এই সব কথা শুনিলে অজয়ের দলের লোকেরা তাহাকে যে কি ভাবিবে, তাহা সে জানিত। কিন্তু এমন করিয়া ভণ্ডামি, করিবারই বা কি মানে আছে? অনাগত ভবিষ্যৎ বংশধরদের সুখের জন্য সে নিজের সুখকে তুচ্ছ করিতে পারিলে হয় ত’ কোনো দিন কলিকাতা শহরে তাহারই নামে একটা রাস্তা হইয়া যাইত; কিন্তু নিজের সুখকে যদি সে জুতার সুখতলার মত চুড়িয়া ফেলিতে না পারে তবে কি তাহার ক্ষমা মিলিবে না? সুখ সে পাইবে কিনা কে জানে, হয় ত’ যে-পথে সে পা বাড়াইবে ভাবিতেছে, সে-পথে দুঃখের রাজ-সমারোেহ চলিয়াছে—তবু হয় ত’ তা সমারোহই। কোথায়ই বা সমারোহ নয়? যে কিছু চাহে না বলিয়া ভগবানকেই চাহে, ঐশ্বৰ্য্য সে কম ভোগ করে না। মরিলে সে অমর হইবে, এমন একটা পরম প্রলোভনেই ত’ অজয়—অজয় হইয়াছে।
সে এই মরণের মধ্যে নমিতাকে টানিয়া আনিতে চাহিয়াছিল। ছি ছি! নমিতার মধ্যে সে বন্দী ভারতবর্ষের মৌনী মূর্তি দেখিয়া শিহরিত হইল, কিন্তু তাহার অন্তরালে যে কত কালের স্থবির সমাজের কলুষিত সংস্কার রহিয়াছে, সে দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল না। নমিতার মৰ্য্যাদা উচ্ছঙ্খল বিদ্রোহে নয়, সংযত আত্মপ্রতিষ্ঠায়। তাহার মুক্তি কৃপাণে নয়, কল্যাণে। প্রদীপ নমিতার পথ-নির্দেশ করিবে। সে আর স্থির হইয়া বসিতে পারিল না, হটিতে সুরু করিল।
তারাগুলি ক্রমে ক্রমে মিলাইয়া যাইতেছে। প্রদীপ ছাতের উপরই একটু ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, বোধ করি কি-একটা শব্দ হইতেই তাহার ঘুম ভাঙিল। স্পষ্ট চোখে পড়িল, কে যেন তাহার শিয়রের কাছে বসিয়া আছে। প্রথমটা ভালো করিয়া ঠাহর হইল না। লোকটাকে চিনিবার জন্য সে জামার পকেট হইতে টর্চ বাহির করিতে গেল। একা ছাতে আসিয়াছে অথচ টর্চ লইয়া আসে নাই। এই লোকটা যদি এখন অপ্রতিবাদে অস্ত্র-প্রয়োগ করিয়া বসে! যে এত অসাবধান ও অমনোেযোগী, তাহার পক্ষে ত’ সব ছাড়িয়া-ছুড়িয়া দিব্য বিবাহ করাই প্রশস্ত। ঐ পক্ষ হইতে একটা কাণ্ড হইয়া গেলে কেলেঙ্কারির আর সীমা থাকিবে না। বেচারা অজয় অসহায়!
ভীষণ ঘাবড়াইয়া গিয়া প্রদীপ কি করিয়া বসিবে, ভাবিতে ভাবিতেই লোকটা ভারি স্নিগ্ধকণ্ঠে কহিল : “আমাকে চিনতে পাচ্ছ না? আমি সুধী।”
—“সুধী?” আতঙ্কে ও বিস্ময়ে প্রদীপ লাফাইয়া উঠিল। নক্ষত্রমণ্ডলীর প্রভাবে সে হঠাৎ পাগল হইয়া যায় নাই ত’? নাকের নীচে ডান-হাতের তালুটা পাতিয়া সে নিজের নিশ্বাস অনুভব করিল। মনে ত’ হইল সে বাঁচিয়া আছে। তবে ছাত বাহিয়া এই লোকটা কোথা হইতে আসিয়া নিজেকে সুধী বলিয়া পরিচয় দিতেছে। ধমক দিবার জন্য সে চেচাইতে চাহিল, কিন্তু স্বর বাহির হইল না।
লোকটি কহিল : “আমি বলেছি বলে’ ত’ একটুও মনে হয় না। অনেক দূর দেশে বেড়াতে গিয়েছিলুম,—বায়ুকোণে ঐ যে তারাটা দেখছ সেখানে। সেখানে সাহিত্যিক বলে আমার খুব নাম হয়েছে। তোমাদের ভাষায় আমার বইগুলি অনূদিত হয় নি?”
যাহা হক্, লোকটা মারমুখো নয়, বেশ বিনাইয়া কথা কহিতে জানে। প্রদীপ এবার গলা খুলিয়া বলিতে পারিল : “দূরদেশ থেকে এতদিন বাদে কি মনে করে? বায়ুকোণের তারায়ও বেকার-সমস্যা চলেছে নাকি?”
সুধী উদাসীন হইয়া কহিল,—“অনেকদিন পরে নমিতা আমাকে স্মরণ করেছে, প্রদীপ। না এসে থাকতে পারলুম না। আমি এখুনি তার কাছ থেকে আসছি।”
—“নমিতার কাছ থেকে আসছ—তার মানে? ভূত হয়েও তুমি তার ওপর স্বামীত্ব ফলাবে? কে আর তোমার নমিতা? সূর্য অস্ত গেলেও তোমাদের দেশে আলো থাকে নাকি? নমিতার প্রতি তোমার এই রূঢ় আচরণ আর আমি সহ্য করবে না।” প্রদীপ হাত বাড়াইয়া সুধীকে ধরিতে যাইতেছিল, সে একটু সরিয়া বসিল।
সুধীর মুখে স্বল্প-ম্লান হাসি : “আমি সেই কথাই নমিতাকে বুঝিয়ে দিয়ে এলুম। তার ইহজীবনে আমি যে তার সত্যি করে কেউ ছিলুম না, মরে’ তার পূজোপচার আমি কি করে’ গ্রহণ করব? তার কাছে আমি তোমার নাম করে এসেছি।”
—“আমার নাম কেন করতে যাবে? আমি কে? তুমি বলছ কি সুধী?”
সুধী নিরুত্তর। তাহাকে নাড়া দিবার জন্য প্রদীপ সামনের দিকে তাহার দুই হাত প্রসারিত করিয়া দিল। কিন্তু কঠিন একটা ইটে হাতের মুঠা দুইটা আহত হইতেই সে দেখিল ভোরের ফিকে আলোতে সুধীকে আর দেখা যাইতেছে না। বার কতক চক্ষু কচলাইয়া নীচু হইয়া ঝুঁকিয়া রাস্তায় তাকাইল—কতগুলি ময়লা-ফেলার গাড়ি জড়ো হইয়াছে। প্রদীপ কি করিবে ভাবিয়া পাইল না, ছাতে ফের পাইচারি করিতে লাগিল। ভালো করিয়া তাহার ঘুম হয় নাই। এমন স্বপ্নও মানুষে দেখে নাকি?
মেসের চাকর ছাতে কি-একটা কাজে আসিয়াছিল, তাহাকে প্রদীপ জিজ্ঞাসা করিল,—“তুই রাতে একবার উপরে এসেছিলি?”
একটা পরিত্যক্ত কাপড় গুটাইতে গুটাইতে যদু কহিল,—“না ত’।”
—“আচ্ছা, আমার ঘরের সবাই উঠেছে?”
—“অনেকক্ষণ।”
—“আমার বিছানায় কাল যিনি শুয়েছিলেন তিনি উঠেছেন?”
—“কৈ, জানি না, বাবু।”
—“যা, দেখে আয়।”
যদু কাপড় গুছাইয়া নামিয়া গেল। বিনা-সমাধানে হঠাৎ এই ছাত ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার সে নাম করিতে পারিল না। খানিক বাদে যদু ফিরিয়া আসিল; কহিল,—“সে বাবু এখনো ওঠেন নি, শুনলাম তাঁর জ্বর। কিন্তু নীচে আপনাকে কে ডাকছেন।”
—“আমাকে?” প্রদীপের অন্তরাত্মা শুকাইয়া উঠিল। অত্যন্ত ভীতস্বরে সে চুপি চুপি কহিল,—“কে ডাকছে রে?”
যদু হাসিয়া কহিল,—“একটি মেয়ে। চিনি না।”
—“মেয়ে? কে মেয়ে?” প্রদীপ দিবালোকেও রাতের স্বপ্নের জের টানিয়া চলিতেছে বোধ হয়।
