এক ঠেলা মারিয়া নমিতা বন্ধ দরজা খুলিয়া ফেলিল। যাহা দেখিল, তাহাতে প্রথমে সে কি করিবে বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। সে যে কেন অকারণে দেরি করিতেছিল তাহার জন্য সে শতরসনায় নিজেকে ধিকার দিতে লাগিল। দেখিল, সেই শতছিন্ন তোষকটার উপর উবু হইয়া ঝুঁ কিয়া পড়িয়া অজয় গোঙাইতেছে; কবে কি-সব ছাই-ভস্ম গলাধঃকরণ করিয়াছিল, তাহাই বমি করিয়া মেঝেটাকে ভাসাইয়া দিয়াছে। বমির বেগ এখনো প্রশমিত হয় নাই, অন্ধকারেও অজয়ের রোগবিকৃত বীভৎস মুখের ছায়া চোখে পড়িল। নমিতা তাড়াতাড়ি অজয়ের পাশে বসিয়া পড়িয়া তাহার মুখটা দুই হাতের অঞ্জলিতে ভরিয়া। একেবারে তাহার কোলের উপর তুলিয়া পাঞ্জাবির তলায় পিঠের উপর অল্প একটুখানি হাত রাখিয়া দেখিল, জ্বরে অজয় দগ্ধ হইতেছে। কপালের সমুখের যে-চুলগুলি লুটাইয়া পড়িতেছে, তাহা মাথার উপর ধীরে তুলিয়া দিয়া, নিজের আঁচল দিয়া অজয়ের শুনো ঠোঁট দুইটা মুছিয়া দিল। মুহূর্তে যে কি হইয়া গেল জ্বরের ঘোরে মোহাচ্ছন্ন অজয় আনুপূর্বিক কিছুই ধারণা করিতে পারিল না। অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় শুক্লবাসা একটি মেয়েকে তাহার পার্শ্বচারিণীরূপে ভালো করিয়া তখনো চিনিতে না পারলেও, আজ রাত্রেই যে তাহার আসিবার কথা ও এমন করিয়া যে তাহার এই পীড়িত দেহটাকে বুকে টানিয়া নিবার একটা অলৌকিক চুক্তি ছিল, তাহা সে নিমেষে ঠিক করিয়া ফেলল। জড়িতস্বরে সে কহিল,-“শিগগির আমাকে একটু জল এনে দাও, আমার গলা-জিত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল যে।”
নমিতা অজয়ের মাথাটা ধীরে ধীরে নামাইয়া বাহির হইয়া আসিল। দেয়ালের প্রতিটি ইট ও মেঝের প্রতিটি ধূলিকণা যে তাহাকে নিরীক্ষণ করিতেছে সে বিষয়ে তাহার খেয়াল রহিল না। রান্নাঘরের দরজার শিকল নামাইয়া সে গ্লাসে করিয়া কলসী হইতে জল গড়াইয়া লইল ও বাঁ-হাতে এক বালতি জল লইয়া আবার ঘরে ঢুকিল। বালতিটা দুয়ারের কাছে নামাইয়া তাড়াতাড়ি জলের গ্লাসটা অজয়ের কাছে আনিয়া ধরিল। কহিল,—“আমার হাতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠন, জলটা খেয়ে নিন।”
এইবার নমিতাকে অজয় ভালো করিয়া চিনিয়াছে। পিপাসা তাহার সত্যই পাইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। তবু পরিপূর্ণ নির্ভর করিয়া নমিতার অকুষ্ঠিত বাম-বাহুটি অবলম্বন করিয়া সে উঠিল। ঢাকৃ-ঢক্ করিয়া সমস্তটা জল খাইয়া ফেলিয়া সে ধুপ করিয়া শুইয়া পড়িল। নিজেই নমিতার আঁচলের প্রান্তটা টানিয়া লইয়া মুখ মুছিল। বলিল,-“আজ সমস্ত স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল একসঙ্গে ষড়যন্ত্র করেও তোমাকে আমার কাছ থেকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। আমার প্রয়োজনের দাবি এত প্রচুর ছিল যে, কোনো প্রাচীরই আর তোমাকে বন্দী রাখতে পাল না, নমিতা। কিন্তু আমার প্রয়োজন যে কি অসামান্য, তা তুমি জান?” বলিয়া অজয় নমিতার একখানা হাত চাপিয়া ধরিল।
নমিতা হাত সরাইয়া নিবার স্বল্প চেষ্টা করিয়া বলিল,-“ছাড়ন, ঘরটা পরিষ্কার করে ফেলি। দেশলাই নেই? আলো জ্বালতে হবে।”
—“না না, আলো জ্বালিয়ে কাজ নেই, নমিতা। আলোতে তোমাকে সম্পূর্ণ করে দেখা হবে না। তোমাকে কি এই বেশ মানায়? আমি মনে মনে তোমার যে মূর্তি এঁকেছি, আলো জ্বেলে তাকে কলঙ্কিত কোরো না।” বার কয়েক ঘনঘন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া অজয় কহিল,—“তোেমার পরনে রক্ত-চেলি, চোখে ক্ষুধা, হাতে কৃপাণচুলগুলি পিঠের উপর আলুলিত হয়ে পড়েছে রুক্ষ সুনিবিড় চুল! বজে তোমার কঙ্কণ, বিদ্যুৎ তোমার কণ্ঠহার! তুমি আমার সঙ্গে যাবে, নমিতা?”
নমিতা ব্যস্ত হইয়া বলিল,-“উত্তেজিত হবেন না। চুপ করে’ ঘুমুবার চেষ্টা করুন, আমি আপনার মাথায় জলপটি দিচ্ছি।”
তাড়াতাড়ি পাশে বসিয়া বালতির জলে ন্যাড়ার অভাবে নিজের আঁচলটাই ভিজাইয়া লইল। কপালের উপর তাহাই স্তুপীকৃত করিয়া রাখিয়া, পাখার অভাবে সামনের দেওয়াল হইতে একটা ক্যালেণ্ডার পাড়িয়া লইয়া ধীরে ধীরে হাওয়া করিতে লাগিল। কহিল, “দেশলাই থাকূলে আলোটা জ্বালাতুম।”
অজয় কহিল,—“আলো জ্বালালেই তোমার আজকের রাতের এই কীর্তিটা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না। তোমার কাকিমার কাছ থেকে দেশলাই চেয়ে আনতে পারবে?” বলিয়া অজয় সেই জ্বরের মধ্যেই ভূতের মত হাসিয়া উঠিল। নমিতার পা-দুইটি তক্তপোষের উপর যেখানে গুটাইয়া রহিয়াছে, তাহার অদুর ব্যবধানে নিজের একটা শিথিল হাত রাখিয়া আস্তে একটা আঙুল বাড়াইয়া দিয়া নমিতার পা এমন আলগোছে একটু ছুইল যে, তাহা টের পাইবার সাধ্য নাই। কহিল, “উত্তেজিত আমি হইনি, নমিতা। যেটুকু চাঞ্চল্য আজ তুমি আমার দেখছ, সেটা আমার জ্বরের বিকার নয়। ওটা আমার স্নায়ুমণ্ডলীর স্বাভাবিক বৃত্তি মাত্র। আমার কথার উত্তর দেবে, নমিতা?”
নমিতাও কপালের গণ্ডী ছাড়াইয়া হাতখানি অজয়ের গালের উপর ভুলক্রমে আনিয়া ফেলিয়াছে। অস্ফুটস্বরে কহিল,—“কি?”
দৃঢ় স্পষ্ট অনুত্তেজিতকণ্ঠে অজিত কহিল,—“তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”
নমিতার স্বর ভীত, বিমূঢ় : “কোথায়?”
আবার সেই শীতল স্পষ্ট স্বর : “মরুতে। ময়ূতে তোমার ভয় হয়, নমিতা?”
নমিতা চঞ্চল হইয়া উঠিল : “কি বলছেন আপনি যা-তা? বলছি ঘুমুন, তা না খালি বক্ বক্ করছেন!”
অজয় শান্ত, উদাস-স্বরে বলিল,-“তুমিও যে মরতে ভয় পাও না, তা আমার ঘরে তোমার এই আকস্মিক আবির্ভাবেই আমি বুঝেছি। তা হলে চল আজকের এই রাত্রি শেষ না হতেই একটা গাড়ি ডেকে আমরা বেরিয়ে পড়ি। আমি তোমার খুব বেশি ভার হ’ব না, দেখবে। কাল ভোরেই আবার আমি চাঙ্গা হয়ে উঠব। শুয়ে শুয়ে এই সব বাবুগিরি কি আমাদের পোষায়?”
