উমা হাসিয়া কহিল,—“আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন নাকি?”
—“নিশ্চয় করি।” প্র
দীপ ঠাট্টা করিয়া কহিল,—“উনি অবতার।”
—“সত্যি তাই। আমি আমার নিজের ভগবান। কিন্তু অযথা বাকৃবিস্তার আর কবো না। ঠিকানাটা বলুন, মনে করেই রাখব ঠিক। নমিতাকে যদি না ভুলি ত’ তার ঠিকানাটাও ভুলব না।”
উমা কহিল,—“ঠিকানা জেনে লাভ নেই। আপনার আবির্ভাবের সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।”
—“কেন? কেন?” অজয় উৎসুক হইয়া উঠিল : “আমার সম্পর্কে তার খুব নিন্দা হচ্ছে বুঝি? তার চরিত্রে দোষারোপ হয়েছে? তাই হোক। আমি শুনে খুব সুখী হলুম।”
প্রদীপ ঝাঝালো গলায় কহিল,—“সুখী হ’লে? তুমি দিন-কে-দিন ইতর হচ্ছ।”
অজয় চটিল না, কহিল,—“আমি নমিতার উপকার চাই। অপবাদ ওর যত উপকার করবে শত উপদেশেও তা হবে না। নমিতা যদি বাঁচে নিজেকে যেন ঘৃণ্য মনে করে’ই বাঁচে—তাতে যদি উদ্ধারের একটা উৎসাহ পায়। নিজের সতীত্ব নিজেই যেন লুণ্ঠন না করে।”
—“ঢের হয়েছে, এবার থাম। শালীনতা বলে’ জিনিস তোমার জানা নেই দেখছি। তুমি এখন গেলেই আমরা সুখী হ’ব।”
অজয় চকাইয়া উঠিল; কহিল,—“যাচ্ছি। বলুন ঠিকানাটা।”
—“বলো না, উমা খবরদার। তুমি একে চেন না।”
প্রদীপের মুখের এই কর্কশ কথা শুনিয়া অজয় মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হইয়া গেল, কি বলিবে ভাবিয়া পাইল না। নমিতার প্রতি সে কঠিন হইতেছে বলিয়া প্রদীপের কেন যে আঘাত লাগিতেছে তাহা তলাইয়া দেখিবার সময় ছিল না; এবং সময় থাকিতেও জাতির দুর্দশার দিনে কোনো যুবক সামান্য নারী-প্রেমে মাতোয়ারা হইতে পারে এমন একটা জাজ্বল্যমান সত্যকে সে প্রাণপণে অস্বীকার করে। তবু কি ভাবিয়া সে কহিল,—“সত্যিই আমাকে আপনি চেনেন না; চেনেন না বলেই তবু দুয়েকটা কথা বলছেন—আমাকে না চিন্বার আগেই যদি ঠিকানাটা দেন ত’ পাই, নইলে—” অজয় জোর দিয়া কহিল,–“নইলে ঠিকানা একেবারে পাবই না ভেবেছ, প্রদীপ? আমাদের কোটি কোটি কামনার ফলে পৃথিবীর সৌভাগ্য-সম্পদ যেমন অনিবাৰ্য, তেমনি নমিতার প্রতি আমার প্রয়োজনবোধ যদি কোনো দিন একান্ত হয়ে ওঠেই, তোমাদের শত-লক্ষ অবরোধ তাকে নিবারণ করতে পারবে না। এ-কথা তোমাকে আমি উঁচু গলায় বলে যাচ্ছি। কিন্তু ভগবান করুন, আমার প্রয়োজনে তাকে যেন মুক্ত না হতে হয়, সে যেন নিজের প্রয়োজনেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে।”
—“বলি তুমি যাবে, না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার কসরৎ করবে?” প্রদীপ অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছে।
অজয় কহিল,—“যাব বৈ কি। একজায়গায় বেশিক্ষণ থাকবার জো কোথায়? (উমার প্রতি) কিন্তু ঠিকানা যখন পেলুমই না, তখন নমিতার সম্বন্ধে বাকি খবরটুকু জেনেই যাই না হয়। তার সঙ্গে দেখা হবার সমস্ত পথ ত’ আপনারাই বন্ধ করে দিলেন।”
প্রদীপ চঞ্চল হইয়া উঠিল : “বাকি খবরে তোমার দরকার নেই। সে আমাকে উমা আরেকদিন বলবে। তোমার গাড়ি লাগবে কি না, বল। আমার কাজ আছে।”
অজয় হাসিয়া কহিল,—“তার চেয়ে আমার কাজ আরো জরুরি। নমিতার খবর আমার চাই। বলুন। আমি নমিতাকে উদ্যত শাসনের ফণা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলুম, সে স্বেচ্ছায় দাসত্ব যেচে নিয়েছে—
প্রদীপ ফের প্রতিবাদ করিল : “তুমি তার আচরণের এমন কদৰ্য্য ব্যাখ্যা করোনা বছি।”
—“হ্যাঁ, সে দাসত্বের যুপকাষ্ঠে আবার গলা বাড়ালে। মেয়েদের আত্মকর্তৃত্ব হয় ত’ প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ।”
-“তোমার সঙ্গে গেলে তুমি তার আচরণের যত মহান অর্থ-ই দিতে কেন আমরা তাকে স্বেচ্ছাচরিণী বলতাম। সেখানেও সে তোমার দাসত্ব করত।”
—“ভুল, প্রদীপ। সে দাসত্ব করত জাগ্রত ভাগ্য-বিধাতার। সে-দাসত্ব পূজা, নৈবেদ্য, জীবনোৎসর্গ!”
উমা এতক্ষণে কথা কহিল : “বৌদি ত’ পূজোই করছেন। বাকি খবরটুকু তার তাই।”
—“পূজো করছে? কার?” প্রশ্নের উত্তর পাইবার আগেই অজয় আপন মনে বলিয়া চলিল : “তার ক্ষণিক দুর্বলতা দেখে সত্যিই আমি একেবারে আশা ছাড়িনি, প্রদীপ। বহু যুগের প্রথা ও সংস্কারের ভস্মে আচ্ছাদিত থেকেও তার মধ্যে আমি বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ দেখেছিলুম। নিজের দৈন্য দেখে একদিন দেশকে সে বড়ো করে অনুভব করবেই।
সে পূজার লগ্ন তার জীবনে এল?”
উমা তরলকণ্ঠে কহিল,—“দেশ নয়, স্বামী।”
একটা বজ্ৰ ভাঙিয়া পড়িলেও বোধ করি এতটা ঘাবড়াইবার হেতু ছিল না। অজয় যেন স্বপ্নে একটা পৰ্বতচূড়া হইতে নীচে নিক্ষিপ্ত হইল। রূঢ় রুক্ষস্বরে সে কহিল,—“দেশ নয়, স্বামী! স্বামীপূজো করছে সে? স্বামীর ফোটো-পূজো?”
উমা ফিক্ করিয়া হাসিয়া কহিল,-“ঠিক তাই।”
এক মুহূর্তও দেরি হইল না। উমার বাক্যোচ্চারণের সঙ্গে-সঙ্গেই অজয় সমস্ত ঘর-বাড়ি ঝাপাইয়া তুমুল অট্টহাস্য করিয়া উঠিল। ঐ কয়খানা জীর্ণ-পঞ্জরের মধ্য হইতে এমন একটা বিদ্রুপোচ্ছাস উদ্ভূত হইতে পারে এ-কথা কোনো শারীরতত্ত্বশাস্ত্রে লেখা নাই। উমার কথা শুনিয়া প্রদীপও সামান্য স্তম্ভিত হইয়াছিল বটে, কিন্তু এমন একটা কুৎসিত অপরিমেয় হাসি শুনিয়া তাহার স্নায়ুতে আর যেন বল রহিল না। উমাও দেয়ালের দিকে পিছাইয়া গিয়াছে। অজয় সুটকেশটার হাত বদল করিয়া বলিল,-“ঠিকানা আর আমার চাইনে। সে মরুক্!” বলিয়াই সে দুৰ্বল ক্লান্ত পায়ে নীচে নামিতে লাগিল। দুই-তিনটা সিড়ি নামিয়া সে কহিল, “আমি শরীরে এখন বেশ জোর পাচ্ছি, তোমার কষ্ট করে’ আর গাড়ি ডাতে হবে না।”
প্রদীপ কটুকণ্ঠে কহিল,—“পরকে ত’ মরবার অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছ, কিন্তু দেখো, নিজের উদ্ধৃঙ্খলতাই না তোমার শাপের বিপরীত অর্থ করে বসে।”
