অনেক কথাবার্তার পর শাহ আসগর এবং হান্নান সাহেব আমাকে রেহাই দিলেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। উঠে যাওয়ার সময় শাহ সাহেব বললেন, আপনি আরাম করে বসুন। ফ্যানের স্পীড বাড়িয়ে দিলেন। ভাবী সাহেবা বোধ করি আপনার সঙ্গে কি আলাপ করবেন। উনারা চলে গেলে তায়েবার মা ঘরে প্রবেশ করেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে জিগেস করলেন, কি বাবা দানিয়েল, তোমার কি খুব খারাপ লেগেছে? এঁরা এ রকমই। সে কথা তো তোমাকে আগে বলেছি। আশা করি আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন সম্বন্ধে তোমার একটা ধারণা হয়েছে। আমি ঈষৎ হাসলাম। তিনি আমার উল্টোদিকে বসলেন। তারপর ঠোঁট ফাঁক করে একটুখানি হাসবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু হাসিটা ভারী মলিন দেখালো। তিনি বললেন, তোমাকে বাবা ডেকে এনেছি একটু কথাবার্তা বলার জন্য। দেখছে না চারপাশে কেমন দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। কথা না বলে না বলে ভীষণ হাঁফিয়ে উঠেছি। এভাবে কিছুদিন থাকলে আমি নিজেও অসুখে পড়ে যাবো। এখন যে এখানে সেখানে অল্প-স্বল্প হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি সেটিও আর সম্ভব হবে না। আসলে মহিলা কোন্ কথাটির অবতারণা করতে যাচ্ছেন। সেটি আমি অনুমান করতে চাইলাম। আমি জানতাম তার স্বভাব বড়ো চাপা। খুব প্রয়োজন না হলে মনের কথা কখনো মুখে প্রকাশ করবেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি জানতে চাইলেন, আমি কোলকাতা এসেছি কবে এবং চট্টগ্রামে আমার মাও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা। তারপর তিনি এদিক ওদিক ভালো করে তাকিয়ে জিগগেস করলেন, তায়েবার অসুখটা কি জানো? আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ জানি। তিনি এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। ডোরার খবরও কি পেয়েছো? আমি বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি। মহিলা বললেন, আমার হয়েছে কি বাবা জানো চারদিক থেকে বিপদ। কাউকে কইতেও পারছিনে, আবার সইতেও পারছিনে। জাহিদুলটা এমন একটা কাণ্ড ঘটাবে তা আমি কখনো বিশ্বাসই করতে পারিনি। তার সততা এবং ভালো মানুষীর ওপর আমি বড়ো বেশি নির্ভর করেছিলাম। ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছাড়লেন। তিনি আবার জিগ্গেস করলেন, হেনার খবর শুনেছো কিছু? বললাম, হেনা ভাই সম্পর্কে আমি কিছু জানিনে। আজ সকালে হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। জানো হেনা একটা বিয়ে করে ফেলেছে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এরই মধ্যে হেনা ভাই আবার বিয়ে করে ফেললেন? মনের ঝাঁঝ কথার মধ্যে প্রকাশ হয়ে পড়লো। চেপে রাখতে পারলাম না। আমার মনোভাব টের পেয়ে মহিলা হেনা ভাইয়ের পক্ষ সমর্থন করে বললেন, বিয়েটা করে হেনা মানুষের পরিচয় দিয়েছে। মেয়েটির স্বামীকে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করেছে। দেখাশুনা করার কেউ ছিলো না। কচি মেয়ে কোথায় যাবে? তাই বিয়ে করে এখানে নিয়ে এসেছে এবং বালুহাক্কাক লেনে আলাদা বাসা করে থাকছে। আমি মনে করি হেনা ভাই আরো কিছুকাল পর বিয়েটা করলে শোভন হতো। কি করবো ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে কি আর মা বাবার কথার বাধ্য থাকে! আমার হয়েছে কি বাবা জানো সমূহ বিপদ। কোথাও গিয়ে শান্তি পাইনে। মনে সর্বক্ষণ একটা উথাল পাতাল ঝড় বইছে। দু’দণ্ড স্থির হয়ে বসবো সে উপায় নেই। এরই মধ্যে আবার হাঁপানির জোরটা অসম্ভব রকম বেড়ে গিয়েছে। আমার বড়ো মেয়েটি যে ছিলো আমার সব রকমের ভরসার স্থল, এখন হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। আমার বুকে ভীষণ ব্যথা, ভীষণ জ্বালা। কোথায় যাবো, কি করবো পথ খুঁজে পাচ্ছিনে। ভদ্রমহিলার দু’চোখ ফেটে ঝর ঝর করে পানি বেরিয়ে এলো। বুকটা কামারের হাপরের মতো ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। মাত্র অল্পক্ষণ। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা সহকারে আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত হয়ে বসলেন। আশ্চর্য সংযম। ভদ্রমহিলা স্বাভাবিক কণ্ঠে নিচু স্বরে বললেন, লোকে মনে করতে পারে এই ছেলেমেয়েরা আমার গর্ভের কলঙ্ক। কিন্তু মায়ের কাছে ছেলেমেয়ে তো ছেলেমেয়েই। তারা যতো ভুলই করুক আমি কিছু মনে করিনে। কথাগুলো নিজেকে না আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বললেন, বুঝতে পারলাম না।
মহিলা আমার আরো কাছে ঘেঁষে এলেন। আমার হাত দুটি ধরে বললেন, বাবা আমার একটি অনুরোধ রাখবে? আমি বললাম, বলুন। তিনি বললেন, আগে কথা দাও রাখবে। আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। তোমার প্রতি তায়েবার একটা অন্ধ আকর্ষণ আছে। তুমি হাসপাতালে তাকে দেখতে এলে সে বড়ো খুশি হয়। তোমরাও খুব সুখে নেই জানি। তবু সময় করে যদি একটু ঘন ঘন দেখতে যাও। বলো মায়ের এই অনুরোধটা রক্ষা করবে? জবাব দিতে গিয়ে আমার চোখে পানি বেরিয়ে গেলো। তিনিও আমার মাথাটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন। আমরা দু’জন দু’জনকে বুঝতে পেরেছি। তবু আমি আমতা আমতা করে বললাম, কেউ যদি কিছু মনে করে। আমি হাসপাতালে যাই ওটা অনেকে সুনজরে দেখে না। কারো মনে করাকরি নিয়ে বাবা কিছু আসে যায় না। কথাবার্তা শেষ করে ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো মধ্যযুগীয় অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তি পেলাম।
.
০৮.
ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে বৌ বাজারের হোস্টেলে এসে অবাক হয়ে গেলাম। ঘরের মধ্যেই মাদুর বিছিয়ে খাওয়া দাওয়া চলছে। খাসির মাংস, ভাত, ডাল সব দোকান থেকে আনা হয়েছে। খেতে বসেছেন নরেশদা, খুরশিদ, মাসুম, বিপ্লব এবং অপর একজন, যাকে আমি চিনিনে। বয়স তিরিশ টিরিশ হবে, গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হবে উনি কোনো ক্যাম্প থেকে এসেছেন। খুরশিদই পরিচয় করিয়ে দিলো। ক্যাপ্টেন হাসান। মুর্শিদাবাদের লালগোলার কাছাকাছি একটি মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে এসে থাকবেন। উনারা খেতে বসেছেন, শেকহ্যান্ড করার উপায় ছিলো না। একটা ব্যাপার আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশ থেকে যতো মানুষ কোলকাতায় এসেছে, তাদের একটা অংশ কি করে জানিনে আমাদের এই আস্তানাটা শিগগির কি বিলম্বে চিনে ফেলেছে। আমাদের সঙ্গে কি করে জানিনে নানা জাতের, নানা পেশার অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাদের মধ্যে গায়ক আছে, এ্যাকটর আছে, সাংবাদিক, শিল্পী, ভবঘুরে বেকার, পেশাদার লুচ্চা, বদমায়েশ, চোরাচরও আছে। সকলের একটাই পরিচয় আমরা বাংলাদেশের মানুষ।
