তায়েবারা তিন বোন যখন একটু সেয়ানা হয়ে উঠলো তিনি তাদের স্থায়ীভাবে ঢাকায় রেখে লেখাপড়া গানবাজনা ইত্যাদি শেখাবার একটা উপায় উদ্ভাবন করলেন। বিনিময় করে দিনাজপুরে যে ভূসম্পত্তিটুকু পেয়েছিলেন, তার একাংশ বিক্রি করে ঢাকা শহরে গেন্ডারিয়ায় এই ছোট্টো বাড়িটা কিনলেন। বাড়ির পেছনের খালি জায়গাটিতে দু’টি কাঠচেরাই কল বসালেন এবং ছোট্টো ছেলেটাকে তার দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন। সেই সময়ে ঢাকা শহরে জাহিদুলরা রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার প্রসার নিয়ে আন্দোলন করছিলেন। এই রবীন্দ্র সঙ্গীতের সূত্র ধরেই জাহিদুল এবং রাশেদা খাতুনের সঙ্গে তায়েবাদের পরিচয়ের সূত্রপাত। তায়েবার মা তো জাহিদুলদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলেন। এতোদিন তিনি মনে মনে এমন সুরুচিসম্পন্ন কাউকে সন্ধান করছিলেন, যার ওপর তাঁর অবর্তমানে মেয়েদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তবোধ করতে পারবেন। একথা মানতেই হবে যে অনেকদিন পর্যন্ত জাহিদুল এবং রাশেদা খাতুনেরা সে দায়িত্ব। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছিলেন। আমি নিজের চোখেই দেখেছি রাশেদা খাতুন আপন পেটের মেয়েটির চাইতে ভোরার প্রতি অধিক যত্নআত্তি করেছেন। আর জাহিদুল প্রতিদিন তাদের খবরাখবর নিচ্ছে। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস! আজ রাশেদা খাতুন আর ভোরা পরস্পরের সতীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহিদুল ডোরাকে বিয়ে করেছে, আর জাহিদুলকে দেখিয়ে দেয়ার জন্যে রাশেদা খাতুন শশীভূষণকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে গেছেন। এই সবকিছুর জন্য কি একটা যুদ্ধই দায়ী? দেশে যদি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতো তাহলে এই জীবনগুলো কি এমনভাবে বেঁকে চুরে যেতো? কি জানি জীবন বড়ো আশ্চর্য জিনিস। জীবনের বিস্ময়ের অন্ত নেই।
এই মহিলা যার পাশে আমি বসে আছি, যার তেজোব্যঞ্জক মুখমণ্ডলে চিন্তার বড়ো বড়ো গভীর বলিরেখা পড়েছে, যাকে দেখলে সব সময় সিংহীনির কথা মনে উদয় হয়েছে, জানিনে তিনি কি ভাবছেন তিনি সারা জীবন যে সমস্ত বস্তুকে মূল্যবান মনে করে লড়াই করে এসেছেন, সেগুলো কি এখনো তাঁর মনে কাজ করে যাচ্ছে? সমস্ত জীবন ধরে যে অপার আগ্রহ নিয়ে আকাশ দেখবেন বলে অক্লান্ত জঙ্গল কাটার কাজ করেছেন, আজ সেই নীল নির্মেঘ আকাশ থেকে তাঁর মাথায় বজ্র ঝরে পড়লো। তিনি দোষ দেবেন কাকে? দায়ী করবেন কাকে? তায়েবার মার পাশাপাশি রিকশা চেপে যাচ্ছি। আমি জানি তিনি আমার কাছে কিছু জিগগেস করবেন না। আমিও কিছু জানতে চাইবে না। হঠাৎ গলায় ঘর্ঘর শব্দটি শুনতে পেলাম। ভদ্রমহিলার হাঁপানি ছিলো সেটি জাগতে চাইছে। ভদ্রমহিলা প্রাণপণ শক্তিতে ঠোঁট দুটো চেপে ধরে বললেন, এই রিকশা বাঁয়ে রাখো। এরই মধ্যে আমরা ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে এসে দাঁড়ালাম। বাড়িটার গঠনশৈলী দেখে মনে হবে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে যে ধরনের বাড়ি হতো এটি তার একটি। প্রকাণ্ড চওড়া দেয়াল। লাল ইটগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। দরোজা জানালাগুলো আকারে আয়তনে বেশ বড়োসরো। কার্ণিশের কাছে দু’তিনটে অশ্বথ গাছের চারা বেশ উঁচু হয়ে উঠেছে। কতোকাল সংস্কার হয়নি কে জানে।
তায়েবার মা আমাকে বললেন, তুমি এখানে দাঁড়াও আমি ভেতরে যাই। যা বলছি মনে থাকে যেনো। তোমার তো আবার অস্থির মেজাজ। একটু বুঝে শুনে। কথাবার্তা বলবে। আমার তো মনে হচ্ছে এখানে আমাকে অনেকদিন থাকতে হবে। মহিলা পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। আমার মনে হলো এই বাড়িতে এখনো সদর অন্দর মেনে চলা হয়।
একটু পর বুড়ো মতো দাড়িঅলা এক লোক এসে বললো, আপ মেরে সাথ আইয়ে। লোকটির পেছন পেছন আমি তিন তলা দালানের একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। ছাদটি অনেক উঁচু। বিরাট বিরাট লোহার বীমের ওপর বসানো রয়েছে ছাদ। দরোজা জানালায় খুব দামী মোটা কাপড়ের পর্দা টাঙ্গানো আছে। কিন্তু সেগুলো এতো ময়লা যে দেখতে ইচ্ছে করে না। ঘরে হাল আমলের একজোড়া সোফা সেট আছে বটে। কিন্তু না থাকলেই যেনো অধিক মানানসই হতো। দেয়ালে মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফ, বাগদাদ শরীফ ও আজমীর শরীফের ছবি মোটা মোটা দামী ফ্রেমে টাঙ্গানো। সোনালী অক্ষরে আরবীতে আল্লার নাম, মুহম্মদের নাম বাঁধিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া দেওবন্ধ থেকে প্রকাশিত একখানা ইসলামী ক্যালেন্ডার দেয়ালে ঝুলছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হলো আমি অন্য একটা জগতে এসে প্রবেশ করেছি। অবাক হয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছি। এই সময়ে খুবই মোলায়েম ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে এক ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন। তাকিয়ে দেখলাম, দোহারা চেহারার অত্যন্ত দীর্ঘকায় গৌরকান্তি এক ভদ্রলোক। মুখে অল্প অল্প দাড়ি। হঠাৎ করে দেখলে বাঙালি বলে মনে হতে চায় না। আমি উঠে দাঁড়ালাম, তিনি বললেন, বসেন বসেন, আমি তায়েবার চাচা। আমার নাম আসগর আলী শাহ্। বুঝতে পারলাম ভদ্রলোকের মাতৃভাষা বাংলা নয়।
ভদ্রলোক বললেন, ভাবীর মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনি কেমন আছেন, তবিয়ত ভালো তো। আমি উপস্থিত মতো কিছু একটা বলে ভদ্রতা রক্ষা করলাম। তারপরে ভদ্রলোক মৃদু হাততালি দিলেন। সেই আগের লোকটি দেখা দিলো। তিনি আদেশ দিলেন, মেহমান কি লিয়ে শরবত আওর নাশতা লে আও। কিছুক্ষণ পর লোকটি খাঞ্চায় করে নাস্তা এবং শরবত নিয়ে এলো। খাঞ্চাটি রূপোর এবং ওপরে ফুলতোলা কাপড়ের ঢাকনা দেয়া, গেলাসটি মজবুত এবং কারুকাজ করা। এই বাড়িতে সব কিছুই পুরোনো। এমনকি তায়েবার চাচা যিনি আমার বিপরীতে বসে আছেন, বসনেভূষণে অপেক্ষাকৃত একালের সম্ভ্রান্ত মুসলমান ভদ্রলোক মনে হলেও কোথায় একটা এমন কিছু আছে আমার মনে হতে থাকলো ভদ্রলোকের সঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীর একটা যোগ রয়েছে। ভদ্রলোক সেটা ঢেকে রাখার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। সে যা হোক, ভদ্রলোক ঢাকনা উঠিয়ে বললেন, নাস্তা নিন। আমি তো দেখে অবাক। পাঁচ ছটা বিরাট বিরাট পরোটা, আবার তার সঙ্গে পেয়ালা ভর্তি খাসির মাংস, হালুয়া, শরবত এতোসব খাবো কি করে। পেটে জায়গা থাকতে হবে তো। তাছাড়া আমি সকাল বেলা খেয়ে বেরিয়েছি। তিনি বললেন, কিছু মুখে দিয়ে দেখেন। একেবারে না করতে নেই। আমিও বুঝতে পারলাম একেবারে না খেলে তিনি অপমানিত বোধ করবেন। এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিলাম। পরোটা মাংসের স্বাদ পেয়ে মনে হলো আমি যে প্রথমে পেটে ক্ষুধা নেই মনে করেছিলাম সেটা সত্যি নয়। দেখতে দেখতে চারটা পরোটা, পেয়ালার সমস্ত মাংস খেয়ে ফেললাম। সেই লোকটি আমাকে চিলুমচিতে হাত ধুইয়ে দিলেন। আমি চামচ দিয়ে কেটে কেটে প্লেটের সব হালুয়া খেয়ে শেষ করলাম। ভদ্রলোক এক দৃষ্টে আমার খাওয়া দেখতে লাগলেন। হালুয়া খাওয়া শেষ হলে ভদ্রলোক শরবতের গেলাসটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, শরবত পান করেন। আমি ঢকঢক করে শরবতটাও খেয়ে নিলাম। ভদ্রলোক আমার খাওয়ার ধরন দেখে কিছু একটা মনে করেছেন। সেটা আমি বুঝতে পারলাম। আমাকে লজ্জা থেকে উদ্ধার করার জন্যই বললেন, ভাবী বলেছেন, আপনি অনেক এলেমদার মানুষ। অনেক কেতাব লিখেছেন। তা এখন আপনাদের খবর কি? যুদ্ধ কেমন চলছে? আমি একটুখানি মুশকিলে পড়ে গেলাম। ভদ্রলোককে কি জবাব দেই। জানতে পেরেছি ভদ্রলোক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোরতরো বিরোধী। এই ফ্রী স্কুল এলাকাটিও ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক স্থান। এখানকার কশাইরা ছেচল্লিশে হিন্দু মুসলমানের রায়টে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। এখনো ভারত পাকিস্তানে কোনো ধরনের গোলযোগ হলে এই ফ্রি স্কুল স্ট্রীট থেকে শহরের রাজপথে পাকিস্তানের সপক্ষে মিছিল বের হয়ে যায়। উনিশশো পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ সালের সেই বিখ্যাত শ্লোগানঃ কান মে বিড়ি মুমে পান, লেড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের রেশ এখানকার মানুষের মন থেকে একেবারে অবসিত হয়ে যায়নি। তথাপি ভদ্রলোককে সন্তুষ্ট করার জন্যে কিছু একটা বলতে হয়। তাই বললাম, সবটাতো আমি জানিনে তবে এটা নিশ্চিত যে একদিন আমরা জিতব। জিতবেন তো বটে, তবে আপনারা নয়, জিতবে হিন্দুস্থান এবং হিন্দুরা। আপনারা তো জানেন না, লাখো জান কোরবান করে মুসলমানেরা পাকিস্তান কায়েম করেছে। আর আপনারা সেটা ভেঙ্গে ফেলতে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক আমার হাত ধরে বললেন, একটু এদিকে আসুন। তিনি আমাকে জানালার পাশে নিয়ে গেলেন। তারপর একটা একতলা বাড়ির দিকে অঙুলি প্রসারিত করে বললেন, ওই যে দেখছেন ওটা আবদুল ওয়াহেদের বাড়ি। আবদুল ওয়াহেদ কে ছিলো জানেন? জবাবে আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি অবাক হয়ে গেলেন। আপনি আবদুল ওয়াহেদের নাম শুনেননি? আমি আবার অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি দু’হাতে তালি দিলেন। সেই বুড়ো লোকটি দেখা দিলে তিনি বললেন, হান্নান সাহেবকো বোলাকে লে আও।
