অজয়ের শরীরের এই অবস্থা দেখিয়া কমলমণির গলায় মন্দা পড়িল না: “এই আমাদের অজয় বাবুর অসুখ! রাত্রিবেলা ক’দিন থেকে এই অসুখ চলছে শুনি?”
এমন সময় উপর হইতে নমিতার মা একটা লণ্ঠন হাতে করিয়া নামিয়া আসিলেন। তাহাকে দেখিয়াই নমিতা তাহাকে দুই বাহু দ্বারা বেষ্টন করিয়া একেবারে অবোধ আত্মহারার মত কাঁদিয়া উঠিল। মেয়েকে তাড়াতাড়ি আড়াল করিয়া দাঁড়াইয়া তিনি কহিলেন,—“কি, কি হ’ল?”
হাত ও মুখের একটা কুৎসিত ভঙ্গি করিয়া কমলমণি কহিলেন, “কি আবার হবে। রাত্রে তোমার মেয়ে অভিসারে বেরিয়েছিলেন! আর ভয় নেই দিদি, মেয়ে তোমার খুব ভালো রোজকারের পথ পেয়েছে।”
নমিতা ফুপাইয়া উঠিল, কিন্তু এই অন্যায় ও কদৰ্য্য কথা শুনিয়া। অজয় আর স্থির থাকিতে পারিল না। আর্তস্বরে কহিল,—“মুখে যা আসে তাই বোলো না, দিদি। নমিতা কেন নীচে এসেছিল জানি না, কিন্তু আমার বমি করবার আওয়াজ শুনেই ঘরে ঢুকেছিল! রোগীর প্রতি ওর এই করুণার এমন কদৰ্য অর্থ কর ত’ ভালো হবে না।”
“কি ভালো হবে না শুনি?” কমলমণি খেকাইয়া উঠিলেন : “আর রাতের পর রাত এই ঢলাঢলিই খুব ভালো, না? পরের বাড়ি বসে এই সব কেলেঙ্কারি চলবে না, অজয়। আমি বাবাকে লিখে দিচ্ছি, তোমার মতন বাদরকে আমি পুষতে পারবো না।” ক্রন্দনরতা মেয়েটার গালে সবেগে এক চিমটি মারিয়া ফের জা-কে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন,—“আর তোমাকেও বলছি দিদি, এই ধুমসো মেয়ে নিয়ে আর কোথাও গিয়ে পথ দেখ। এইখেনে থেকে আর আত্মীয়-স্বজনের মুখ হাসিয়ো না।”
“নমিতা!” অজয়ের ডাক শুনিয়া নমিতা মায়ের বুকের মধ্যে থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। “তুমি তবু এই মিথ্যাচার এই পাপের মধ্যে বেঁচে থাকবে? সব ছেড়ে-ছুঁড়ে এস আমার সঙ্গে।” বলিয়া
হঠাৎ দুর্নিবার আবেগে অজয় হয় ত’ এক-পা আগাইয়া আসিতে চাহিল। সামনেই সিড়ি। টাল সামলাইতে না পারিয়া একেবারে হুড়ি খাইয়া পড়িয়া গেল। লণ্ঠনের অস্পষ্ট আলোতে বেশ বুঝা গেল, কপালের সামনেটা ফাটিয়া গিয়া গল্গল করিয়া রক্ত বাহির হইতেছে। সবাই এক সঙ্গে চীৎকার করিয়া উঠিল। কমলমণি গিরিশ বাবুকে খবর দিতে উপরে ছুটিলেন। গিরিশ বাবু যখন নামিয়া আসিলেন, তখনো অজয়ের জ্ঞান হয় নাই। নমিতার মা’র কোলে মাথা রাখিয়া। সে শুইয়া আছে—আর নমিতা দূরে একেবারে পাথরের মূর্তির মত নিস্পন্দ হইয়া রহিয়াছে।
গিরিশ বাবু আসিয়াই হাঁক দিলেন : “এ-সব কি কাণ্ড বৌদি! তুমিও এসে এই অনাছিষ্টি ব্যাপারে হাত দেবে ভাবিনি। রাখ, রাখ, রক্ত বন্ধ হয়েছে ত’? শুইয়ে দাও বিছানায়।” বলিয়া চাকরকে উঠাইয়া ধরাধরি করিয়া অজয়কে তাহার বিছানায় আনিয়া ফেলিলেন। নমিতা তখনো মূঢ়ের মত দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া ছিল। গিরিশ বাবু তাহাকে দেখিতে পাইয়াই ধমক দিয়া উঠিলেন: “তুই আর এখানে মরতে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা এখান থেকে।”
গিরিশ বাবু পেছন হইতে দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। নমিতার কানে তখনো যেন অজয়ের করুণ গোঙানি লাগিয়া আছে, তবু তাহাকে উপরেই যাইতে হইল। আর বারান্দায় নয়, একেবারে মেঝের উপর লুটাইয়া পড়িল। মা উপরে আসিলে নমিতা একবার চোখ চাহিয়াছিল হয় ত’; মা ঘৃণার সঙ্গে বলিলেন,—“আমাকে আর তুই চুসনে পোড়ামুখি! তোর কপালে কেরোসিন তেল জুটল না? এর আগে ছাত থেকে লাফিয়ে পড়তেও ত’ পারতিস হতভাগী।” বলিয়াই মা পাগলের মত তাহার কপালটা বারে বারে ঘরের দেয়ালে ঠুকিতে লাগিলেন।
পরদিন ভোর হইতেই গিরিশ বাবু দরজার গোড়ায় আসিয়া হাকিলেন: “বৌদি!”
নমিতা সমস্ত রাত্রি আর ঘুমাইতে পারে নাই। কাকার ডাক শুনিয়া মাকে জাগাইয়া দরজা খুলিয়া দিল। নমিতার কুষ্ঠিত মুখে কাছে আসিয়া দাঁড়াইতেই গিরিশ বাবু কহিলেন,—“তোমার মেয়েকে আমার বাড়িতে আর রাখা চল্বে না, বৌঠান। ওর শ্বশুর ত’ এখেনেই আছে, একটা চিঠি লিখে দি, নিয়ে যাক্। অজয়টাকেও আজ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলুম।”
নমিতার মা না বলিয়া পারিলেন না: “এত জ্বরের মধ্যে!”
গিরিশ বাবু একটা ট্রাঙ্কের উপর জায়গা করিয়া বসিলেন, বলিলেন, —“আজ যদি না যায়, সেবা করতে তোমার মেয়েকে ত’ আর সেখানে পাঠানো চলবে না।” বলিয়া নমিতার দিকে একটা ব-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন।
নমিতা অনেক সহ করিয়াছে, কিন্তু এইবার তাহার দেহের সমস্ত শিরা-উপশিরা এক সঙ্গে মোচড় দিয়া উঠিল। সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া কহিল,—“একজন পরিত্যক্ত রুগীর পরিচর্যা করার মধ্যে আপনারা যতই কেন না পাপ খুঁজে বেড়ান কাকাবাবু, যিনি মানুষের অন্তর পৰ্যন্ত তন্নতন্ন করে দেখছেন, তিনি কিন্তু ক্ষুন্ন হন্ নি।” বলিতে বলিতেই তাহার দুই চক্ষু বাহিয়া জল নামিয়া আসিল।
গিরিশ বাবুকে কোন কথা কহিতে না দিয়াই নমিতার মা কহিলেন,—“চুপ কর বছি। তাই ভাল, ঠাকুরপো, বেয়াইকে খবর দাও। ওখেনেই গিয়ে থাকুক্ কয়েকদিন।”
নমিতা আবার শক্ত হইল। কহিল,—“কেন আমি ওখানে গিয়ে থাববা? আমি কি করেছি? ওটা কি আমার নির্বাসন নাকি?”
গিরিশ বাবু দাঁত খি’চাইলেন : “তবে ঐ গুণ্ডাটার গলা ধরে’ বেরিয়ে পড়লেই ত’ পারতিস।”
মাও কাকার কথার সুরে সায় দিলেন : “শ্বশুর বাড়ি না যাবি ত’ যমের বাড়ি যাস।”
নমিতা গোঁ ধরিয়া বসিল : “এমন একটা কাণ্ড’ আমি অবশ্য করিনি যাতে রাতারাতি তোমাদের ঘর-সংসার একেবারে উলটে ছত্রখান হয়ে গেল। আমি শুধু শুধু সেখানে যাবো কেন?”
পাশের ঘর হইতে কমলমণি ছুটিয়া আসিলেন,—“বসে বসে কে তোমাকে এখানে গেলাবে শুনি? মদ্দরও ত’ বেহদ্দ হয়েছ—এবার রোজকার করে’ পয়সা আন, নিজেরটা নিজে জোগাড় কর এবার থেকে। বাবাঃ, কী গলগ্রহই যে জুটেছে।”
