শচীপ্রসাদ হাসিয়া বলিল,-“চল রায়স্কোপে যাই, পর্দায় আবার তোমার সেই লরা লা প্লতে দেখা দিয়েছেন।”
বই হইতে উমা মুখ তুলিল না; কহিল,—“ফিল্ম দেখে পয়সা খরচ করাকে আর ক্ষমা করতে পারূব না। বরং বিকেলে বেরিয়ে আমার জন্যে যদি একটা কাজ করতে পারেন, ত’ ভালো হয়।”
শচীপ্রসাদ ঘাবড়াইয়া গিয়া কহিল,—“কি?”
দুইটি স্থির জিজ্ঞাসু চোখ মেলিয়া উমা বলিল,—“শ্রীগোপাল মল্লিকের লেইটা কোথায় জানেন?”
—“না; কেন?”
—“তবে দয়া করে একটু খোঁজ নিয়ে আসবেন, ওখানে যেতে হলে বাস থেকে কোথায় নামূলে সুবিধে।”
শ্রীগোপাল মল্লিকের লেইনে নিশ্চয়ই উমার কোনো সহপাঠিনী আছে বিশ্বাস করিয়া শচীপ্রসাদ একটু প্রফুল্লই হইয়া উঠিল হয় ত’। উমার পরিচয়ের সূত্রে আরেকটি মেয়ের কাছে আসিতে পারিলে যে ভালোই হয়, সে-দুৰ্বলতা শচীপ্রসাদের বয়সের ছেলের পক্ষে অমার্জনীয় নয়। এবং সেই অনামা মেয়েটির সান্নিধ্যে যে শচীপ্রসাদ স্বাভাবিক সঙ্কোচে তাহার সমস্ত আচরণটিকে সুমধুর করিয়া তুলিত, তাহাতে আর সন্দেহ কি! তাই সেই গলিটার অবস্থান ও আয়তন-সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সে আমৃতা-আমৃত করিয়া কহিল,—“কারো সঙ্গে দেখা করূতে যাবে? বেশ ত, চল না, দু’জন বেরিয়ে পড়ি। কাছা কাছি কোথাও হবে হয় ত’। কলকাতার রাস্তা খুঁজে বেড়াতে আমার ভালোই লাগে। বেশ একটু বেড়ানোও হবে খন।”
বইয়ের পৃষ্ঠায় ফের চোখ নামাইয়া উমা বলিল,-“না, সেখানে আমাকে একলাই যেতে হবে। আপনি দয়া করে একটু জেনে এলেই চলবে।”
শচীপ্রসাদ ভাবিত হইল। এইবার তাহার স্বরে আর বিনয়স্নিগ্ধ কুণ্ঠা রহিল না। আরেকটু সরিয়া আসিয়। সে জিজ্ঞাসা করিল, “সেখানে কে আছে শুনতে পাই?”
উমা টলিল না, কহিল,—“সব কথাই কি সব্বাইকে বলতে হয়?”
—“অন্তত আমাকে তোমার বলা দরকার।”
—“এমন অনেক কথা আছে, যা নিজেকে পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলা যায় না।”
রুক্ষস্বরে শচীপ্রসাদ বলিয়া উঠিল,—“আমাকে না বলে আমার সাহায্য করাটা অসঙ্গত হবে।”
উমা একটু হাসিল; বলিল,—“আপনি সাহায্য করলেও এগোপাল মল্লিকের লেইনটা বাড়ির দরজায় চলে আসত না, হেঁটেই যেতে হত। হাঁটুতে আমি একলাই পারি।”
এই বলিয়া বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি উল্টাইতে যাইতেই তাহার নজর পড়িল যে, বইটা একটা রেলওয়ে-সম্পর্কিত আইনের ইস্তাহার। এতক্ষণ তাহার মনকে শ্ৰীগোপাল মল্লিকের লেইনের সন্ধানে পাঠাইয়া, সে এত মনোযোগ সহকারে ইহাই পড়িতেছিল নাকি!
তাড়াতাড়ি বইটা রাখিয়া দিয়া, উমা উঠিয়া দাঁড়াইল। শচী প্রসাদের কিছু বলিবার আগেই সে হাসিয়া কহিল,—“আপনার বায়স্কোপের পয়সা বাঁচিয়ে দিলাম। ও পয়সাটা চোখ মেলে কোনো পুয়োর-কাণ্ডে দিয়ে দেবেন।”
শচীপ্রসাদের কণ্ঠে বিষ আছে : “ভিক্ষা দেওয়াকে আমি পাপ মনে করি। তুমি না গেলেই যে বায়স্কোপ পটল তুলবে এমন কথা না ভাবলেই তোমার বুদ্ধি আছে স্বীকার কবুব। আমার পাশে একটা মাড়োয়াড়ি বসলেও ফিল্ম, আমি কম enjoy করব না।”
১২. সেই রাত্রি নমিতার
সেই রাত্রি নমিতার আর কাটিতে চাহে না। একে একে বাড়ির সমস্ত বাতি নিভিয়া গেল, কিন্তু তাহার চোখে কিছুতেই ঘুম আসিল না। ঘুম না আসিলে সে দোতলার বারান্দার রেলিঙের কাছে চুপ করিয়া থাকে; কিন্তু আজ যে স্পন্দমান চঞ্চল হৃদয়কে ঘুম পাড়াইয়া সে উদাসীন হইয়া সীমান্যতার ধ্যান করিবে, তাহা অসম্ভব। প্রথমেই মনে পড়িল রাস্তার দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে চক্ষু দিয়া কিছুতেই সে আজ অজয়ের নাগাল পাইবে না। এই উপলব্ধি করিতেই নমিতা বারান্দায় দ্রুতপদে পাইচারি শুরু করিয়া দিল। সকলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। পাশের বাড়িতে যে-ছাত্রটি রাত জাগিয়া নীরবে পড়া করে, তাহারা টেবিলের মোমবাতিটা নিভিল। সেই ঘনায়মান চতুঃপার্শ্বের নীরবতার মধ্যে নমিতা কি করিবে, কিছুরই কূল খুঁজিয়া পাইল না। খালি নিজের ডান-হাতখানি বারম্বার কপালের উপর রাখিয়া সে অজয়ের জ্বরের উত্তাপ অনুভব করিতেছে।
নমিতা খোলা চুলগুলি আঁট করিয়া খোপা বাঁধিল; পরণের কাপড়ের প্রান্তটাকে পায়ের দিকে আরো একটু প্রসারিত ও বুকের উপর আরো একটু রাশীকৃত করিয়া লইল। চাবির গোছাটা আঁচলের প্রান্ত হইতে খুলিয়া বালিশের তলায় রাখিল ও উত্তুরে হাওয়া জোরে বহিতেছে বলিয়া মা’র পায়ের দিকের জানালাটাও বন্ধ করিতে ভুলিল না। অন্ধকারে পথ ঠাহর করিতে নমিতার বেগ পাইতে হয় না, অতিনিঃশব্দপদে সে সিড়ির প্রথম ধাপে পা নামাইল। আকাশে কৃষ্ণপক্ষের পাণ্ডুর চাদ যে অনেকক্ষণই বিবর্ণ বেদনায় মৃত্যুর প্রতীক্ষা। করিতেছে, তাহা সে জানিত; এখন সহসা সামনের ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে হঠাৎ চাদ দেখিতে পাইয়া তাহার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন লাবণ্যে তরঙ্গিত হইয়া উঠিল। কিন্তু সিড়িতে একবার পা রাখিলে হয় ত’ মাধ্যাকর্ষণের শক্তিতেই নীচে নামিয়া আসিতে হয়। নমিতা শুধু নীচে নামিয়া আসিল না, একেবারে অজয়ের ঘরের বন্ধ দরজার কাছে আসিয়া অবতীর্ণ হইল।
এক মুহূর্তও দেরি হইল না। তর্ক করিতে চাও, নমিতা তাহাতে কান পাতিবে না। তাহার পক্ষ হইতেও নীতি-কথা বলা যায় বৈ কি। রুগ্ন পরনির্ভরকামীকে সেবা করা অধৰ্ম্ম? কিন্তু এত লোক থাকিতে তাহারই বা এমন কোন্ গরজ পড়িল? বচসা করিবার সময় নমিতার আর নাই, কাকিমার মেয়েটার চেঁচাইয়া উঠিবার সময় হইয়াছে।
