প্রদীপ কহিল,—“তোমাকে ঠিকানা দিতে পারলে আমিই বেশি খুসি হতাম, উমা, কেননা কড়া-নাড়ার প্রতীক্ষা করে বসে থাকৃতে আমার হয় ত’ ভালই লাগত। কিন্তু আজ এখানে আছি, কালকেই হয় ত’ লাহোর, দু’দিন পরেই কে জানে ফের রেঙ্গুন পাড়ি মারতে হবে। এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকলে খালি মনে হয় বৃথা আয়ুক্ষয় করছি। অন্তত চছি—এটুকু চেতনা না থাকলে মরতে আর আমার বাকি থাকে না।”
-“হেঁয়ালি রাখুন দিকি—বড়ো বড় কথা বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে বলবেন। ঠিকানা না থাকে, এমন একটা জায়গার নাম করুন যেখানে মাঝে মাঝে গিয়ে দু’ দণ্ড আপনার সঙ্গে বসে কথা কইলে সমাজ বা আইনের চোখে দণ্ডনীয় হবে না। মা বোধ হয় আসছেন নেমে, বলুন, শিগগির করে।”
প্রদীপ ফটু করিয়া বলিয়া বসিল: “১৬, শ্ৰীগোপাল মল্লিকের লেইন। ওটা একটা মে। তোমার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, চিঠি লিখো, কেমন?”
উমা হাসিয়া কহিল,-“কলমের চেয়ে পা চালাতে আমি বেশি ভালোবাসি। কিন্তু বৌদিদির ঠিকানা আপনি সত্যিই চান? তার সঙ্গে দেখা করবেন?”
কাহার পদশব্দে সচকিত হইয়া প্রদীপ নিদারুণ বিস্ময়ে তাকাইয়া দেখিল, অরুণা সিড়িতে নামিয়া আসিয়াছেন। চলিয়া যাইবার শেষ চেষ্টা করিয়া কহিল,—“দরকার নেই। ঠিকানা নিয়ে সে-বাড়িতে গেলেও যে ফিরে যেতে হবে না তার ভরসা কি? তবে নমিতার ইচ্ছা যদি কোনোদিন সত্যিই আন্তরিক হয়ে উঠে,আকাশের কোটি গ্রহ-নক্ষত্র ষড়যন্ত্র কলেও আমাদের দেখা হওয়াকে কিছুতেই খণ্ডাতে পাবে না কেউ।” বলিয়া বাহিরের জনাকীর্ণ রাজপথে প্রদীপ মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল।
মা’র দৃষ্টির সামনে সঙ্কুচিত হইয়া উমা উপরে উঠিয়া আসিল। মা-ও পুনরায় ঘরে আসিলেন। তারপরে এমন একটা তুমুল গোলমাল সুরু হইল যাহাতে শচীপ্রসাদও, প্রদীপের প্রতি যতই কেন না অপ্রসন্ন থা, সম্পূর্ণ সায় দিতে পারিল না। তক্তপোষের এক ধারে শচীপ্রসাদ এতক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়াছিল, এখন তাহাকেই মধ্যস্থ মানিয়া মেয়ের এই নির্লজ্জতার বিরুদ্ধে অরুণা বিচার-প্রার্থিনী হইয়া দাঁড়াইলেন। শচীপ্রসাদ সম্প্রতি পরোক্ষে উমার উমেদারি করিতেছিল বলিয়া, তাহার বিপক্ষে কিছু বলিতে তাহার মন উঠিতেছিল না, তাই তাহার সমস্ত রাগ গিয়া পড়িল প্রদীপের উপর। খুব জ্ঞানীর মত মুখ করিয়া শচীপ্রসাদ বলিল,-“ও-সব undesirableদের বাড়িতে ঢুকতে দেয়াই উচিত নয়। সুধী যদি বেঁচে থাকৃত, তার বন্ধু তার একটা মানে ছিল, কিন্তু এখন তার পক্ষে এ-বাড়িতে ঢোকা অনধিকার প্রবেশ ছাড়া আর কি বলব।”
উমা মা’র অন্যায় তিরস্কার শুনিয়াই বিমুখ হইয়া উঠিয়াছিল, এখন এই অযাচিত সমালোচনায় সে আর সংযম রাখিতে পারিল না। উদ্দীপ্তকণ্ঠে কহিল,—“আর কিছু বলবেন কি করে? আপনাদের কি চোখ আছে না চোখের স্বচ্ছতা আছে? উনি নিজে যেচে এখানে আসেন নি, আমিই ওঁকে ডেকে এনেছিলাম। তা ছাড়া দাদা মারা গেছেন বলেই ওঁকেও আমরা ভূত বানিয়ে ফেল্ব আমাদের এ অকৃতজ্ঞতা বিধাতা ক্ষমা করবেন না। উনি আমাদের সংসারে অবাঞ্ছনীয় হলেন, সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য। ওঁর সংস্পর্শে এলে একটা নূতন জগতের আবিষ্কারের রোমাঞ্চ অনুভব করতে পেতেন নিশ্চয়।”
শচীপ্রসাদ ভাবিল, উমাকে অযথা চটাইয়া দিয়া সে ঠকিয়া গিয়াছে; কিন্তু কি করিয়া নিক্ষিপ্ত তীর ফিরাইয়া আনা যায়, তাহারই একটা দিশা খুঁজিতেছিল এমন সময় অরুণাই তাহাকে রক্ষা করিলেন। কহিলেন,–“কিন্তু অমন গুণ্ডাকে রাস্তা থেকে ধরে আনবারই বা এমন কি দায় পড়েছিল?”
—“দায় পড়ত যদি আমার বা তোমার প্রাণান্তকর অসুখ হ’ত— তখন রাত জেগে গা-গতর ঢেলে সেবা করবার দরকার পড়ত যে। যদ্দিন তিনি দাদার সেবা করেছেন, ততদিন তিনি মহাপুরুষ, সাধু; আর আজ তিনি তার দেশের সেবা করছেন বলেই গুণ্ডা। আমাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের সঙ্গে যে তার সঙ্ঘর্ষ বেধেছে।”
শচীপ্রসাদ টিপ্পনি কাটিল: “দেশ কথাটা বানান করা নেহাৎ সোজা বলে সবাই তা নিয়ে ফেঁপরদালালি করে।”
উমা কহিল,—“দেশ বানান্ করা সোজা বটে, কিন্তু বানানো সোজা নয়। সেটা দয়া করে মনে রাখবেন।”
রূঢ় কথা শচীপ্রসাদও কহিতে জানে, কিন্তু কথায়-কথায় কোথায় আসিয়া পৌঁছিবে তাহার ঠিকানা কি! তাহার চেয়ে চুপ করিয়া সিল্কের রুমাল দিয়া ঘাড়টা বার পনেরো রগড়াইলে বরং কাজ দিবে।
কথা কহিলেন অরুণা : “কিন্তু এমন বেহেড় বকাটের সঙ্গে তোর আবার অত ঘটা করে সম্পর্ক রাখতে যাওয়া কেন? আমি ভাবছি আসচে হপ্তারই তোকে হষ্টেলে ভর্তি করে দেব।”
উমা চুলগুলি লইয়া টানা-হেঁচড়া করিতেছিল; কহিল,—“তার মানে আমাকে প্রদীপদা-র প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে চাও। হষ্টেলে ত’ আমি যাবই, তা বিশেষ করে মনে করিয়ে দেবারই বা কি দরকার? কিন্তু হষ্টেলে গিয়ে সত্যিই যদি আমাকে দীপদা-র সাহচর্য থেকে সরে থাকতে হয়, তা হলে সেটা আমার সীতার বনবাসের চেয়েও অসহনীয় হবে।”
এই প্রগল্ভ দুর্বিনীত মেয়েটাকে প্রহার করিতে পারিলেই বুঝি অরুণা সন্তুষ্ট হইতেন, কিন্তু তাহাতে বাধা ছিল। তাই কণ্ঠে বিষ ঢালিয়া তিনি কহিলেন,—“তুই আর ওর চরিত্রের কী জানিস? পরের বাড়ির বৌর ওপর কেন ওর এত দরদ, তা তুই বুঝবি কি করে?
না বুঝিলেও উমাকে বুঝাইয়া না দেওয়া পর্যন্ত অরুণার স্বস্তি ছিল। শচীপ্রসাদ এ-বাড়িতে সম্পূর্ণ আগন্তুক নয়, অরুণার দিক হইতে তাহার সঙ্গে একটা সম্পর্কের সূত্র খুঁজিয়া বাহির করা কঠিন হইবে না। তাই তাহার সামনে প্রদীপের নিন্দাটা শিষ্টাচারের বহির্ভূত হইবে না ভাবিয়াই, অরুণা তাহাকেই সম্বোধন করিলেন :
