কোটের উপর চাদর চড়াইয়া ভাবী মোক্তার অন্তর্হিত হইল। সঙ্গে সঙ্গে অজয় কহিয়া উঠিল : “লোকটা ভালো নয়, প্রদীপ। কাল রাতে লুকিয়ে ও আমার সুকেশ ঘেঁটেছে। লোকটা হয় চোর, নয় তার চেয়েও জঘন্য। আমাকে কিছু পয়সা দাও। আমিও এক্ষুনি বেরব।”
প্রদীপ চকাইয়া উঠিল : “বল কি? এই অসুস্থ শরীরে তুমি কোথায় যাবে?”
অজয় এমন করিয়া অল্প একটু হাসিল যে, প্রদীপ অধোবদন হইল। তবু কহিল,—“পয়সা ত’ আমার কাছে একটিও নেই।”
–“না থাক্; লাগবে না। এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না।” বলিয়া ক্লান্তপদে সে উঠিয়া দাঁড়াইল। . কোন রকমে সার্টটা গায়ে দিল, পায়ে জুতা ছিল না—সুটকেসটা হাতে লইয়া বাঁ-হাতে চুলগুলি একবার নাড়িয়া দিয়া কহিল,-“আমি চলুম। (উমার প্রতি) আপনার সঙ্গে ভালো করে আলাপ হ’ল না। আবার যদি কোনো দিন দেখা হয়, আপনাকে ঠিক চিনে নিতে পারুব। কিন্তু আবার কি দেখা হবে?”
উমা ও প্রদীপের মুখে কোনো কথা আসিল না, সমস্ত ঘরের আবহাওয়াটা নিমেষে কেমন ভারি, থমথমে হইয়া উঠিয়াছে। অজয়কে সত্যসত্যই টলিতে টলিতে দরজার দিকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া প্রদীপ বাধা দিয়া বলিল,—“একটা গাড়ি ডেকে দেব?”
অজয় হাসিয়া কহিল,—“কিন্তু ভাড়া? গাড়ি লাগবে না।”
উমা এইবার কথা পাইল : “যদি কিছু মনে না করেন ত’ আমার কাছে সামান্য কিছু আছে।”
-“মনে কিছু নিশ্চয়ই কবুব। দিন শিগগির।” বলিয়া অজয় হাত পাতিল।
সেমিজের মধ্য হইতে ছোট একটি ব্যাগ খুলিয়া তিনটি টাকা অজয়ের হাতে দিতেই সে মুঠা করিয়া কপালে ঠেকাইল। কহিল, “আমার লোভ যে আরো বেড়ে যাচ্ছে। এবার আপনি যদি কিছু মনে না করেন ত’ আপনার দু’-হাত থেকে একগাছি করে সোনার চুড়ি আমাকে উপহার দি। দু-হাত থেকে একগাছি করে’ চুড়ি আপনার খোয়া গেলে আপনাকে আরো সুন্দর দেখাবে। আমার একদম ট্রেন-ভাড়া নেই। (হাসিয়া) আমি আমার দেশের বাড়ি ফিরে যাচ্ছি কি না। আসচে সাতাশে তারিখে যে আমার বিয়ে হবে।”
মুহূর্তে যে কি হইয়া গেল, ভাবাবেশে উমা আদ্যোপান্ত কিছু বুঝিতে পারিল না। ধীরে ধীরে চুড়ি দুইগাছি সে খুলিয়া ফেলিল। তাহার হাত হইতে ছিনাইয়া লইবার মত করিয়া তাড়াতাড়ি চুড়ি দুইগাছি টানিয়া নিয়া অজয় কহিল,—“তা হলে গাড়ি একটা ডেকে দাও, প্রদীপ। পরের পয়সায় বাবুগিরি যখন কপালে আছেই, একটুতেই তাছাড়ি কেন? যাও দেরি করো না।”
প্রদীপ তাড়াতাড়ি চলিয়া যাইতেছিল, উমা কহিল,-“দাঁড়ান, আমিও যাচ্ছি আপনার সঙ্গে।”
—“আমার সঙ্গে কোথায় যাবে তুমি? একা বাড়ি ফিরতে পারবে না?”
হাসিয়া উমা জবাব দিল : “না, পথ কি আর চিনি? কিন্তু আপনার সঙ্গে দরকারী কথাটাই যে বাকি রইল।”
অজয় কহিল,—“চট্পট্ সেরে নি, বেশিক্ষণ আমি দাঁড়াতে পারছি না।”
উমা প্রদীপকে কহিল,—“আপনি একদিন বৌদি’র ঠিকানা খুজছিলেন না? তিনি এখন আমাদের ওখানেই এসেছেন।”
—“কে? নমিতা? তোমাদের ওখানকার ঠিকানাঠটা কি শুনি?” বলিয়া অজয় পকেট হাতড়াইয়া এক-টুকরা কাগজ বাহির করিল। সামনের কেরোসিন কাঠের টেবিলটার উপর কোথাও পেন্সিল একটা পাওয়া যায় কি না তাহারই সন্ধানে অন্যমনস্ক অজয় কহিতে লাগিল, “যতই দুৰ্ব্বল আর সন্দিগ্ধ হোল্ক না কেন, সেবায় নমিতার হাত আছে। একটুও ঘেন্না না করে দু’হাতে আমার বমি কাচালে। ভেবেছিলুম এ-কথা স্মরণ করে’ নমিতাকে ভবিষ্যতে একটি অবিনশ্বর মর্যাদা দেব। কিন্তু পরে যখন তার ভেতর থেকে সঙ্কীর্ণদৃষ্টি ভীরু নারীপ্রকৃতি আত্মপ্রকাশ করল তখন তার সেই অধঃপতনকে ক্ষমা করতে পারলুম না।”
প্রদীপ বলিল,—“তাকে তোমার ক্ষমা না করলেও চলবে। স্বল্প পরিচয়ের অবসরে তুমি তাকে ছিনিয়ে নিতে চাইবে, আর আবেগে অন্ধ হয়ে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করল বলেই সে ভীরু? আমি তার বিচক্ষণতাকে প্রশংসা করি। উত্তেজনার কুয়াশায় বুদ্ধিকে সে আচ্ছন্ন করে নি।”
—“ঐ রকম অকর্মণ্য বুদ্ধি নিয়ে সে চিরকাল কৃত্রিম বৈধব্য-পালনই করুক। অকারণ সন্তান প্রসবের চেয়েও তা নিন্দনীয়।”
প্রদীপের ইহা সহিল না। কহিল,—“অত্মিীয়ের নিন্দা আত্মীয়ের সামনে শোভন নয়। একটু সংযম শিক্ষা করলে ভালো করতে।”
অজয় উমার দিকে ফিরিয়া কহিল,—“ও! আপনি ব্যথিত হচ্ছেন? কিন্তু যেটা সত্যিই নিন্দনীয় সেটা গোপন করে রাখলেই পাপ। এমনি করে আমাদের সমাজে পাপের প্রসার হচ্ছে।”
উমা কহিল,—“এখন সমাজতত্ত্ব সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্যটাও আপনাকে শুনতে হলে আপনার এমনি করে অসুস্থ শরীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বার মতলবের কোনো মানে থাকবে না। যান দীপদা, গাড়ি নিয়ে আসুন।”
উমাকে নিজের পক্ষে পাইয়া প্রদীপ জোর পাইল। কহিল, “তুমি ভাবছ এমনি সর্বনেশে উচ্ছলতার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়াটাই জীবন—”
অজয় চেঁচাইয়া উঠিল : “হাঁ, এই সৰ্বনেশে উচ্ছঙ্খলতা! এই জীবনের যথার্থ প্রতিশব্দ! নইলে ঐ ব্যর্থতা আমার সহ্য হয় নি, আমি তাকে বলিষ্ঠ কর্মের মধ্যে আহ্বান করেছিলুম—যে-কর্মের পুরস্কার মহামহিমান্বিত পরাজয়! নমিতা একটা পায়রার চেয়েও ভীরু।”
উমা কহিল,—“দুর্ভাগ্যবশত আপনি হাততালি পেলেন না। আমি বৌদিকে আরেকবার বলে দেখব ‘খন।”
অজয় পেন্সিল পাইল না। কহিল,—“তার ঠিকানাটা দিন, দরকার হলে তার কাছে আবার আমার আবির্ভাব হবে। ইতিমধ্যে আকাশের ঝড়ের আকারে তার ওপরে সমাজের অভিশাপ বর্ষিত হ’তে থাকু। এবার এলে আমাকে যেন শূন্য হাতে আর ফিরতে না হয়, ভগবান।”
