নমিতা আরো জোরে ক্যালেণ্ডারটা চালাইতে লাগিল, অজয়েব গায়ের চাদরটা আরো ঘন করিয়া টানিয়া দিল; বলিল,—“আপনি এমনি বক বক করুলে আমি চলে যাব ঘর ছেড়ে।”
অজয় কহিল,—“সত্যিই গায়ে চাদর টেনে পাখার হাওয়া খেয়ে জ্বরের ঘোরে এপাশ ওপাশ করবার বিলাসিতা আমার নয়, নমিতা। আমি মরবার পণ করে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি। রোগে ছাতা ধরে’ দেহ জার্ণ হোক, তবু রোগের হাতে জীবন সমর্পণ করে মৃত্যুকে কলঙ্কিত করব না। তুমি যে-জীবন বহন করছ তা ত’ একটা কলঙ্কিত মৃত্যু, অসতীত্বের চেয়েও লজ্জাকর। সত্যি করে মরে গৌরবান্বিত হতে তোমার ইচ্ছা করে না, নমিতা?” কি ভাবিয়া লইবার জন্য অজয় একটু থামিল, পরে হঠাৎ বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়া গা হইতে চাদর সরাইয়া ফেলিল। নমিতার স্তম্ভিত ভাবটা কাটিবার আগেই তক্তপোষের প্রান্তে সরিয়া আসিয়া জুতার জন্য সেই নোংরা মেঝের উপর পা বাড়াইয়া দিল; কহিল,—“তুমি এমনি চুপ করে এখানে বসে থাক। তুমি আমার সঙ্গে যাবে—এই আনন্দে আমি রাস্তায় বেরিয়ে যে করে থোক একটা গাড়ি ধরে আনতে পারবই
অজয়ের আর জুতা পরিবার সময় হইল না। নমিতা ভয় পাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, তাহার পা দুইটা সহসা অবশ হইয়া আসিল বুঝি। দীপ্তকণ্ঠে কহিল,—“আপনি পাগল হয়ে গেলেন নাকি? কোথায় যাব আপনার সঙ্গে?”
অজয় আবার সেই নির্লিপ্ত উদাসীন কণ্ঠে কহিল,—“পাগল আমরা সত্যিই। হঠকারিতাকে আর যারা নিশে করুক, আমরা করিনে। ভেবে-চিন্তে কাজ করতে গেলে সময়ই ফুরোয়, কাজ আর এগোয় না। তুমি কি সত্যিই এই অন্ধকূপের অন্তরালে স্বল্প-পরিমিত জীবন নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারবে? নিশান্তে দুটি ভাত খেয়ে ও দিনান্তে দুঘণ্টা ঘুমিয়েই কি তুমি জীবনকে এমন অনায়াসে ক্ষয় করে ফেলবে? তোমার জীবনের ওপর তোমার একার দায়িত্ব নেই, আমাদেরো ‘লোভ আছে। তুমি একা, সংসারে কারো কাছে তোমার এতটুকু ধার নেই—তোমার কত সুবিধে। তুমি একবার হ্যাঁ বল, দেখবে আমার সমস্ত জ্বর নেমে গেছে। নোংরা মেঝে সাফ অন্যে করলে ক্ষতি হবে না, অনেক বড়ো ও অনেক দুঃখময় কলঙ্ক তোমার নির্মল হাতের স্পর্শে শুচিস্নিগ্ধ হ’বার জন্যে অপেক্ষা করছে। নমিতা,—তুমি এস আমার সঙ্গে বলিয়া অসহায় শিশুর মত অজয় নমিতার দুই হাত ব্যাকুলভাবে চাপিয়া ধরিল।
নমিতা কি ভাবিল কে জানে, সহসা হাত ছাড়াইয়া লইয়া কর্কশস্বরে কহিল,—“আপনি আমাকে কী ভাবেন? আপনার অসুখ দেখে আমি ভালো ভেবে আপনার সেবা কবুতে এলুম, আর আপনি তার এই প্রতিদান দিচ্ছেন? ছি! আপনি যে এত খারাপ তা আমি ভাবিনি।” বলিয়া নমিতা আঁচলে চোখ ঢাকিয়া ফেলিল।
এই কাণ্ড দেখিয়া অজয় প্রথমে একেবারে নিস্পন্দ অসাড় হইয়া গেল, তাহার শরীরে কণামাত্রও আর শক্তি রহিল না। সে যেন একটা পৰ্বতচূড়া আরোহণ করিতে গিয়া একেবারে সমুদ্রের তলায় আসিয়া ডুবিয়াছে। তাড়াতাড়ি বিছানার উপর শুইয়া পড়িয়া যেন ঘূর্ণমান পৃথিবীর প্রান্ত হইতে ছিটুকাইয়া পড়িবার ভয় হইতে সে আত্মরক্ষা করিল। দুই হাত দিয়া মাথার লম্বা চুলগুলি আঁড়াইয়া ধরিয়া সে কান্না রোধ করিল হয় ত’—সে কি না ক্ষীণজীবিনী কোমলকায় বাঙালি মেয়ের মাঝে আকাশের বিদ্যুদ্বতী বাত্যার মূর্তি দেখিতে চাহিয়াছিল। চাপা স্বরে গোঙাইয়া কহিল,—“আমর সত্যিই ভুল হয়েছে, নমিতা, আমাকে ক্ষমা কর। আমি জ্বরের ঘোরে প্রলাপই বকছিলুম হয় ত’। এখন তুমি স্বচ্ছন্দে বাতি জ্বলতে পার, হাত বাড়ালেই তাকের ওপর দেশলাই পাবে। অন্ধকারে আর তোমাকে দেখবার প্রয়োজন নেই।”
বাতি না জ্বালাইয়াই নমিতাকে চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতে দেখিয়া অজয় কহিয়া উঠিল: “একটা কথা স্পষ্ট করে জেনে যাও। তোমার দেহের উপর আমার লোভ ছিল, এ-কথা ঘুণাক্ষরে মনে কোরো না—লোভ ছিল তোমার এই জীবনের ওপর। আমরা যে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছি তাতে তোমার জীবনকে আহুতিরূপে কামনা করেছিলুম মাত্র। তেমন মরা মরতে পারলে মানুষ হতে পারতে, নমিতা।”
এতটা পা বাড়াইয়া আবার ফিরিয়া যাওয়াটা শোভন হইত না, তা ছাড়া দুইটা দরজার ফাঁক দিয়া ঘরের বাহিরে অন্ধকারে কাহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া নমিতার আর নিশ্বাস পড়িল না। ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিল, কাকিমা কোলে খুকি। নমিতা ভাবিয়াছিল আজ হয় ত’ খুকি স্বভাবের ব্যতিক্রম করিয়া তাহাকে মুক্তি দিয়াছে। কিন্তু কাকিমার নীচে আসিবার আগে রঙ্গমঞ্চের নেপথ্যে কত যে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়া গেছে, তাহার ইঙ্গিত স্পষ্ট হইয়া উঠিল। তাহার এই আচরণে যেন কিছুই অস্বাভাবিকতা নাই; কণ্ঠস্বর তেমনি সহজ করিয়া নমিতা কহিল,—“অজয় বাবুর জ্বর খুব বেড়ে গেছে, কাকিমা। ডাক্তার ডেকে পাঠানো উচিত।”
এই সব কথার চালাকি করিয়া কাকিমাকে ঠকানো যাইবে না। তিনি ভেঙচাইয়া বলিয়া উঠিলেন,—“অজয় বাবু বুঝি তোমাকে বিনাতারে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল যে লোকলজ্জার মাথা খেয়ে দরজা বন্ধ করে তুমি তার জ্বর নামাচ্ছ?” হঠাৎ তারস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিলেন: “ও দিদি! দেখে যাও তোমার মেয়ের কীর্তি! সামনেই অঘ্রান মাস, নতুন করে মেয়ে-জামাই ঘরে তোলো!”
দরজার বাহিরেই এমন একটা বীভৎস রসের অভিনয় শুনিয়া অজয় বিছানায় আর স্থির থাকিতে পারিল না। টলিতে টলিতে বাহির হইয়া আসিল। কোন রকমে দেওয়ালে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া • কহিল, “রাত-দুপুরে হঠাৎ চেঁচামেচি শুরু করলে কেন? কী এমন কাণ্ড ঘটেছে?”
