করবার কোনো লোক ছিলো না, আমার ভাইপো ওয়াহেদ মিয়া ছাড়া। ওই যে আপনাদের শেখ মুজিব। তিনিও তো আমার ভাইপোর পেছন পেছন ঘোরাফেরা করতেন। তখন টিঙটিঙে ছোকরা শেখ মুজিবকে চিনতো কে? ওয়াহেদের চেষ্টার ফলেই তো তিনি অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস মুসলিম লীগের সামনের কাতারের একজন নেতা বনে গেলেন। ওই যে একতলা বাড়িটা দেখছেন, ওখানে শেখ মুজিব কতোদিন কলোরাত কাটিয়েছেন। ওই বাড়িতে শুধু শেখ মুজিব কেনো, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, স্যার নাজিমুদ্দীন, আবুল হাশিম প্রমুখ মুসলিম লীগের বড়ো বড়ো নেতারা তশরিফ আনতেন। একবার তো স্বয়ং কায়েদ-ই-আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্ অসুস্থ আবদুল ওয়াহেদকে দেখতে এসেছিলেন। আমি অনুভব করতে পারলাম, ফ্রি স্কুল স্ট্রীটের বাসিন্দাদের চোখে এই বাড়িটা অত্যন্ত পবিত্র। কেননা এই বাড়িতে এমন একজন মানুষের জন্ম হয়েছিলো যিনি পাকিস্তান নামক একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে শ্রম, স্বপ্ন সব ব্যয় করে অকালে প্রাণত্যাগ করেছিলেন। পাকিস্তানের আদর্শের প্রতি এই সমস্ত লোক এতো অনুগত, তথাপি তারা অন্যদের মতো পাকিস্তানে বসবাস করতে যাননি কেনো? সত্যিই তো এটা একটা গভীর প্রশ্ন। আমি হান্নান সাহেবকে জিগগেস করলাম, আপনারা পাকিস্তানকে এতো ভালোবাসেন, তবু বসবাস করতে পাকিস্তান যাননি কেনো? এই সময়ে তায়েবার চাচা শাহ আসগর আলী ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনিও শুনলেন প্রশ্নটা। জবাবে বললেন, হ্যাঁ এটা একটা কথার মতো কথা বটে। শুরুতে আমরা ধরে নিয়েছিলাম, কোলকাতা পাকিস্তানের মধ্যে পড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত কোলকাতা তো হিন্দুস্থানের অংশ হয়ে গেলো। আমরা সাত পাঁচ পুরুষ ধরে এই কোলকাতায় মানুষ। এর বাইরে কোথাও যেতে হবে সে কথা চিন্তাও করতে পারিনি। তাছাড়া আমার মনে বরাবর একটা সন্দেহ ছিলো। পূর্বপাকিস্তানের মুসলমানেরা সত্যিকারের ইসলামী আহকাম মেনে চলে একথা বিশ্বাস করতে মন চাইতো না। আমার কিছু কিছু আত্মীয়স্বজন পূর্বপাকিস্তানে বসবাস করতে গেছেন। তাঁদের চলাফেরা দেখে মনটা দমে গিয়েছিলো। দেখে শুনে আমার ধারণা হয়েছিলো, তামাম হিন্দুস্থানের মুসলমানেরা লড়াই করে যে পাকিস্তান কায়েম করেছে এই মানুষগুলো সেই রাষ্ট্রটিকে টিকে থাকতে দেবে না। বাংলা ভাষার নামে কোনো মুসলমান এতো হল্লাচিল্লা করতে পারে, তাতো ছিলো আমার ধারণার অতীত। বলুন, এসব হিন্দুদের চক্রান্ত নয়? তখন পাকিস্তান ধ্বংসের আলামত স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম। হিজরত করতে পারতাম। কিন্তু লাভ হতো না। এখন যেমন হিন্দুস্থানে আছি তখনো হিন্দুস্থানে থাকতে হতো। আপনাদের বাংলাদেশ তো আরেকটা হিন্দুস্থান হতে যাচ্ছে, সেখানে সত্যিকার মুসলমানদের স্থান কোথায়? এঁদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন। পাকিস্তান কি বস্তু বাস্তব অর্থে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা এদের নেই। এঁরা আছেন তাঁদের স্বপ্ন এবং স্মৃতির জগতে। যেহেতু তারা মনের থেকে হিন্দুদের ঘৃণা করেন, সেজন্য তাঁদের একটা কল্পস্বর্গের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ট অংশের চিন্তাভাবনা এই একই রকম। তারা ভারতে বসবাস করবেন, কিন্তু মনে মনে চাইবেন পাকিস্তানটা টিকে থাকুক। আমি ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে তায়েবার চাচার বাড়িতে এসেছি কোনো বিষয়ে বিতর্ক করার জন্য নয়। এ ব্যাপারে তায়েবার মা আমাকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন। সুতরাং শাহ আসগর আলী এবং হান্নান সাহেব পাকিস্তানের পক্ষে যা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ করে শুনে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। ইচ্ছে হচ্ছিলো ছুটে পালিয়ে আসি। কিন্তু পারছিলাম না তায়েবার মার কথা ভেবে। যেখানে আমার এক দণ্ড অপেক্ষা করতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে সেই পরিবেশে এই মহিলা কি করে দিবসরজনী যাপন করছেন, সে কথা চিন্তা করে চুপ করে রইলাম। এই পুঁতিগন্ধময় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মহিলা সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। উনিশশো সাতচল্লিশ সালে স্বেচ্ছায় এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তাঁর মনে অগাধ অটুট বিশ্বাস ছিলো। তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের জন্য ভিন্ন রকমের একটা সুন্দর জীবন নির্মাণ করতে পারবেন। সামাজিক আচার সংস্কার দু’পায়ে দলে যা শ্ৰেয় উজ্জ্বল সুন্দর বলে মনে হয়েছে, সেদিকে সমস্ত কর্মশক্তিকে ধাবিত করেছেন। আজকে আবার তাঁকে সেই বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। এ যেনো বয়স্ক সন্তানের মাতৃগর্ভে ফিরে যাওয়ার মতো ব্যাপার। যে অবস্থায় তিনি এই বাড়ি এই আত্মীয়-স্বজনদের ছেড়ে গিয়েছিলেন সেই বাড়ির অবস্থা এখনও তেমনই আছে, তিল পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। আত্মীয় স্বজনেরা সেই স্মৃতির স্বপ্নের জগতে বসবাস করছেন। মাঝখানের তিরিশটি বছর যেনো কিছু নয়। চেষ্টা করলে তিনি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে পারতেন। এ বাড়িতে কেনো উঠলেন তা আমার বোধবুদ্ধির সম্পূর্ণ বাইরে। আমি বাইরের মানুষ। আমার কাছে এরা যেভাবে কথাবার্তা বললেন, তার মধ্যে গভীর একটা ঘৃণার রেশ রয়েছে। মহিলা কি উঠতে বসতে প্রতিনিয়ত আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হচ্ছেন না? এইসব কথা ঢেউ দিয়ে মনে বার বার জেগে উঠছিলো। তায়েবার মা আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কোনো উদ্দেশ্য আছে।
