স্নান সেরে উঠে আসার সময় ঘাটবাবু দেখলেন লাঠি নিয়ে হাঁটছে দুখিয়া। মংলি মনে মনে হিসাব কষছে—কত দাম হবে, কত বিক্রি হবে। মংলির চোখ দুটো, দুখিয়ার লাঠি এবং চটানের মেয়ে—মরদের লোভী ইচ্ছাগুলো ঘাটোয়ারিবাবুর মনে বিরক্তির জন্ম দিচ্ছে।…দু দণ্ড সবুর কর। একটা ছোট মানুষ তোদের এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে, পৃথিবীর হের—ফেরটাই জানতে পারেনি। সুখ—দুঃখের অর্থটাই ধরতে পারেনি—তার জন্য তোদের একটু কষ্ট হওয়া উচিত। একটু দূরে সরে দাঁড়া। ওভাবে ঝুঁকে দাঁড়াস না মড়ার ওপর। তোদের নজর বড় খারাপ নজর।
নিজের এই চিন্তার জন্য তিনি আশ্চর্য হলেন। যত বয়স বাড়ছে তত পৃথিবীর জন্য দরদ বাড়ছে। তিনি নিজেকেই বললেন, ঘাটবাবু, তোমার অমন চিন্তা ভালো নয়। মৃত্যুই তোমার জীবনের বড় সত্য—তাকে অস্বীকার কোর না।
অফিসঘরে ঢুকে তিনি কাপড় ছাড়লেন। ধূপ—ধুনো জ্বেলে টাঙানো ছবিগুলোর সামনে ধরলেন। তারপর রেজিস্ট্রি খাতায় কাঠের বাক্সে। তিনি ছবিগুলোর কাছে গিয়ে সকলকে এক, দুই করে প্রণাম করলেন। উপনিষদের দুটো পরিচিত শ্লোক উচ্চারণ করে সকলকে শুনালেন। লোকটা তখনও কাউন্টারের ওপিঠে পায়চারি করছে। বিরক্ত হচ্ছে, ঘাটোয়ারিবাবুর বেয়াড়া কাজগুলো দেখছে। শুধু একবার কাউন্টারে উঁকি দিয়ে বলেছে, কী হল আপনার?
হবে, হবে। সময় হলে হয়ে যাবে। তখন আপনাকে বলতে হবে না। আর আমি ইচ্ছা করলেও দু দণ্ড দেরি করতে পারব না।
তিনি এ সময়ে দরজা, জানালা বন্ধ করে দিলেন। কাউন্টারে ঝাঁপ ফেলে দিলেন এবং মহাভারতের আদি পর্ব থেকে পাঠ করতে থাকলেন: নারদ কহিলা তবে দেব নারায়ণে। অদিতি কহিল যত কুণ্ডল করনে।। নরক আনিল বলে অদিতি কুণ্ডল। লুটিয়া অমরাবতী অমরী সকল।। পৃথিবীর পুত্র হয় নরক দুর্মতি। তারে না মারিলে যায় স্বর্গের বসতি।।
লোকটা কাউন্টারের ওপাশ থেকে চিৎকার করে উঠল, অ মশাই। মহাভারতটা দয়া করে পরে পড়বেন। দয়া করে নাম ধাম লিখে অধমকে বিদায় করুন।
ভিতর থেকে কোনো জবাব এল না। অথবা কোনো সাড়া। রোদ বাড়ছে। রোদ ঘন হচ্ছে। ওরা মড়া আগলে ওর অপেক্ষায় বসে আছে। এখন শুধু ঘাটবাবু ছেড়ে দিলেই হয়। তারপর কাঠ নিয়ে যাওয়া আছে। চিতা সাজানো আছে। গঙ্গার জলে দেহটাকে শুদ্ধ করার কাজ আছে। অনেক বেলা হবে আগুন দিতে। সে এই সব ভেবে ফের ডাকল, অ মশাই!
কোনো জবাব নেই। কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না ভিতরে। ভিতর থেকে ধোঁয়াটে ভাব এবং গন্ধ। তিনি গঞ্জিকা সেবন করছেন তবে! ভারী বদ লোক ত দেখছি। লোকটা পায়চারি করতে করতে উত্তেজিত হয়ে উঠল।
তিনি ধোঁয়ার জগতে অনেকক্ষণ বসে জগতের অনিত্যতাকে উপলব্ধি করে কাউন্টারের পাল্লা খুলে দিলেন। কী নাম, কোথায় থাকে, বয়স কত, হাসপাতালে মরল—ডেথ সার্টিফিকেট আছে কিনা, এসব কথাগুলোও জিজ্ঞাসা করলেন।
এই সময় দুঃখবাবু এল। হরীতকী এল। লোকটা অফিস থেকে ঘাটে নেমে যাচ্ছে। কাঠ মাপছে ঝাড়ো। ডোমের মেয়ে—মরদেরা কাঠ নামাচ্ছে গঙ্গায়। কিছুদিন থেকে নেলি চিতা সাজানোর কাজটা পেয়েছে। নেলি চিতার কাঠ সাজাবে। সেজন্য সে গঙ্গায় নেমে যাচ্ছে।
দুঃখবাবু হঠাৎ বললেন, বড় করুণ, বড় করুণ!
ঘাটবাবু জবাব দিলেন না। তিনি যেন কথাটার যথার্থ অর্থই ধরতে পারেননি এমন ভাব দেখালেন।
দুঃখবাবু হরীতকীকে উদ্দেশ করে বললেন, দেখলি হরীতকী, লোকটার কী সর্বনাশ! জলজ্যান্ত কাঁচা ছেলেটা গেল। আমাদের পাড়ার অরুণবাবুর ছেলে।
আপনার ছেলেটা কত বড় হয়েছে দুঃখবাবু? ঘাটবাবু এতক্ষণে সব ধরতে পেরে প্রশ্ন করলেন নতুন বাবুকে।
আর ছেলেপুলে! যমের ঘর নিয়ে সংসার মশাই। কখন যে কোনটা খসবে…! নতুন বাবুকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে এখন।—ওরা আমার ছেলেপুলে নয়, সব ওঁর, সব ঈশ্বরের। বড়টার বয়স আশ্বিন এলে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।
একদিন ছেলেটাকে নিয়ে আসুন না দেখি। বড় ইচ্ছা হয় দেখতে। কী বলব, আপনার সংসারের কথা শুনে আমার বড় আপশোশ হয়। ইচ্ছা হয় নিজেও একটা সংসার করি। ঘর বাঁধি। ঘাটোয়ারিবাবু এইসব বলে কেমন লজ্জা পেলেন। তিনি আবার আগের কথায় এলেন। আমাদের কথা ওদের আপনি বলেছেন।
বলিনি! কী যে বলেন, সব! বলেছি। আপনার কথা বলেছি, হরীতকীর কথা বলেছি। নেলি, গোমানি, কৈলাস, গেরু—সবার কথা বলেছি। ওরা তো লেগেই আছে এখানে আসবে বলে। আমি নিয়ে আসি না। মনটা আমার খুঁতখুঁত করে।
হরীতকী বিরক্ত করছিল তখন ঘাটবাবুকে—তুর জন্য কী রাঁধি বুলে দে। বেলা তো বাড়ছে। তুর সে খেয়াল আছে বাবু!
যা হয় কিছু রেঁধে দে বাপু। এখন জ্বালাস নে। দেখছিস তো দুঃখবাবুর সঙ্গে গল্প করছি।
হরীতকী উঠে দাঁড়াল। একটা ঝাঁটা এনে ঘরটা ভালো করে পরিষ্কার করে দিল। তারপর আকাশের বেলা দেখতে বের হয়ে গেল।
দুঃখবাবুর সঙ্গে গল্প করে ঘাটোয়ারিবাবুর মনটা কোমল হয়ে উঠেছে। একটি ঘর, একটি সংসার ছোট সব সুখ—দুঃখ, ছোট ছোট কথার জন্য মনটা মাঝে মাঝে অবুঝ হয়ে ওঠে। তখন মনে হয় ঘাটের নিষ্ঠুরতা—ওঁর মন এবং হৃদয়ের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছে। তখন মনে হয় এ চটান ছেড়ে পৃথিবীর অন্য কোথাও গিয়ে বাঁচতে। ঘর বাঁধতে। ভাবতে ভাবতে আবার বলেন, একদিন নিয়ে আসুন না আপনার ছেলেকে আপনার মেয়েকে। একটু আদর করি। আমি ওদের কোনো অনিষ্ট করব না। দুঃখবাবু আমার আদর করার মতো কেউ নেই। কথাগুলো বলে তিনি চোখ বুজলেন। একটু সামান্য সুখের ইচ্ছায় তিনি চোখ বুজে আছেন। চোখ খুললেই যেন সামান্য সুখের ইচ্ছাটাকে চটানের নিষ্ঠুরতা গ্রাস করবে। চোখ বুজেই বললেন, কী আনবেন তো, কথা দিচ্ছেন তো? কথা বলছেন না কেন?
