—“ভেবেছিলাম সুধী-র বন্ধু, ভদ্রলোক, লেখাপড়া শিখেছে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে এমন খারাপ, তা মোটেই আন্দাজ করতে পারিনি, শচী। মরা-বন্ধুর প্রতি এতটুকু যার শ্রদ্ধা নেই, তাকে পুলিশেই ঠিক সম্মান দেখাতে পারবে।”
এইটুকু ভূমিকা করিয়া অরুণ। সবিস্তারে নমিতার সঙ্গে প্রদীপের নীতিবিরুদ্ধ সন্নিধ্যের একটা বিশ্রী বর্ণনা দিয়া ফেলিলেন। পাছে পুত্রবধুর কল্পিত বিশ্বাসঘাতকতায় স্বর্গগত পুত্রের আঘাত লাগে, সেই ভয়ে স্নেহময়ী অরুণা সমস্ত কলঙ্ক প্রদীপের মুখেই মাখাইয়া দিলেন। অবনীবাবুর কাছে প্রদীপ-নমিতা-সংস্পর্শের যেটুকু বিবরণ পাইয়াছিলেন, তাহাতে সুবিধামত একটু বর্ণচ্ছটা না মিশাইলে চলিত না, তাই সহসা উমার সম্মুখে প্রদীপ একেবারে কালো ও কলুষিত হইয়া উঠিল। অরুণা ফোড়ন দিলেন : “দেশের নাম করে যেদিন থেকে গুণ্ডামি শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই ওর প্রতি আমি আস্থা হারিয়েছি।”
শচীপ্রসাদও রসনাকে নিরস্ত করিতে পারিল না : “চেহারা থেকেই যারা মনস্তত্ব আবিষ্কার করেন, সে-সব লোকের কথায় বিশ্বাস। আমার ঘোল আনা। ওঁর চেহারা দেখেই আমার মনে হয়েছিল, লোকটা ভালো নয়। এর পর এ-সব পাড়ায় পা দিলে ওঁকে রীতিমত অসুবিধায় পড়তে হবে।”
উমার মুখ পাংশু হইয়া, গলা শুকাইয়া, নিমেষে যে কেমন করিয়া উঠিল বুঝা গেল না। না পারিল তীব্র প্রতিবাদ করিতে, না বা পারিল অভিযোটা আয়ত্ত করিতে। প্রদীপ উত্তুঙ্গ গিরিচূড়া হইতে নামিয়া আসিয়া একান্ত অকিঞ্চিৎকর পিপীলিকার সমান হইয়া উঠিল। ইচ্ছা হইল প্রদীপকে ডাকিয়া আনে, সে নিমেষে এই সব অতি-মুখর নির্লজ্জ কটুভাষণের বিরুদ্ধে তাহার অগ্নিময় ভাষার বাণ হানিয়া এই দুই আততায়ীকে অভিভূত করিয়া ফেলুক।
আর কিছুই না বলিয়া উমা নিজের ঘরে অসিয়া, একটা চেয়ারে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। যাক, এই সব ব্যাপার লইয়া মাথা না ঘামাইলেও তাহার চলিবে। সে এখানে পড়িতে আসিয়াছে, মন দিয়া পড়িয়া পরীক্ষা-সমুদ্রগুলি পার হইতে পারিলেই তাহার ছুটি মিলিবে। পরে কি হইবে এখন হইতে ভাবিয়া রাখার মত মূখতা আর কি আছে? তাহার মত অবস্থার মেয়ে দেশের জন্য কতটুকু কাজ করিতে পারে, সে বিষয়ে প্রদীপদা’র সঙ্গে খোলাখুলি একটা পরামর্শ করিতে পারিলে মন্দ হইত না, কিন্তু আপাতত তাহা স্থগিত রাখাই সমীচীন হইবে। কাজের জন্য প্রথমত খানিকটা যোগ্য ত’ দরকার, মনকে সেই আশ্বাস দিয়া সে সেলফ, হইতে একটা বই টানিয়া লইয়া পড়িতে বসিল।
এমন সময় শচীপ্রসাদ ঘরে ঢুকিয়া তাহাকে ফের উদ্বস্ত করিয়া তুলিল। শচীপ্রসাদের বয়স বাইশ, চেহারা দোহারা, পরনের জামা-কাপড়গুলি অত্যুগ্ররূপে পরিচ্ছন্ন। কামানো দাড়ি-গোঁফ, ব্যাক্-ব্রাশড় চুল,-মুখে একটা মেয়েলি-ভাবের কৃত্রিম কমনীয়তা আছে। কলেজের ছাত্র হিসাবে খুবই ভালো, এই বৎসর সসম্মানে বি, এ পাশ করিয়াছে, —বোধ হয় শীঘ্রই বিলাত যাইবে আই-সি-এস্ হইবার জন্য। উহার বাবার ইচ্ছা, শচীপ্রসাদ বিলাত যাইবার আগে এখানেই পাণিগ্রহণটা সারিয়া লয়; পিতার ইচ্ছার অনুবর্তী হইয়া শচীও তাই ঘন-ঘন এই বাড়িতে আসা-যাওয়া করিতেছে। অবনীবাবু অস্পষ্ট করিয়া মত দিয়াছেন বটে, কিন্তু উমার আগে এক মেয়ে নিজের অনিচ্ছায় বিয়ে করিয়া, স্বামীর দুর্ব্যবহারের জন্য মারা গিয়াছিল বলিয়া চট করিয়া মত দিয়া ফেলিতে অরুণা ইতস্তত করিতেছিলেন। মেয়েকে খোলাখুলি কিছু প্রশ্ন না করিয়া বিবাহের যোগাড়যন্ত্র করিবারও কোনো অর্থ নাই, কেননা, দেশের হাওয়া বদলাইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার মেয়েও এমন স্বাতন্ত্রসাধিকা হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহাতে বিয়ের নামে নাক সি টকাইয়া একদিন বাহির হইয়া পড়াটা তাহার পক্ষে বিচিত্র নয়। সুতরাং স্বয়ং শচীপ্রসাদকেই বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র ও নির্বিঘ্ন অবকাশের সুবিধা ছাড়িয়া দিয়া তাহারা স্বামী-স্ত্রী নেপথ্যে বসিয়া প্রতীক্ষা করিতেছেন।
খবরটা উমার কানে যাইবে না, উমা তেমন নিরীহ ছিল না, কিন্তু সে বোধ করি বুঝিত যে বিবাহের প্রস্তাবের মধ্য দিয়া প্রেমের শুভাবির্ভাবের সূচনা হয় না। শচীপ্রসাদ তাহার সঙ্গে ব্যবহার করিত ভীরু ভক্তের মত নয়, অনেকটা কর্তৃত্বসম্পন্ন প্রভুর মত। অর্থাৎ উমার চিত্ত জয় করিবার জন্য প্রেম দিয়া নিজের চিত্ত-প্ৰসাধন করিবার প্রয়োজন সে বুঝিত না। জোয়ারের জলের মত উমার যৌবন উদ্বেল হইয়া উঠিতেছে দেখিয়া তাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিতেছিল। উমার বাবা-মা যখন সঙ্কেত করিয়াছেন, তখন কোনো ব্যতিক্রমের জন্য তাহাকে জবাবদিহি করিতে হইবে
ভাবিয়া সে পরম নিশ্চিন্ত ছিল। নতুবা, তাহার রোমান্টিক বা কল্পনাপ্রবণ হইবার বয়স ত’ ইহাই। হাত বাড়াইয়াই যখন উমাকে আয়ত্ত করা যায়, তখন তাহাকে আকাশচারিণী শশীলেখার সঙ্গে তুলনা
বামন হইয়া অশ্রুবিসৰ্জন করিবার কোনো মানে হয় না। উমা সুন্দর, শোভনাঙ্গী; তাহা ছাড়া অবনী বাবুর সম্পত্তি উমার আঙুলের ফাঁক দিয়া নিশ্চয়ই তাহার হাতে আসিয়া পড়িবে। অতএব শচীপ্রসাদ যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে অযথা কালবিলম্ব করিলে সৌভাগ্যলক্ষ্মীর কাছে সে হাস্যাস্পদ হইবে।
অথচ, শচীপ্রসাদের এই সকল অধিকার খাটানোর জন্যই তাহার প্রতি উমা প্রসন্ন হইতে পারে নাই। এমন নিলিপ্তের মত আত্মনিবেদনের লজ্জা হয় ত’ তাহাকে সঙ্গোপনে আহত করিত। সে এমন করিয়া তাহার ব্যক্তিত্বকে মুছিয়া ফেলিতে চাহে না। নিশীথ রাত্রি ভরিয়া কাহাকে ভাবিয়া আকাশের তারাগুলির দিকে তাহার চাহিয়া থাকিতে ইচ্ছা করে; কেহ আসিবে, এই অসম্ভব একটি বিশ্বাস লালন করিয়া সে তাহার অনতি-উদঘাটিত যৌবনকে পূজার দীপশিখার মত আগ্রহ-কম্প উন্মুখ করিয়া রাখিবে, সে না আসিলে তাহার পড়ায় মন বসিবে না, চুল বাঁধিতে বাধিতে জন-যান-মুখর রাজপথের পানে চাহিয়া, সে সানন্দে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিবে। জীবনের এমন কতগুলি মুহূর্ত বাঁচিয়া সে এত অনায়াসে ফুরাইয়া যাইতে চাহে না। শচীপ্রসাদ যদি তাহার ঘরে নিঃশব্দ পদপাতে একটি ভয়-ভঙ্গুর অনুচ্চারিত প্রার্থনা লইয়া প্রবেশ করিত, তাহা হইলে উমার সৰ্ব্বদেহমন রোমাঞ্চময় হইয়া উঠিত কি না কে জানে!
