সে ডেক—ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। এটা যে স্টিমারের নিষিদ্ধ এলাকা, তার জানা নেই। পাশের ঘরটা হুইল রুম। একটা লোক সেখানে দাঁড়িয়ে চাকার মতো দেখতে জিনিসটাকে ডাইনে—বাঁয়ে ঘোরাচ্ছে। রঙ—বার্নিশের গন্ধ উঠছে। দু’পাড়ে নদীর চড়া, সামনে নদীর জল, মাথার ওপর আকাশ দিগন্ত প্রসারিত যেন। গাছপালা, নদীর তীর এবং সামনের জলরাশি—সব মিলে তাকে কিছুটা কেন জানি উন্মনা করে দিয়েছে। জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে তার ইচ্ছে হচ্ছে না।
জগদীশ বললেন, কী হল, এসো! দাঁড়িয়ে থাকলে কেন?
এখন আমার যেতে ইচ্ছে করছে না বাবা।
তাঁর সঙ্গে তোমার দেখা করা উচিত। তাঁরই স্টিমারে তুমি যাচ্ছ, আমি তো সব সময় তোমার স্কুলের ছুটিছাটায় সঙ্গে আসতে পারব না। আশরাফের স্টিমারে উঠিয়ে দিলে, সে—ই তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। আমাদের এলাকার লোক, সবাই তাকে চেনে।
আমার ভালো লাগছে না বাবা।
কেন ভালো লাগছে না! কী হয়েছে? মোয়ামুড়ি আছে, খিদে পেলে খেতে পারো।
ভালো না লাগারই কথা। বাড়ি ছেড়ে এই প্রথম দূরদেশে যাচ্ছে। বাড়ির কাছাকাছি কোনও হাইস্কুল নেই বলেই, তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া। মন খারাপ হতেই পারে। বাড়িতে তার জননীও কান্নাকাটি করেছে আসার সময়।
আসলে অরুর মনে হচ্ছিল, সেই নির্বাসিত দেশে সে যাচ্ছে। সেখানে কে আছে জানে না, যতক্ষণ দেখা যায়। এই দু’পাড়ের মানুষজন ছেড়ে গেলেই যেন সেই নির্বাসিত দেশটায় ঢুকে যাবে। যতক্ষণ পারা যায়, দেখা। ঘরবাড়ি, মানুষের পদচিহ্ন এত আগ্রহ সৃষ্টি করে, সে জীবনেও টের পায়নি!
সে রেলিং—এ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে।
স্টিমারটা গতি পেয়ে গেছে—দু’পাশের চাকাদুটো ঘুরছিল—কেমন ঝমঝম শব্দ। তার কাছে সবকিছুই একটা নতুন গ্রহের মতো। পরনে হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট গায়, মাথার চুল উড়ছিল, সে জানেই না বাবা তার পাশে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে যতদূর চোখ যায় দেখা, এবং যখন টের পেল বাবা তাকে নিয়ে যাবেনই, সে বলল, ওটা কী বাবা?
ওটা নবাব ঈশাখাঁর কেল্লা। এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই কেল্লা থেকেই নবাব, চাঁদ রায় কেদার রায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
নবাব ঈশাখাঁর নাম সে জানে। চাঁদ রায় যাত্রাপালায় নবাব ঈশাখাঁ, সোনাই এবং সেই ঝলমলে তরবারিটির কথাও তার কেন জানি এ সময় মনে পড়ল। কেন যে এসব মনে পড়ে তার! তার নিজের বাড়িঘর, পুকুর, গোপাট, পুকুরপাড়ের অতিকায় তেঁতুলগাছটিও তার চোখে ভেসে উঠল। বাড়িতে ভাইবোনেরা, দাদা বাড়ি নেই বলে কিছুটা ছন্নছাড়া, সে বোঝে। ছোটকাকা হয়তো এখন বিগ্রহের সেবায় ঠাকুরঘরে ঢুকে গেছেন। মা বিগ্রহের পূজার আয়োজনে ব্যস্ত। কাকিমা রান্নাঘরে। হালের বলদ দুটিকে বিধুদা খড় কেটে দিচ্ছে। বৈঠকখানা ফাঁকা। তার পড়ার টেবিল—চেয়ার ফাঁকা। বই, খাতাপত্র কিছুই পড়ে নেই। গৃহশিক্ষক সমতুল সার ছুটিতে দেশে গেছেন। ফিরে এলে তিনি একাই রাতে বৈঠকখানায় শোবেন। মাথার কাছে একটা হারিকেন জ্বলবে। বাড়ি থেকে কেউ চলে গেলে কতটা ফাঁকা লাগে গৃহশিক্ষক ফিরে এলে ঠিক টের পাবেন। সে রাতে বৈঠকখানায় শুত। একটা তক্তপোশে সমতুল সার। পাশের তক্তপোশে সে। সামনের জানলা খুলে দিলে গরমেও ঠান্ডা হাওয়া উঠে আসত গোপাট থেকে।
এখন থেকে সমতুল সার তার ভাই—বোনদের নিয়ে তক্তপোশেই হয়তো গোল হয়ে বসবেন। মাইনর স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক সমতুল সার তাদের বাড়িতেই থাকেন, খান। তাদের পড়াশোনার সব দায়িত্ব তাঁর। সে নেই। সে আর সন্ধ্যায় হারিকেন জ্বেলে বৈঠকখানায় সারের সামনে গিয়ে পড়ার জন্য বসতে পারবে না।
স্টিমারে উঠে এই সব অতি—তুচ্ছ ঘটনাই এত বেশি তাকে পীড়া দিচ্ছে যে সে আশরাফ মিঞার সঙ্গে দেখা করার কোনও উৎসাহই পাচ্ছে না।
আশরাফ মিঞা কখন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সে টের পায়নি। বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই গেলি না, আশরাফ নিজেই উঠে এসেছে।
আপনারা এখানে!
অরু আর কী করে!
সে নদীর দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। বাবার সেই অসামান্য মানুষটি তাদের খোঁজে ডেক—ছাদে চলে এসেছে। সে পেছন ফিরে তাকাতেই আশরাফ বলল, কী—গ কর্তা, মন ব্যাজার কেন এত! মানুষ কি কখনও এক জায়গায় থাকে! পড়ালিখা করতে যাচ্ছেন, কত সুখবর বোঝেন না! ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকলে হয়? বড় হয়েছেন না!
অরু দেখল, লুঙ্গি পরে ফতুয়া—গায়ে লোকটি প্রায় আত্মীয়ের মতো কথা বলছে। তাকে আশ্বস্ত করছে, বাড়ির খবর ইচ্ছে করলে রোজই পেয়ে যাবেন। মা—র জন্য মন খারাপ করবেন না। রোজ না পারি, এক—দু’দিন অন্তর বাড়ির খবর দিয়ে আসব। আসেন আমার সঙ্গে। স্টিমারটা ঘুরে দ্যাখেন—কত মজা আছে ইঞ্জিন—ঘরে ঢুকলে বুঝতে পারবেন।
আশরাফ তাকে নিয়ে আপার ডেক থেকে লোয়ার ডেকে নেমে গেল। জগদীশ সঙ্গে গেলেন না—আশরাফ দেশের লোক, সে নদীতে স্টিমার চালায় বলে কর্মস্থল যেতে আসতে নানা সুবিধাও থাকে। আশরাফের সঙ্গে তাঁর খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক—একটাই মুশকিল, আশরাফের আদর—আপ্যায়ন একটু বেশি মাত্রায়—যেমন সে আলাদা বন্দোবস্ত করে জগদীশকে খাওয়াতে চায়। লস্করদের একজন জগদীশের স্বজাতি—সেই আসন পেতে চিঁড়ে—মুড়ি অথবা দই দিয়ে ফলারের বন্দোবস্ত করে দেয়। এতে জগদীশ যে খুবই বিব্রত বোধ করেন, আশরাফ কিছুতেই বুঝতে চায় না। স্টিমারে আশরাফের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার এই একটা বিড়ম্বনা আছে। যাত্রীবোঝাই স্টিমারটিতে পা ফেলার জায়গা থাকে না। যে যেখানে পারছে আসন পেতে বসে থাকে। দূরের যাত্রীরা বিছানাপত্রও তুলে আনে। তিনি একা থাকলে আশরাফের কেবিনের দিকে সহজে পা মাড়ান না। যতটা পারেন আশরাফকে এড়িয়ে চলেন।
