ও বেদনাগগদস্বরে বলিতে লাগিল,—“মেয়েটি বিধবা, নিরঙ্করা, অশ্রুমতী! আমাদের ব্রতচারিণী তপস্বিনী ভারতবর্ষ। কিন্তু হঠাৎ
একদিন তারই সেই ম্লান চোখে বিদ্যুৎ দেখতে পেলুম—বুঝলুম সে বিদ্রোহিনী। মনে মনে তাকে প্রার্থনার মত আহ্বান করেছিলুম হয় ত’, সে আচার ও কৃত্রিম লজ্জাশীলতার বেড়া টপকে আমার ঘরে চলে এল মৰ্ত্তাবতীর্ণা মৃত্যুর মত। দুই হাতে সেবা নিয়ে, চোখে নিয়ে করুণা! মনে রেখে প্রদীপ, রাত্রে এল—যে-মুহূর্তে কবির মনে কল্পনাকায়া কবিতার আবির্ভাব হয়। আমি তাকে বল্লুম, আমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়, নমিতা।”
কথার মাঝখানে প্রদীপ হঠাৎ চমকাইয়া উঠিল : “নমিতা?”
অজয় বলিয়া চলিল : “আমাকে শেষ করতে দাও। বল্লম, নমিতা, আমার সঙ্গে এস। লাখো লাখো মেয়ে মরছে, সমাজে সংসারে অসংখ্য তাদের অত্যাচার। কেউ মরছে আচারের দাসত্ব করে’, কেউ সন্তানধারণ করে’-কেউ কেরোসিন জ্বালিয়ে, কেউ গলায় দড়ি দিয়ে। তুমি বীর-ভগ্নীর মত মরবে, এস।”
প্রদীপ আবার বাধা দিল : “নমিতা কি বলে?”
ম্লান বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া অজয় কহিল,-“নুমিতার উত্তর শুনে তুমি হেসো না, প্রদীপ। ভাবলে আমি বুঝি ওকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে চাই তুচ্ছ দেহ-বিলাসের জন্যে। বললে : আপনি যে এত খারাপ তা আমি ভাবিনি। কথাটা মনের মধ্যে দাগ কেটে বসে আছে। পরে ভাবলুম, বাঙালি মেয়ের কাছ থেকে এর বেশি আর কী উত্তর আমরা প্রত্যাশা করতে পারি?”
প্রদীপ কহিল,—“ও! নমিতা তা হলে তোমার ভগ্নীপতির ভাই-ঝি হয়! কাছেই আছে তাহলে। আমি এতদিন ওর একটা ঠিকানা পৰ্যন্ত পাই নি। তোমার সঙ্গে দেখাও ত’ আজ প্রায় তিন বছর বাদে। প্রথম দেখা কবে হয়েছিল মনে আছে?”
—“আছে না? সেই চিতোরগড়ে, রাণা কুম্ভের জয়স্তম্ভের ওপরে! কিন্তু নমিতাকে তুমি চিন্লে কি করে?”
—“সেই জয়স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকের অগণন পাহাড়ের দিকে চেয়ে তুমি কি বলেছিলে মনে আছে, অজয়? বলেছিলে তুমি অতীতে ছিলে জয়মল্ল, দুর্গ রক্ষা করতে গিয়ে: আকবরের হাতে প্রাণ দিয়েছ, পরে নতুন দেহ নিয়ে নতুন যুগে বাঙলা দেশে অজয় হয়ে জন্মিয়েছ। কথাটা ভাবুকতার চুড়ান্ত, কিন্তু সেই দিনই তোমার সঙ্গে বন্ধুতা না করে পারলুম না। তার পর দুই জনে ঝড় আর বিদ্যুতের মত সহযাত্রী হয়ে সমস্ত উত্তর-ভারতটা মথিত করে’ এলুম। আজ এত দিন বাদে তুমি আমার ঠিকানা পেলে কি করে?”
অজয় হাসিয়া কহিল, “তার চেয়েও বড়ো জিজ্ঞাস্য, তুমি নমিতাকে চিনলে কি করে?”
প্রদীপ বলিল,—“নমিতার স্বামী সুধীন্দ্র আমার সাহিত্যিক বন্ধু ছিল। রাণীগঞ্জে ও যখন মরে, তখন আমিই ওর পাশে ছিলাম।”
—“তোমার ঠিকানা আমি পেলুম অত্যাশ্চর্য্যরূপে, প্রায় সতেরোটা মেস্ খুঁজে। অত্যাশ্চর্য বলছি, কারণ তুমি যে এখনো কলকাতায়ই। আছ, তা আমি ভেবে নিলুম কি করে? মনে হ’ল এর আগে রাস্তায় একদিন যেন তোমাকে আমি দেখেছিলুম চিনে-বাদাম খচ্ছি। দিন সাতেক আগে হয় ত’। এখনো তোমাকে চিনে-বাদাম খেতে হয় নাকি? ভাবলুম দিব্যি বিয়ে-থা কবে’ ব্যথার সমুদ্র পার হয়ে এসেছ বুঝি।”
অজয়ের মুখে ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া প্রদীপ কহিল,—“আমার ইতিহাসটা এমন নয় যে তাকে আঁকজমক করে বর্ণনা করতে হবে। নমিতার সন্ধান পেলুম, ঐটা আমার একটা সম্পত্তি, অজয়। নমিতাকে আর হারাচ্ছি না।”
এইবার অজয় একেবারে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল; কহিল, “মেয়েমানুষ সব সাধনার বিঘ্ন, প্রদীপ—সে কবিতায়ই হোল্ক বা ধর্মাচরণেই হোক। আমার বিশ্বাস আর নেই। একাকী থাকবার মধ্যে সুখের চেয়ে সুবিধা বেশি। সে-বাড়িতে এতক্ষণে চিঢি পড়েছে নমিতা সংসারের চোখে কুলটার কলঙ্ক নিয়ে বিরাজ করবে—তবু কুলপ্লাবিনী হয়ে বেরিয়ে পড়বে না!”
—“তুমি বল কি, অজয়?”
—“বলেছি না, ভাগ্য! নমিতার ভাগ্য। আমাকে খারাপ বলে’ বর্জন করে সে তার শুদ্ধাচার সতীত্বের খাপে তার বিদ্রোহাচরণের তলোয়ার ঢেকে রাখছিল, এমন সময় শাসনকর্তার দণ্ড নিয়ে দিদির আবির্ভাব হ’ল। নমিতা পড়ল ধরা! আর যায় কোথা! নমিতা রাত করে’ লুকিয়ে পরপুরুষের দুয়ারে পসারিণী হয়ে এসেছে! সমস্ত মুখে কালি মাখিয়ে নমিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তবু কালীর মত জেগে উঠতে পারল না। আমি ওকে প্রণাম করতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু এমন নমিতাকে শেষ পর্যন্ত আমি শ্রদ্ধাটুকু পর্যন্ত দিতে পারলুম না ভাই।”
এইবার প্রদীপ আর না-হাসিয়া থাকিতে পারিল না। অবোধ সন্তানকে মা যেমন সান্ত্বনা দেন, তেমনিভাবে কোলের উপর অজয়ের মাথাটাকে আস্তে আস্তে একটু একটু দোলা দিতে দিতে প্রদীপ কহিল,-“তুমি এত বেশি হঠকারী যে, ব্যগ্রতাকে সংযত করতে শেখনি। তোমার মত দ্রুত নিশ্বাস যে নিতে না পারে তাকে তুমি মৃত বলেই ত্যাগ কর—এটা তোমার বাড়াবাড়ি। প্রত্যেক পরিণতির পেছনে প্রচুর প্রতীক্ষা চাই। আমরা এই বলদৃপ্ত যৌবনের পূজায় কত অসংলগ্ন দিন-রাত্রির অঞ্জলি দিয়েছি, তার হিসেব রাখ? ঝড়ে আমি বিশ্বাস করি না, তার চেয়ে একটি স্থির-প্রশান্ত গভীর-নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নের আমি উপাসক। নমিতা সংসারেই বিরাজ করুক, সেখানে থেকেই যদি তার গ্রন্থি ও শিথিল করতে পারে তবেই ভালো। তার জন্যে ও লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোসেটা তার আশীর্বাদ।”
নিশ্বাস ফেলিয়া অজয় কহিল,—“আমিও তাকে সেই কথাই বলে এসেছি।”
