আমার সঙ্গে অর্চনা বড়ো রাস্তার গোড়া পর্যন্ত এলো। বললো, কোনো কথা হলো । দানিয়েল, আমি খুবই দুঃখিত। বললাম, অর্চনা, দুঃখিত হওয়ার কারণ নেই। যা ঘটবার ঘটে যাবে, সত্যিকার অবস্থাটি ভুলে থাকতে পারলে আমি খুশি হই। কিন্তু পারি কই? অর্চনা আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, এক কাজ করো। তোমার বান্ধবীর নাম এবং হাসপাতালের ওয়ার্ড নাম্বারটি লিখে দাও। কলেজ থেকে আসার পথে একবার দেখে আসবো। একটা কাগজ নিয়ে আমি তায়েবার ওয়ার্ড নাম্বার লিখে দিলাম। বাইরে পা বাড়িয়ে আমার বুকের ব্যথাটি মোচড় দিয়ে উঠলো। এই অবস্থার সঙ্গে একটি ঘটনা আমার মনে আছে। একবার দাঁতের খুব ব্যথা হয়েছিলো, যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলাম। এই সময়ে দেখি পাশের বাড়িতে মারামারি লেগেছে। থামাতে গিয়ে তিন ঘণ্টার মতো প্রাণান্তকর যন্ত্রণা ভুলে গিয়েছিলাম। বড়ো রাস্তার ধারে ধারে টিউব লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। গাড়িগুলো তীব্রবেগে ছুটছে। আমি ফুটপাত ধরে হাঁটছি। কোনো কিছুর প্রতি খেয়াল নেই। ছাড়া ছাড়াভাবে নানা কিছু আমার মনের মধ্যে হানা দিয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে তায়েবার মুখখানা ভেসে উঠলো। কিছুদিনের মধ্যে সে জগৎ-সংসারের হিসেব চুকিয়ে নেই হয়ে যাবে। তার মায়ের কথা মনে হলো। ওঁরা কি এখনো দিনাজপুরে আছেন? আমার মা, গ্রামের বাড়িঘর, আত্মীয় পরিজন, ঢাকার বন্ধুবান্ধব কখনো কি আবার সকলের সঙ্গে দেখা হবে? আমার সমস্ত স্মৃতির পেছনে আপনা থেকেই মুক্তিযুদ্ধটি এসে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যুদ্ধের জয়পরাজয়ের সঙ্গে আমার অস্তিত্বও যেনো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কোলকাতা শহরে যে আমি ছায়ার মতো বেড়াচ্ছি, তা যেনো আমার সমগ্র সত্তার একটি প্রক্ষিপ্ত টুকরো মাত্র। সেই সংগ্রামের মূল শরীরটির সঙ্গে আমি যুক্ত হতে পারছিনে কেনো? ঘুরে ঘুরে কথাগুলো মনে বেজে যেতে থাকলো। কিন্তু জবাব দেবে কে?
০৭-৮. তারপরদিন সকালবেলা
তারপরদিন সকালবেলাও আমাকে হাসপাতালে যেতে হলো। তখন বোধ হয় বেলা দশটা এগারোটা হবে। তায়েবার মা, বড়ো ভাই, ডোরা, জাহিদুল হক এবং দোলা সবাই তায়েবার বিছানার চারপাশে ভিড় করে আছে। দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে পা দিতেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি কেমন অন্য রকম হয়ে যাই। এই পারিবারিক সম্মেলনে আমার তো কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়। স্বভাবতই আমি ভীরু এবং লাজুক প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু চলে আসাটা ছিলো আরো অসম্ভব। আমার দিকে প্রথম দৃষ্টি পড়লো তায়েবার। এই যে দানিয়েল ভাই, আসুন, ইতস্তত করছেন কেন? দেখতে পাচ্ছেন না মা এবং বড়ো ভাইয়া এসেছেন। আমি কেবিনে ঢুকে তায়েবার মাকে সালাম করলাম। মহিলা আমার মাথায় হাত রাখলেন। সহসা মুখে কোনো কথা যোগালো না। এ মহিলাকে তায়েবার বন্ধু বান্ধবেরা সবাই মা বলে ডাকে। আমিও চেষ্টা করেছি মা ডাকতে। কিন্তু বলতে পারবো না, কি কারণে জিভ ঠেকে গেছে। যা হোক, তিনি জিগ্গেস করলেন, কেমন আছো বাবা। আমি স্মিত হেসে বললাম, ভালো। তায়েবার বড়ো ভাইয়া তাঁকে আমরা হেনা ভাই ডেকে থাকি। জিগগেস করলেন, দানিয়েল তোমার সব খবর ভালো তো! তারপর বললেন, চলো, একটু বাইরে যাই। কেবিন থেকে বেড়িয়ে দু’জনে গেটের কাছের মহানিম গাছটির গোড়ায় এলে হেনা ভাই বললেন, চলো এখানে শানের ওপর একটু বসি। বসার পর জিগগেস করলেন, তোমার পকেটে সিগারেট আছে? ভুলে আমি প্যাকেটটা ফেলে এসেছি। নীরবে পকেট থেকে চারমিনার বের করে দিলাম। মুখে একটুখানি অপ্রিয় ভঙ্গি করে হেনা ভাই বললেন, আঃ চারমিনার খাচ্ছো। ভালো সিগারেটের প্রতি হেনা ভাইয়ের মস্ত একটা অনুরাগ আছে। মনক্ষুণ্ণ হলেও তিনি একটা চারমিনার ধরালেন। হেনা ভাই সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছেন। সারা গায়ে পাউডার মেখেছেন। চুলটাও বোধকরি আগের দিন কেটেছেন। আমাদের জীবনকে ঘিরে এতো সব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো যেন তাকে কিছু মাত্র স্পর্শ করেনি। আপাতত তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে গেন্ডারিয়ার বাড়ির খোস গল্প করার মুডে রয়েছেন। এ সময়ে তাঁর পায়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। তিনি বললেন, এ বিদ্যাসাগরী চটি জোড়া গতকাল কলেজ স্ট্রীট মার্কেট থেকে কিনলাম। জানো তো বিদ্যাসাগরী চটির মাহাত্ম্য। নীলদর্পন নাটকে নীলকর সাহেব যখন ক্ষেত্রমণিকে লুট করে নিয়ে যাচ্ছিলো বিদ্যাসাগর মহাশয় রাগে ক্ষোভে অন্ধ হয়ে পায়ের চটি জোড়া ছুঁড়ে মেরে ছিলেন। তা পরবর্তী দৃশ্যে গিরিশ ঘোষ যিনি নীলকর সাহেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, চটিজোড়া মস্তকে ধারণ করে হল ভর্তি দর্শকের সামনে এসে বলেছিলেন, জীবনে আমি অভিনয় করে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। তবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চটি জোড়ার মতো এতো বড়ো পুরস্কার কোনোদিন পাইনি এবং পাবোও না। তারপর তো ড্রপসীন পড়ে গেলো। হল ভর্তি লোকের সেকি বিপুল করতালি। দৃশ্যটা একবার কল্পনা করতে চেষ্টা করো।
কেবিনে এসে দেখি ভাইবোন সবাই মিলে ডোরার রবীন্দ্র সঙ্গীতের গল্প করছে। জাহিদুল তাতে আবার মাঝে মধ্যে ফোড়ন কাটছে। উৎসাহটাই মনে হচ্ছে তায়েবার অধিক। এমন খোস গল্প করার আশ্চর্য প্রশান্তি এরা সকলে কেমন করে আয়ত্ব করলেন, আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই। তায়েবা জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ডোরা তার জীবনের মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটিয়ে বসে আছে। আমাদের সকলের অস্তিত্ব চেকন সূতোয় ঝুলছে। এই ধরনের অবস্থায় নির্বিকার মুখ ঢেকে এঁরা রবীন্দ্র সঙ্গীতের আলোচনা কি করে করতে পারেন! জীবন সম্ভবত এ রকমই। আঘাত যতো মারাত্মক হোক, দুঃখ যতো মর্মান্তিক হোক, এসময় জীবন সব কিছু মেনে নেয়। দুনিয়াতে সব চাইতে আশ্চর্য মানুষের জীবন।
