পিতাঠাকুর ঠাকুরঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখতেই, কেমন আহ্লাদে পূজা—আর্চার কথা ভুলে বাইরে বের হয়ে বলেছিলেন, তুই, তুই আশরাফ না।
জি!
জি তোমার বের করছি। বেরো বাড়ি থেকে। বেরো—বলছি। বলা নেই কওয়া নেই, চলে গেলি! তুই কিরে।
তারপর যা হয়, পিতাঠাকুর কেঁদে ফেলেছিলেন, ঠাকুর তুমি আমার মুখ রক্ষা করেছ। আশরাফ আবার ফিরে এসেছে।
জগদীশের জননী পুকুরঘাট থেকে ছুটে এসেছিলেন, আশরাফ ফিরে এসেছে। তারপর যা হয়, আশরাফের উপর কড়া হুকুম জারি হয়ে গিয়েছিল, বাড়ি থেকে না বলে কয়ে বের হলে ঠ্যাঙ ভেঙে দেওয়া হবে।
আশরাফ হাসতে হাসতে বলেছিল, জ্যাঠাবাবা আমার কাজ ফেলে থাকি কী করে। বাড়ি থেকে বের হতে না দিলে আমার মনিব মানবে কেন! কিছু একটা করে খেতে হবে বলেই বের হয়ে গেছি। লসকরের কাজ নিয়েছি জানতে পারলে তখনই যে খড়মপেটা করতেন। আমার কী দোষ বলেন!
আশরাফের কাজ হয়েছে শুনে পিতাঠাকুর কিছুক্ষণ গুম মেরে বসেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, এলি যখন, দুটো দিন থেকে যা। তুই না থাকায় বাড়িটা আমার কত খালি হয়ে গেছে বুঝবি না আশরাফ!
আশরাফ জ্যাঠাবাবার কথা ফেলে কী করে! সে থেকে গেল। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরল, পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে গেল, দোয়া ভিক্ষা করল, এবং সে যে একসময় বাড়ির ভালোমন্দের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল, বাড়িটা ঘুরে ঘুরে সব ঠিক আছে কিনা দেখতে গিয়ে না বলে পারল না, ঘাটের জামগাছটা নেই কেন?
ঝড়ে পড়ে গেছে।
গোপাটের জমিতে তামাকপাতার চাষ বন্ধ কেন?
কে করবে! কে এত খাটবে।
বাগানের সব বাঁশ দেখছি সাফ হয়ে গেছে।
বিক্রি করে দেওয়া হল। অজন্মার বছরে বাঁশ আর রাখা গেল না। সংসার চলবে কী করে! খাব কী দিয়ে!
পুকুরপাড়ের কয়েতবেল গাছটাও নেই?
সেবার প্লাবন হল, জলে ডুবে গেল পুকুরপাড়। গাছটা মরে গেল।
আশরাফ যে বাড়িরই একজন, হম্বিতম্বি করতে ছাড়ল না। বিধুভূষণকে বলল, বিধু তুই যখন তখন গামছা পেতে শুয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাস, গোরুর খোঁটা পালটাস না, তোকে রেখে হবেটা কী!
জগদীশের সবই মনে পড়ছিল—কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ তিনি। তবু কেন যে তাঁর মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। কোথাকার আশরাফ এককালে তাদের বাড়ি এসে উঠেছিল, সেই আশরাফ স্টিমার চালিয়ে নদী ধরে কতদূরে চলে যায়, বন্দরের কাছে নদীর পাড়ে বাড়িও করেছে, আশরাফের সংসার হয়ে যাওয়ায় সে আর দু ক্রোশ হেঁটে বারদীতে নেমে তাঁর বাড়ির সঙ্গে কোনোই যোগাযোগ রাখতে পারে না—দেখা হলে আপ্যায়নের শেষ থাকে না—বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় অথবা তিনি দু ক্রোশ রাস্তা ধরে অরুকে নিয়ে যে হেঁটে এলেন, একবারও কেন যে আশরাফের কথা মনে হয়নি ভেবেই হেসে দিয়েছেন। ম্রিয়মাণ হাসি—আশরাফ ঠিকই বলেছে, এক জায়গায় কেউ থাকে না।
অরু হয়তো নিজের মতো একদিন তার পৃথিবীটাকে খুঁজে নেবে। বাড়ির সঙ্গে সেও তার নাড়ির সম্পর্ক হারিয়ে ফেলতে পারে। স্টিমারে সে যে তাঁর সঙ্গে দূরদেশে যাচ্ছে কে বলবে? সারাটা দিন স্টিমারের এ—মাথা ও—মাথায় দৌড়াচ্ছে। লাফালাফিরও শেষ নেই। রেলিং—এ ভর দিয়ে সিঁড়ি ধরে আপার—ডেকে উঠে গেছে। আবার লোয়ার—ডেকে নেমে গেছে। তার বাবা স্টিমারে আছে, না তাকে ফেলে নেমে গেছে, নেমে যেতেই পারেন, ভুলভাল তো মানুষেরই হয়, অরুর সে ব্যাপারে কোনোই ভ্রূক্ষেপ নেই। জগদীশ অরুকে নিয়ে যতটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন এমনকি, হাঁটাপথে তাকে যতটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, এখন দেখলে মনে হয় না সে ক্লান্ত। আশরাফ কিছুতেই অরুকে তার কেবিনে নিয়ে যেতে পারেনি। কেবিনের বাঙ্কে ইচ্ছে করলেই গড়াগড়ি দিতে পারত, অন্তত আর কিছু না হোক, অরুর বিশ্রাম হত কিছুটা, অরু ওর কেবিনে ঢুকেছে, বাঙ্কে শুয়ে ঘুমিয়ে নিতে বললে, সে আবার লাফিয়ে বের হয়ে এসেছে। কখনও বিশাল চিমনিটার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে চুপচাপ, অথবা ইঞ্জিন রুমে যে লোকটা কয়লা মারছিল বয়লারে তার বলিষ্ঠ শরীর এবং আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে লোকটা, সোজা কথা—সে কিছুতেই তার পাশ থেকে সরে আসতে চাইছিল না।
একসময় মদনগঞ্জ ঘাটও চোখে ভেসে উঠল দূর থেকে।
সেখানে একটিমাত্র থামের উপর বড় গ্যাসবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়। রাতে সেই গ্যাসবাতির আলোতে স্টিমারটা চিনতে পারে, কাছে এসে গেছে মদনগঞ্জের ঘাট।
নদীর দু—পাড়ে অন্ধকারে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। কোথাও কুপির আলো, কোথাও বা হারিকেনের আলো। মদনগঞ্জের সড়ক ধরে মানুষজন যে হেঁটে যাচ্ছে বোঝা যায়। লোকজন রাস্তায় বের হলে সঙ্গে হয় টর্চবাতি, না হয় হারিকেন হাতে রাখে। অন্ধকারে গাছপালার ছায়ায় রাস্তার কিছুই দেখা যায় না। সড়কের সুরকির রাস্তা বড়ই এবড়োখেবড়ো। বাবুদের প্রাসাদ এখনও চোখে পড়ছে না—স্টিমার তার গতি কমিয়ে দিয়েছে। এতক্ষণ পুবের দিকে মুখ ছিল স্টিমারের এখন তার মুখ উত্তরদিকে ঘুরে গেছে। শান বাঁধানো নদীর পাড়ে স্টিমারটা এবার ভিড়বে।
আলোগুলো জ্বালিয়ে দিতেই মনে হল জগদীশের একটা জ্যান্ত শহর হয়ে গেছে যেন স্টিমারটা। উজ্জ্বল আলোর নিচে যাত্রীরা তাদের লটবহর গুছিয়ে নিচ্ছে। অরু যে কোথায়! এবার তো নামতে হবে।
তিনি ব্যস্ত হয়ে অরুকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিলেন। আশরাফ বোধহয় নোঙরের ঘরে ঢুকে গেছে। তার দায় মেলা। সে যে কেবিনে নেই জগদীশ জানেন। আর তা ছাড়া আশরাফ খুবই ব্যস্ত মানুষ, তাকে অরু সম্পর্কে কোনও কথা বলতেও সঙ্কোচ হচ্ছিল। স্টিমারের এদিকটায় মুরগির মাংসের গন্ধ উঠছে। স্টিমারে উঠলে তার কেন জানি গন্ধটা সহ্য হয় না। লোয়ার ডেকের শেষ দিকটায় তিনি সেজন্য কখনই যান না। ইলিশ মাছের ঝোল ভাত প্লেটে করে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। কোনওরকমে নাকে রুমাল দিয়ে কিচেনের দিকটা পার হয়ে গেলেন। যদি কৌতূহল বশে অরু গেরাফি ফেলার ঘরটার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। না সেখানেও নেই। কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন—তারপর না পেরে ফরোয়ার্ড পিকে উঠে গেলেন। যেখানটায় স্টিমারের সার্চলাইট নদীর জল ঘেঁষে দূরে চলে গেছে, অবাক হয়ে দেখলেন, সার্চলাইটের ঠিক নিচে অরু দাঁড়িয়ে আছে। নদীর বুকে আলো পড়ে যে রহস্য তৈরি হয়েছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাই দেখছে অরু।
