তায়েবার মা তায়েবার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। ভদ্রমহিলার তেজোব্যঞ্জক মুখমণ্ডলে এক পোঁচ ঘন গাঢ় বিষাদের ছায়া। সকলেই কথা বলছে, তিনি বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন। সাদা কালো চুলের রাশি এক পাশে হেলে পড়েছে। অসাধারণ ব্যক্তিমণ্ডিত চেহারা। যৌবনে কি সুন্দরীই না ছিলেন। মহিলার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। চেহারায় এমন একটা আকর্ষণী শক্তি আছে, বারবার তাকাতে বাধ্য করবে। আপাতত মাধুর্যমণ্ডিত মনে হলেও ধারালো কঠিন কিছু আত্মগোপন করে আছে। অনেকবার এই মহিলার কাছাকাছি এসেছি। কিন্তু খুব কাছে যেতে সাহস পাইনি। মহিলার প্রতি যেমন গভীর আকর্ষণ অনুভব করতাম, তেমনি আবার ভয়ও করতাম।
উনারা যখন উঠলেন, তখন বেলা সাড়ে এগারোটা হবে। আমি কি করবো স্থির করতে না পেরে উশখুশ করেছিলাম। তায়েবার মা বলে বসলেন, বাবা দানিয়েল, তুমি আমার সঙ্গে এসো। আমি সসংকোচে জানতে চাইলাম, কোথায়? তিনি বললেন, ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে আমার দেওরের বাসায়। আর কেউ যাবে না? না দোলা যাবে ক্যাম্পে। হেনা দিনাজপুরে লোকদের সঙ্গে থাকে। ডোরার কোথায় রিহার্সেল না কি আছে। তায়েবা কলকলিয়ে উঠলো, যান দানিয়েল ভাই, মার সঙ্গে যেয়ে চাচার সাথে পরিচয়টা করুন। আপনার অনেক ভালো হবে। চাচার সঙ্গে খাতির করতে পারলে উর্দু ভাষাটা তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারবেন। চাচাঁদের বাড়িতে কেউ বাংলা ভাষায় কথা বলে না। যান আপনার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
আমি একটা টানারিক্সা চেপে তায়েবার মাকে নিয়ে পথ দিলাম। যেতে যেতে তিনি আমাকে বললেন, আমার দেওরের বাসা যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে একটু সাবধানে কথাবার্তা বলতে হবে। ওরা কেউ বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলে না, এমন কি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে প্রাণের থেকে ঘৃণা করে। তথাপি আমি থাকছি, কারণ আমার অন্য কোথাও থাকার জায়গা নেই। ওরা আমাদের থাকতে জায়গা দিয়েছে। কারণ এই বাড়িটার অর্ধেকের দাবিদার ছিলাম আমরা। কিন্তু সে কথা আমরা কখনো উত্থাপন করিনি। ওদের জীবনের এমন একটা ধাঁচ তার সঙ্গে আমার একেবারেই মেলে না। আর আমাদের মধ্যে কি সব ঘটছে না ঘটছে সে বিষয়ে তাদের সামান্যতম জ্ঞান নেই। যেই কথাগুলো বললাম, মনে রাখবে। তোমাকে এই বাড়িটাতে অনেকবার আসতে হবে। তায়েবাদের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে আবছা আবছা অনেক কথা শুনেছি। সেগুলো কানে নেয়ার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করিনি। শুনেছিলাম তাদের বাবার পরিবারের কেউ বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলেন না। বর্ধমান তাদের স্থায়ী নিবাস হলেও হাঁড়ে-মাংসে, অস্তি-মজ্জায় তায়েবার বাবা চাচারা মনে করেন তারা পশ্চিমদেশীয়। বাংলামুলুক তাদের পীরমুরিদী ব্যবসার ঘাঁটি হলেও অত্যন্ত যত্নে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের ভেদ চিহ্নগুলো ঘষে মেঝে তকতকে ঝকঝকে করে রাখে। এ ব্যাপারে উর্দু ভাষাটা তাঁদের সাহায্য করেছে সবচাইতে বেশি। স্থানীয় মুসলিম জনগণ তাদের এই বিচ্ছন্নতাবাদী মাসসিকতাকে অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করে মেনে নিয়েছে। কারণ পীর বুজুর্গরা উর্দু ভাষার মাধ্যমে ধর্মোপদেশ দেবেন, কোরান কেতাবের মানে বয়ান করবেন এটাতো স্বাভাবিক। সাথে সাথে তারা যদি দৈনন্দিন কাজকর্মে ঐ ভাষাটিকে ব্যবহার করেন, তাতে তো দোষের কিছু নেই, বরং স্থানীয় জনগণের চোখে তাঁদের সম্ভ্রম অনেকগুণে বেড়ে যাওয়ার কথা। এই পরিবারটিতে তায়েবার মায়ের মতো একজন মহিলার বিয়ে হওয়া সত্যিকারের বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক অঘটন ঘটে যায়।
তায়েবার মা শ্বশুর বাড়িতে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পরিবেশ থেকে। তাঁদের বাড়ি ছিলো বোলপুরের কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের একেবারে সন্নিকটে। তায়েবার মা বালিকা বয়সে পাঁচ ছয় বছর শান্তিনিকেতনে পড়ালেখা করেছেন। বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে এসে একটা প্রকাণ্ড সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলেন। নতুন বৌ উর্দু ভাষায় কথা বলে না। এমনকি পারিবারিক ভাষাটি শিক্ষা করার কোনো চারও নতুন বৌয়ের নেই। দীর্ঘ ইতিহাস সংক্ষেপ করে বলতে গেলে শ্বশুর বাড়িতে স্বামী এবং দাসী চাকর ছাড়া আর কেউ তার সাথে কথা বলে না। এই অবস্থাটা অনেকদিন কেটেছে। এই সময়ে ভারতবর্ষ দু টুকরো হয়ে হিন্দুস্থান পাকিস্তান হলো। নতুন বউ স্বামীকে অনেক করে বুঝিয়ে সুজিয়ে বর্ধমান এবং কোলকাতার সমস্ত স্থাবর সম্পত্তির দাবি ছেড়ে দিয়ে পূর্বপাকিস্তানের দিনাজপুরে এসে নতুন সংসার পেতে বসেন।
নতুন সংসারে থিতু হয়ে বসার পর মহিলা তাঁর পুত্রকন্যাদের গড়ে তোলায় মনোযোগ দিলেন। শ্বশুর বাড়ি থেকে মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে একটা প্রচণ্ড ভীতি নিয়ে এসেছিলেন। দিনাজপুরে বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে অনেকদিন বসবাস করার পরও সে ভীতি তাঁর পুরোপুরি কাটেনি। সমাজে বাস করতেন বটে, কিন্তু একটা দূরত্ব সব সময় রক্ষা করতেন সে কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য সব সময় হিন্দু শিক্ষক নিয়োগ করতেন। তাছাড়া বালিকা বয়সে তাঁর মনে শান্তিনিকেতনে যে সংস্কৃতির রঙ লেগেছিলো, অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সেও তা ফিকে হতে পারেনি। ছেলেমেয়েদের রবীন্দ্রনাথের গান শেখানো এবং রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ানোর একটা অনমনীয় জেদ মহিলাকে পেয়ে বসে। এই ফাঁক দিয়ে প্রগতিশীল রাজনীতি, কমিউনিস্ট পার্টি এসব একেবারে বাড়ির অন্তঃপুরে প্রবেশ করে। তিনি নিজেও এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। মহিলার স্বামী নির্বিরোধ শান্তশিষ্ট মানুষ। সংসারের সাতে পাঁচে থাকেন না। অধিকন্তু মহিলা তার ইচ্ছাশক্তির সবটুকু পরিকল্পনার পেছনে বিনা বাধায় ব্যয় করতে পেরেছিলেন।
