প্রায়ই সে এইসব ক্ষেত্রে চটপট উত্তর দেবার ভঙ্গিতে সহজ হয়ে দাঁড়ায়। এবং কিছু বলে পরিত্রাণ পাবার চেষ্টা করে। সত্য—মিথ্যা—যে—কোনো প্রকার। এসব ক্ষেত্রে সে কখনও নিজেকে ছোট করবে না। নিজেকে, নিজের দেশকে ছোট করার ইচ্ছা তার কোনোদিন হয়নি।
একদা ভিক্টোরিয়া বন্দরে একজন ব্রেজিলিয়ান গার্ল বলেছিল, তোমার চোখ বড় গভীর, তোমার চোখ কবিতার মতো।
সে বলেছিল, আমি যে কবিতা লিখি।
একদা একটি চিলি—কন্যা বলেছিল, তোমার কোমর খুব সরু। তোমার এই দীর্ঘ কোমল চেহারা নাচিয়ের মতো।
সে বলেছিল, একদা আমি ব্যালেতে নাচতুম।
বিজন এইসব ভাবনার ভিতর এভিন্যু ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। রেল—স্টেশন অতিক্রম করে সে ডাইনে মোড় ঘুরল। এখানে সে কিছু ফুলের গাছ দেখল। মিমোসা—ফুলের গুচ্ছের মতো এইসব ফুলেরা গাছে ঝুলছে। যারা পথ ধরে যাচ্ছে, ফুলেরা তাদের শরীরের উপর ঝরে পড়েছে। বিজনের ব্লু—ব্ল্যাক কোটের রঙে জাফরি রঙ ধরাল। সে অনেকক্ষণ এইসব গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। চারিদিকে নিয়ন আলো, কাচের ঘরে আলো জ্বলছে। এই আলোর ভিড়ে এইসব শ্বেতাঙ্গ রমণীদের বিজনের বড় ভালো লাগল। ওর আর ইচ্ছে হচ্ছে না এক পা নড়তে। ওর ইচ্ছে নেই এখন কলিন স্ট্রিটের পাঁচ নম্বর বাড়িতে ঢুকে নীরস আলোচনায় ডুবে যেতে। তার চেয়ে বরং এই ভালো। বিদেশি এইসব ফুলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড সাগরের দুঃখকে ভুলে এই সুখ—দুঃখে ডুবে যাওয়া।
অথচ সে দাঁড়াতে পারল না। বন্দরে সেলিম, ওর কাশি, ওর নিরীহ মাছের মতো চোখ বিজনকে তাড়া দিচ্ছে। বিজন ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্তা অতিক্রম করে বড় হলঘরটায় ঢুকে গেল। গায়ে পেতলের প্লেটে লেখা—পাঁচ, কলিন স্ট্রিট, পাথরের উপর খোদাই করা সাইনবোর্ড। লেখা আছে—জাহাজিরাও আপনার আমার মতো মানুষ।
এইসব বড় বড় হরফে বড় বড় কথা পড়তে পড়তে বিজন হলঘরে ঢুকে গেল। পাথরের দেয়ালে বড় বড় ছবি ঝুলছে। পায়ের নিচে মসৃণ পাথরের ওপর প্রতিবিম্ব ভাসছে। মসৃণ পাথরে ওর চেহারা আয়নার মতো ধরা পড়ছে। বিজন সন্তর্পণে হাঁটল। সন্তর্পণে পাথরের আর্শিতে নিজের মুখ দেখল, কারণ অন্য কোনো মুখ অথবা অন্য কোনো শব্দ এ—হলঘরে ভেসে উঠছে না। সে বিস্মিত হল। পাথরে দেয়ালে কিছু তৈলচিত্র। কিছু দামি আলো এবং এইমাত্র পালিশ—করা জুতোর রঙে এইসব দেয়াল, এইসব ছবি। সে একবার ভাবল বরং চলে যাওয়া যাক। বরং কাল দেবনাথকে বলেকয়ে একসঙ্গে আসা যাবে। এই নিঃসঙ্গ পুরীতে বিজন ভীত এবং বিহ্বল হয়ে পড়ল। অথচ সে এখন দেয়ালের কিছু কিছু তৈলচিত্র চিনতে পারছে—ওরা শেক্সপিয়ার, টলস্টয় এবং আরও সব মনীষীদের পাশে ট্যাগোর—জন্ম ১৮৬১… মৃত্যু ….. কী একটা সালের নাম। ট্যাগোর ………. তারপর জন্ম—মৃত্যুর কথা ভেবে ওর কিঞ্চিৎ সাহস জন্মাল। সে চারিদিকে চোখ তুলে একবার তাকাল। উত্তরের দিকে পাথরের দেয়ালের একটা দরজা স্বয়ং খুলে যাচ্ছে। এবং একজন প্রৌঢ় বের হয়ে আসছেন। তিনি যেন কোনো যক্ষপুরী থেকে উঠে আসছেন। সে তাকেই কোনোরকমে প্রশ্ন করল, মিঃ ট্রয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই। প্রশ্ন করে ট্যাগোরের ছবির প্রতি ফের নজর ফেলে নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে গৌরব বোধ করল।
ভদ্রলোক বললেন, দরজা ঠেলে ভিতরে যান। ওর স্টেনো এলবি আছেন। তাঁকে প্রশ্ন করুন। শেষে ভদ্রলোক ওকে গুডবাই ভঙ্গিতে বিদায় জানালেন।
বিজন একান্ত বশংবদের মতো দরজা ঠেলতেই ভিতর থেকে জবাব এল, কাম ইন, কাম ইন!
বিজন এই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কোনো মুখ দেখতে পাচ্ছে না অথচ অপ্রত্যাশিত মেহমানের মতো ডাক ওকে বিচলিত করছে। যেন সে দেয়াল—ঘেরা কোনো যক্ষপুরীতে এসে ঢুকেছে। সেখানে দেয়ালের ভিতর থেকে নারী—কণ্ঠের জবাব, কান ইন, কাম ইন। এবং সে ততক্ষণে ভিতরে ঢুকে গেছে বলেই দেখতে পেল মেয়েটি টেবিলের উপর ঝুঁকে কাজে ব্যস্ত। মেয়েটি একবার চোখ তুলে দেখছে না। দেখল না। কে এল কে গেল, সে দেখল না। সে হাত তুলে ইশারায় ওকে সামনের চেয়ারে বসতে বলছে। ছোট চিলতে করিডরের মতো এই একফালি ঘরে একটি টেবল সহ মেয়েটিকে খুব ভিন্নধর্মী বলে মনে হচ্ছে।
সে চেয়ারে বসে ইতস্তত দেয়ালে নজর দিতেই দেখল মেয়েটির দেয়ালের কীলকেও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং—যেন উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং স্মিত হাসিতে এইসব অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়ন করছেন। ছবিটি হাতে আঁকা বলেই বিজনের মনে হল। কোনো ছবির যেন নকল। এইটুকু দেখে এবং ভেবে বিজনের বিচলিত ভাবটুকু কেটে গেল। সে বলল, মিঃ ট্রয় থাকলে দেখা করতাম।
এলবি চোখ তুলে বিজনকে দেখল। একজন সুপুরুষ বিদেশি যুবাকে দেখল। যুবাকে দেখে চোখেমুখে কোনোও ভাবান্তর নেই। বিজনকে দেখে লেজারে হিসাব কষছে এমন ভাব চোখে। চোখের পাতা পড়ছে না—দৃষ্টি এমন দৃঢ়, আত্মপ্রত্যয়ে গভীর। এই নির্লজ্জ ভাবটুকু বিজনের ভালো লাগল না। বস্তুত বিজন খুব আড়ষ্ট বোধ করছে।
তিনি তো নেই। তোমার কী দরকার আমাকে বলে যাও। তিনি এলে বলব।
বিজন বলল, প্রয়োজন আমার অনেক। তোমাকে আমার প্রয়োজনের কথা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে হবে।
শুনব।
সব ঘটনাই মিঃ ট্রয়কে কিন্তু বলতে হবে।
এলবি হাসল। এলবি বিদেশি যুবাকে ফের কৌতূহলের চোখ নিয়ে দেখছে। এবং সেই পুরুষের মতো দৃষ্টি—যা বিজন সহ্য করতে পারছে না। সে এলবিকে সাধারণ যুবতীর মতো দেখে, খুশি হতে চাইল।
