নমিতা আর কথা না কহিয়া বারান্দায় চলিয়া আসিল। এত বড় পৃথিবীতে কোথাও একটুও বদল হয় নাই, রাস্তার ধূলার উপরে তেমনিই রোদের গুড়া পড়িয়াছে। সকাল হইতেই যে কুঠে বুড়োটা বহুলোচ্চারিত ঈশ্বরের নামটাকে একটা বিকৃত-ধ্বনিতে পর্যবসিত করিয়া ফেলিয়াছে, সে লাঠি ভর করিয়া গলির মোড়ে আসিয়া বসিল। কিন্তু কালকের রাত পোহাইতেই নমিতা যেন এক নব-প্রভাতের তীরে আসিয়া উত্তীর্ণ হইয়াছে। হয় ত’ এখন অজয় আরেকবার ডাকিলে সে বাহির হইয়া পড়িতে পারিত। কোথায় যাইত তাহা সে জানে না, কিন্তু এমন করিয়া মরিতে হয় ত’ নয়।
রেলিঙে ঝুঁকিয়া খানিকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিতেই তাহার নজর পড়িল একটা ছ্যাড়া গাড়ি এক-রাজ্যের মাল-বোঝাই হইয়া গলি পার হইতেছে। গাড়ির ভিতরে নজর পড়িতেই বাহির হইয়া পড়া দূরের কথা, নমিতার নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হইয়া আসিল। পেছনের সিটুটাতে হেলান দিয়া অজয় অতি কষ্টে সামনের জায়গাটায় পা দুইটা ছড়াইয়া শুইবার মতন করিয়া বসিয়া আছে—মাথায় তাহার ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। দেখিয়া নমিতা সম্বিৎ হারাইল কিনা কে জানে, সে সহসা হাতছানি দিয়া গাড়োয়ানকে থামিবার জন্য সঙ্কেত করিল। গাড়োয়ান তাহা লক্ষ্য করিল না, ভিতরে যে-ব্যক্তি যন্ত্রণায় মুহমান হইয়া পড়িয়াছিল, এই ইঙ্গিতটি তাহারও অগোচর রহিয়া গেল।
গাড়ি অবশ্য অজয় থামাইত না। গাড়ি মোড় পার হইয়া গেলে সে একবার পেছনে বাড়িটা দেখিবার জন্য মুখ বাড়াইল—যাহাকে দেখা গেল না, তাহাকে উদ্দেশ করিয়া মনে মনে বলিতে লাগিল : আমার সঙ্গে না এসে ভালোই করেছ, নমিতা। একদিন যাতে নিজেরই পায়ের জোরে পথের ওপর নেমে আসতে পার, তোমার ওপর ততটা লাঞ্ছনা হোক। আমি সুখী হ’ব।
১৩. নানা জায়গা ঘুরিয়া
নানা জায়গা ঘুরিয়া সন্ধ্যাটা কাটাইয়া প্রদীপ তাহার মেসের ঘরে ঢুকিয়া দেখিল কে একটা লোক তাহার বিছানার উপর উবু হইয়া পড়িয়া আছে। তিন সিটের ঘর—বাকি দুই জনের এত শীঘ্ন বাড়ি ফিরিয়া আসিবার কথা নয়। রমেন বাবু শহরের কি-একটা বায়স্কোপঘরের দরজায় দাঁড়াইয়া টিকিট কুড়া, আর প্রতিনিধান রাত্রি করিয়া
কো-একট। কোচিং-ক্লাশে মোক্তারি পড়িতে যায়। তাহারা এই অসময়ে মেসে ফিরিয়া আসিলে ও কখনই প্রদীপের বিছানায় গড়াইতে সাহস করিত না। এ উহাদের চেয়ে শয্যা-বিলাস সম্বন্ধে উদাসীন বা অপরিচ্ছন্ন বলিয়া নয়, উহাদের সংশ্রব হইতে সে নিজেকে দূরে সরাইয়া রাখিত বলিয়া। তা ছাড়া ঘরের তালাই বা কে খুলিল, খুলিল ত’ কষ্ট করিয়া আলোটাই বা জ্বালাইল না কেন!
লণ্ঠন জ্বালাইবার সময় ছিল না; সাহস করিয়া আগন্তুকের গায়ে ঠেলা দিয়া কহিল,—“কে?”
লোকটি অনেকক্ষণ পরে সাড়া দিল। মুখ না ফিরাইয়া আন্দাজে উত্তর দিল : “প্রদীপ এলে?”
স্বর পরিচিত। এইবার পকেট হাতড়াইয়া দেশাই বাহির করিয়া তাড়াতাড়ি আলো জ্বালাইল। দেখিল, অজয়। জীর্ণ ময়লা কাপড় জামার মধ্যে নিজের শরীরটাকে শামুকের মত সঙ্কুচিত করিয়া পড়িয়া আছে। অজয়ের গলা শুনিয়া প্রদীপ যেমন সুখী হইয়াছিল, ভয়ও হইয়াছিল ততখানি। ভয় হইয়াছিল, অজয় বুঝি তাহার স্বাভাবিক। যৌবন-প্রমত্ততায় আবার কোথাও হঠকারিতা করিয়া বিপদে পড়িয়াছে; আর সুখী হইয়াছিল এই ভাবিয়া যে, তাহার আশ্রয়ে সে যখন একবার আসিয়া পড়িয়াছে, তখন তাহার কেশাগ্র স্পর্শ করিতে পারে এমন লোককে পৃথিবীতে প্রদীপ নিশ্বাস নিতে দিবে না। কিন্তু আলো জ্বালাইয়া অজয়ের এই শ্রীহীন কাতর চেহারা দেখিয়া প্রদীপ বিমর্ষ হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি অজয়ের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া প্রদীপ জিজ্ঞাসা করিল,—“কি হ’ল অজয়? কোত্থেকে?”
একটা দুর্বল হাত দিয়া প্রদীপের বাহুটা চাপিয়া ধরিয়া অজয় কহিল,—“জান-ই ত’ লোকের সন্দেহ এড়াবার জন্যে একটা ভদ্রআস্তানা ঠিক রেখেছিলুম, আপাতত সেই আস্তানা থেকেই আসছি। ভীষণ জ্বর এসেছে।”
প্রদীপ ব্যাকুল হইয়া কহিল,—“জ্বর নিয়ে বাড়ি ছাড়লে কেন? কেউ তাড়া করেছিল না কি?”
ম্লান একটু হাসিয়া অজয় কহিল,—“এবার যে তাড়া করেছিল সে আমাদের সকল শত্রুর চেয়ে দুর্দম। তার কাছেই আমরা বার বার হেরেছি, বার বার হারব,—সে আমাদের ভাগ্য।”
অজয়ের চুলের মধ্যে হাত বুলাইতে বুলাইতে স্নিগ্ধস্বরে প্রদীপ কহিল,-“তোমার এই বড় দোষ অজয়, তুমি বড় ভাবুক। তুমি সোজা বুদ্ধিকে কল্পনা দিয়ে ঘুলিয়ে তোল। কি হয়েছে স্পষ্ট করে বলবে?”
প্রদীপের ঠাণ্ডা হাতখানি অজয় তাহার উত্তপ্ত গালের উপর চাপিয়া ধরিল; কহিল,—“ভাবুকতা না থাকলে কোনো পরাজয়, কোনো ব্যর্থতাকেই মহনীয় করে দেখা যায় না। সে-তর্ক তোমার সঙ্গে পরে করলেও চলবে। সোজা স্পষ্ট করেই বলছি। কিন্তু সব কথা স্পষ্ট করে’ বললে তার মানেটা সব সময়েই পরিস্ফুট হয় না, প্রদীপ। যেমন ধর, আমি যদি বলি, একটি মেয়ে আমার অনুগামিনী হ’ল না বলেই আমি অভিমানে বেরিয়ে পড়লাম—কথাটার আদ্যোপান্ত তুমি বুঝতে পারবে?”
প্রদীপ হাসিয়া কহিল,—“কথাটাকে যদিও এর চেয়ে স্পষ্ট করে’ বলা যেত, তবু এটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট অর্থবান হয়ে উঠেছে। মেয়ে! আর আমাকে বলতে হবে না। রোগ শুধু তোমার গাত্রোত্তাপ নয়, অজয়।”
অজয় উচ্ছসিত হইয়া উঠিল : “হ্যাঁ জানি। এ আমার আত্মার উত্তাপ, প্রদীপ। কিন্তু মেয়েটি তাকে দেহের উত্তাপ বলেই ধরে’ নিল। তোমাকে স্পষ্ট করেই বলি তা হলে। দেখ কিছু করা যায় কি না।” বলিয়া অজয় তাহার মাথাটা প্রদীপের কোলের উপর তুলিয়া দিল। যেন আপন অন্তরের সঙ্গে কথা কহিতেছে, তেমনি মৃদু-গভীর
