হাত উল্টাইয়া যদু বলিল,—“তা ত’ আমি জিজ্ঞাসা করিনি, বাবু।”
নিশ্চয়ই নমিতা আসিয়াছে। প্রদীপ আর সন্দেহ করিল না। স্থাণ্ডে দুইটার মধ্যে পা দুইটা ঢুকাইয়া তাড়াতাড়ি নামিয়া চলিল। সেই প্রত্যাশিত প্রভাত আজ আসিল বুঝি—নমিতাকে সে আজ কোন্ মূর্তিতে দেখিবে? বিদ্রোহিনী বিজয়িনীর বেশে, না সরমনমিতা স্পর্শভীরু কবিকল্পনার মত? ভগবান করুন, সে যেন এই নির্মল প্রভাতটির সঙ্গে একটি অম্লান সাদৃশ্য রাখিয়াই অবতীর্ণ হয়! সেই অল্প কয়টি মুহূর্তের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সে যে কত কিছু ভাবিয়া নিল, তাহার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু নীচে আসিয়া যাহাকে সে দেখিল, তাহা স্বপ্নেরও অতীত ছিল বোধ করি।
দম নিয়া প্রদীপ কহিল,—“তুমি? এ সময়ে এখানে?”
উমা মিষ্টি করিয়া হাসিয়া বলিল,-“সকালবেলা যে আমি মাঠে বেড়াতে যাই। প্রত্যহ। শচীপ্রসাদকে কাল আসতে বারণ করে’ দিয়েছি। একাই বেরোলুম আজ।”
হতাশার আবেশটা কাটিয়া যাইতেই প্রদীপ যেন সুস্থ ও সচেতন হইল। কহিল,—“হঠাৎ আমার কাছে? কোনো দরকার আছে?”
উমা দুইটি টলটলে ডাগর চক্ষু নাচাইয়া কহিল,—“ববার মত দরকার কিছুই নেই তেমন।”
প্রদীপ হাসিয়া কহিল,—“না বলবার মত আছে ত’?”
—“তেমন একটা কিছু না থাকলে বিজ্ঞানই অচল হয়ে পড়ে শুনেছি। শুনতে চান? আপনার সঙ্গে অনেকদিন দেখা নেই, দেখা করতে এলুম। আমাদের বাড়ির মত আপনিও আমাকে তাড়িয়ে দেবেন নাকি?”
প্রদীপ কহিল,—“দিলেই কিন্তু ভালো হত। কেননা এটা মেষজাতীয় পুরুষদের একটা মেস। এখানে তোমার পায়ের ধূলো পড়লে অনেকের ব্যঞ্জনই বিস্বাদ হয়ে উঠবে।”
কৌতূহলী হইয়া উমা কহিল, “কারণ?”
—“কারণ, আমাকে সুনজরে দেখে না এমন প্রতিবেশী আমার উঠতে বসতে। প্রকাশ্যে তুমি আমার আতিথ্য স্বীকার করলে, কালক্রমে তুমিই হয় ত’ আমার ওপর অকরুণ হয়ে উঠবে; কারণ একদিকে তোমার সংসার, অন্য দিকে এই কুৎসিত জনতা।”
উমা একটুও বিচলিত না হইয়া বলিল,-“অত সব কথা আমার মুখস্ত নেই। আপনার সঙ্গে দেখা করার দরকার আমার আছে কি নেই, সে বিচার আমি আপনার সঙ্গে করব। অন্য লোকের যদি তাতে গাত্রদাহ বা পিত্তশূল হয়, হবে। তাদের বিনা-দামে আমরা চিকিৎসা করতে যাব কেন? চলুন, ওপরে আপনার ঘরে। বলবার মত। দরকার একটা পেয়েছি।”
প্রদীপ ঘামিয়া উঠিল। উমা উত্তেজিত হইয়া সিড়ির উপর পা বাড়াইয়া দিয়াছে। তাহাকে বাধা দিতে গেলেই সে আরো অবাধ্য হইয়া উঠিবে। প্রদীপ তাড়াতাড়ি রাস্তার উপর নামিয়া আসিল। বলিল,-“চল পার্কে, তোমার দরকার অদরকারের সমাধান হবে।”
উমা নড়িল না, কহিল,—“সেখানেও প্রকাশ্য জনতার ভয় আছে। আমি আপনার এই অন্যায় ও মিথ্যা সমাজহিতৈষণার শাসন করব। কথাটা খুব জমকালো করে বল্লম, কেননা সোজা কথা ঘোরালো করে’
বলে আপনারা বোঝেন না। আপনার এই আতিথেয়তার প্রতিদান আমি দেব একদিন—আমাদের বাড়িতেই নিমন্ত্রণ করে।”
প্রদীপের তবু সাহস হইতেছিল না; না জানিয়া-শুনিয়া উমা এই বিপদের মুখে কেন পা বাড়াইতেছে? সে ধীরে কহিল,—“ব্যাপারটা
খুব শোভন হবে না, উমা! তা ছাড়া—”
উমা হাসিয়া বলিল,-“আপনার ‘তা ছাড়া’-টা বলুন। আগের যুক্তিটা বাতিল।” পরে মুখ নিদারুণ গম্ভীর করিয়া সে কহিল,—“এত সব অমানুষিক কাজের ভার নিয়েছেন, অথচ একটি মেয়ের সম্পর্কে সামান্য লোকনিন্দা বহন করতে পারবেন না? তার চেয়ে বেত হাতে স্কুল-মাষ্টার হওয়াই আপনার উচিত ছিল। চলুন।”
প্রদীপও গম্ভীর হইল : “তা ছাড়া আমার ঘরে একটি অসুস্থ বন্ধু আছেন। তাঁর জ্বর।”
—“বন্ধু?” ভুরু কুচকাইয়া উমা কি ভাবিতে চেষ্টা করিল : “তার নাম কি?।
—“বন্ধুদের নাম যাকে-তাকে বলতে হয় না।”
—“বেশ ত’, তারই সঙ্গে আমার দরকার। কি করে আর আমার পথ আটকাবেন? এটা পঞ্চভূতের মেস, আপনার নিজের বাড়ি নয়। আপনার অসুস্থ বন্ধুর হার্টফেল থেকে তাকে শিগগির বাচা বলছি।” বলিয়াই উমা পাশের সিড়ি দিয়। উপরে উঠিতে লাগিল।
অগত্যা প্রদীপ আর পদানুসরণ না করিয়া করে কি। তাহাকেই ঘর দেখাইয়া দিতে হইল। অজয়ের ঘুম ভাঙিয়াছে; বালিশটাকে দেয়ালের গায়ে রাখিয়া তাহাতে পিঠ দিয়া সে অন্যমনস্কর মত বসিয়া ছিল। ঘরে হঠাৎ একটি অপরিচিতা কিশোরীকে দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। তাহার সর্বাঙ্গ হইতে চাপল্য যেন পিছলাইয়া পড়িতেছে; মুখোনিতে সাধারণ বাঙালি মেয়ের মুখের মত একটা নিরীহতা নাই, অন্তত নমিতার মুখে সে এই দীপ্তি ও ধী দেখিয়াছে বলিয়া মনে হইল না। সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপও ঘরে ঢুকিল। অজয়ের একটু আশ্বস্ত হইবার আগেই প্রদীপ বলিয়া উঠিল,—“নমিতাকে ত’ তুমি চিনতে, এ তারই ননদ। তোমার একটা সামাজিক পরিচয়ই দিলুম, উমা।”
উমা চক্ষু বড় করিয়া কহিল,—“আমার আরেকটা অসামাজিক পরিচয় আছে নাকি?”
প্রদীপ কহিল,—“নেই? বল্ব তবে?”
উমা বলিল,-“মিছিমিছি কেন অতিরঞ্জন করবেন?” আমিই বছি : “বাড়ির শাসন আমি মানি না, সকাল বেলা একা বেড়াতে বেরই, মে-এর দুয়ারে দাঁড়িয়ে কেউ বাধা দিলে তাকে টপকে উপরে উঠে আসি। এই ত’?”
দুই বন্ধু হাসিয়া উঠিল। অজয় বিছানার উপর একটু সরিয়া
বসিল : “বসুন এখানে।”
যে ব্যক্তি মোক্তারি পড়ে সে বাহিরে যাইবে বলিয়া কাছা আঁটিতেছিল, চক্ষু দুইটা তেছা করিয়া সে ফিক ফিক্ করিয়া হাসিল। বলিল,—“একটা চেয়ার এনে দেব?”
উমা কহিল,—“চেয়ারে বসে বক্তৃতা দিতে আমি আসিনি। (অজয়ের প্রতি) বয়েস আন্দাজে আমাকে আপনার খুব এঁচড়ে-পাকা মনে হচ্ছে, না? আমি তাই।”
