—“সেইটেই সব চেয়ে বড় প্রার্থনা। আমার সঙ্গে তার যে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে, সেটা তোমাকে পরে বললেও চল্বে। এখন তোমাকে কিছু খাওয়াই।”
অজয় কহিল,—ক্ষিদে আমার সত্যিই পেয়েছে। কিন্তু তোমার আছে কি যে খাওয়াবে? এই ত’ তোমার বিছানার চেহারা! সামান্য একটা বাক্সও তোমার আছে বলে মনে হচ্ছে না।” বলিয়া মাথা তুলিয়া অজয় ঘরের চারিদিকে একবার চাহিল।
প্রদীপ হাসিয়া বলিল,—“দুর্ভাগ্যবশত তোমার জ্বর হয়েছে বলে তোমাকে আজ খাওয়াতে পারব না বলে মনে হচ্ছে না। পকেটে দু’ আনা এখনো আছে বোধ হয়। তুমি একটু শুয়ে থাক। আমি সাবু আর মিছরি কিনে নিয়ে আসছি।”
১৪. অজয়কে ঘুম পাড়াইয়া
অজয়কে ঘুম পাড়াইয়া প্রদীপ ছাতে চলিয়া আসিল। নিজের তক্তপোষটা বন্ধুকে ছাড়িয়া দিতে হইয়াছে; তাহা ছাড়া ঘুমও যে আসিবে এমন মনে হইতেছে না। অস্থিরপদে সে ছাতের এক প্রান্ত। হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পাইচারি করিতে লাগিল। সে এ কয়দিন প্রচুর আলস্যভোগ করিয়াছে, এইবার আবার তাহার দুই ব্যাকুল পক্ষ প্রসারিত করিতে হইবে। কিন্তু একটা করিবার মত কিছু না করিতে পারিলে তাহার আর স্বস্তি নাই।
রেলিঙ্-হীন ছাতের এক ধারে পা ঝুলাইয়। প্রদীপ বসিয়া পড়িল। অন্ধকার আকাশে অগণন তারা কোটি-কোটি ব্যর্থস্বপ্নের মত উজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে; রাস্তায় মুখ বাড়াইয়া চাহিয়া দেখিল একটি লোকও পথ চলিতেছে না। এই অবারিত স্তব্ধতার মধ্যে নিজেকে প্রদীপের কী যে নিঃসঙ্গ ও একাকী লাগিল! নিজের পেশীবহুল দৃঢ় বক্ষতটের দিকে চাহিয়া সে ভাবিল, সে কি জন্য নিশ্বাস ফেলিতেছে—এই পৃথিবীতে সে আসিয়াছে কেন? কি সে করিতে চাহিতেছে? অজয়ের দুই চোখে উগ্র মৃত্যু-পিপাসা; সে বলে : আমরা পৃথিবীতে আসিয়া মরিব এই আমাদের জীবনধারণের পরম পরিপূর্ণতা-কৰ্ম্মসাধনায়। আমাদের মৃত্যুকে মহিমান্বিত করিয়া তোলাই আমাদের কাজ। আমি আয়ুর ভিখারী নহি। স্ফটিক হইয়া চুর্ণ হইব তাহাও ভালো, তবু সামান্য প্রস্তরখণ্ড হইয়া গৃহচুড়ে অবিনশ্বর আলস্যে বিরাজ করিব না।
জীবনের মর্যাদা কষিতে হইবে মানুষের মৃত্যুর মূল্যে। . অজয় তাই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে সবলে উপেক্ষা করিয়া আসিয়াছে—সে তাহা চায় না। তার বাবার সম্পত্তির আয় বৎসরে কম করিয়া পনেরো হাজার টাকা, সে দুই হাতে তাহা নিয়া পুতুল খেলিতে পারিত। সে বলে : “বাবা যদি আমার এই ত্যাগ দেখে আমাকে ত্যাজ্যপুত্র না করেন ত’ এই টাকা দিয়ে আমি মাসিক একটা বৃত্তির ব্যবস্থা করব। সামান্য হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু একটা উদার উদাহরণ ত’ দেখানো যাবে। সুদুর দৃষ্টি আমাদের দেশে অনেকেরই আছে প্রদীপ, কিন্তু সুন্দর একটা দৃষ্টান্ত নেই।”
প্রদীপ জিজ্ঞাসা করিয়াছিল : “কি তোমার সেই উদাহরণ?”
—“মোটামুটি এই। জেল থেকে যে-সব কয়েদি বেরিয়ে এসে ফের চুরি ও ডাকাতি করা ছাড়া বেকার-যন্ত্রণা নিবারণ করবার আর পথ পায় না, তাদের জন্যে ছোটখাট করে একটা ভরণপোষণের সংস্থান করে দেব। যারা চুরি-ডাকাতি করে, তারা যত গর্হিত কাজই করুক না কেন, তাদের বুদ্ধি আছে, সাহস আছে, দলবদ্ধ হ’বার কৌশল জানা আছে। শুধু তাই নয়, একত্র সবদ্ধ হয়ে কাজ করার মধ্যে যে-সব গুণ থাকে, তা থেকেও ওরা বঞ্চিত নয়।”
প্রদীপ ফের প্রশ্ন করিয়াছিল : “যেমন?”
—“যেমন ধরো কাৰ্য সিদ্ধ করতে কেউ যদি আহত হয়, তবে তাকে তারা নিরাপদ স্থানে বহন করে রক্ষা করে—গোপনে-গোপনে সেবা-শুশ্রুষা করতে ত্রুটি করে না। এরাও মানুষ প্রদীপ, এদেররা মহত্ত্ব আছে। তোমাদের মত এরাও মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে চাঁদ দেখে, কোনো একখানি মুখের সাদৃশ্য খুঁজে নিতেও হয়ত দেরি করে না। সমাজ থেকে এদের বহিষ্করণের পথ আমি বন্ধ করে দেব।”
প্রদীপ হাসিয়া বলিয়াছিল। কিন্তু তোমার বাবা যদি তোমাকেই বহিষ্কার করেন?”
উত্তরে অজয়ও হাসিয়াছিল বৈ কি। বলিয়াছিল : “বছরে পনেরো হাজার টাকা? ফুঃ! কেড়ে নিতে কতক্ষণ!”
অদ্ভুত, অসাধারণ অজয়। তাহার সঙ্গে পা মিলাইয়া চলে প্রদীপের সাধ্য কি। সে তাহা চাহেও না। সে তাহার দেহের প্রতিটি স্নায়ু ভরিয়া তপ্ত রক্তস্রোত অনুভব করিতে চায়। এই ভাবে মরিয়া বাচিতে তাহার ইচ্ছা করে না। অজয় তাহাকে বিলাসী, ভাবুক, অলস আরো কত-কি বলিবে, তবু আজিকার এই নক্ষত্ৰপ্লাবিত আকাশের নীচে সে নিজেকে বিরহী মানুষ বলিয়াই অভিনন্দিত করিয়া সুখ পাইল।
একটা ছোটখাট চাকুরি পাইলে সে বাঁচে। এমন করিয়া ভূতের খাটিতে সে লাহোর হইতে কলিকাতা আর ঘুরিতে পারে না সে এখন একটু জিরাইয়া লইলে পৃথিবীর দুর্দশা কি এমন ভয়াবহ হইত, তাহা সে ভাবিয়া পায় না। কত দিন পরে সে ছাতে উঠিয়া আকাশ দেখিল কে জানে! সে যে একদিন কল্পিত মানুষের সুখ-দুঃখ, মনদেওয়া-নেওয়া নিয়া গবেষণা করিয়াছে বা করিতে পারে এমন কথা সে নিজেই ভুলিতে বসিয়াছিল—কিন্তু আজ তাহার রাত জাগিয়া, ভারি মিষ্টি করিয়া একটি ছোট গল্প লিখিতে ইচ্ছা করিতেছে। একটি সাধারণ ঘরোয়া গল্প—দুইটি সংসারানভিজ্ঞ স্বামী-স্ত্রী লইয়া। গল্পের একটি ছত্রেও রোমাঞ্চকর উদ্দীপনা থাকিবে না—পুষ্করিণীর মত নিস্তরঙ্গ প্রশান্ত জীবন।
সে গল্প লিখিতে লিখিতে তন্ময় হইয়া থাকিবে, ঘরের আরেকটি লোক সামনের নিবুনিবু দীপশিখাটি উস্কাইয়া দিলে তাহার সহসা জ্ঞান হইবে যে, অন্ধকার ঘরে মাটির বাতিটির চেয়েও উজ্জ্বল আরেকখানি মুখ আছে। প্রদীপ চক্ষু বুজিয়া সে-মুখ ভাবিতে গেল। স্তিমিতাভ বিমর্ষ মুখ। আশ্চৰ্য্য, কপালে সিন্দুর নাই। মুখোনি দেখিয়া মনে হয়, কত বৎসর আগে যেন তাহাকে একবার দেখিয়াছে। নাম ধরিয়া ডাকিলেই কথা কহিবে।
