প্রদীপ তবু হাসিল বটে, কিন্তু গলার স্বর ভারি হইয়া উঠিল : শাস্ত্রবিহিত অভিভাবকের চেয়ে নিজের বিবেকের শাসনই প্রবল হয়ে ওঠে, মা। বিংশ শতাব্দীর ধৰ্ম্মই এই। নমিতার কি করা উচিত না উচিত সে-পরামর্শ তার সঙ্গেই করা ভালো।”
অরুণার মূখ চোখ রাঙা হইয়া উঠিল; কহিলেন,—“তুমি বলতে চাও স্বামীর ধ্যান ছেড়ে তোমাদের এই তুচ্ছ দেশসেবায় তাকে তুমি প্ররোচিত করবে?”
–“আমার সাধ্য কি মা? নিজে না জাগলে কেউ কাউকে ঠেলে জাগাতে পারে না। যদি নমিতা একদিন বোঝে তার এই স্বামীধ্যানটাই তুচ্ছ, তা হলে সেটা দেশের পক্ষে পরম সৌভাগ্যসূচনা। কেন না দেশের সেবায়ই সে বেশি মৰ্যাদা পাবে। মরা লোককে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে আমরা আমাদের মনগুলিকে মিউজিয়মে রূপান্তরিত করি নি। যাক্, ঠিকানাটা দিন, সত্যিই আমারো বেশি সময় নেই।”
অরুণা কহিলেন,—“তোমাকে তার ঠিকানা দিতে পার্লাম না।”
প্রদীপ স্তব্ধ হইয়া গেল। বলিল,—“কারণটা জানতে পারি?”
—“নিশ্চয়। কারণ, আমরা চাই না বাইরের লোক এসে আমাদের ঘরের বউর সঙ্গে বাজে আলাপ করে।”
সমস্ত কুয়াসা এতক্ষণে পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে। প্রদীপের নিশ্বাস হালকা হইয়া আসিল। যেন সে একটা গভীর সন্দেহ ও আশঙ্কা হইতে এতক্ষণে মুক্তি পাইয়াছে। একটু হাসিয়া কহিল,—“আপনার বিধান আমি মেনে নিলাম, মা। ঠিকানা আমি তার চাইনে। যদি সত্যিই তার সঙ্গে দেখা করবার ইচ্ছাটা আন্তরিক হয়ে ওঠে, তবে একদিন দেখা তার পাবই—এ একেবারে স্বতঃসিদ্ধ। আগে ভাবতাম, নমিতা আমার বন্ধুর স্ত্রীর প্রতি আমারো দায়িত্ব আছে। এখন সে-সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিলেন বলে ভালোই হ’ল। এখন যদি নমিতার সঙ্গে কোনোদিন দেখা হয়, সে আর আমার বন্ধুর স্ত্রী নয়, মা, খালি বন্ধু। চাইনে ঠিকানা।” বলিয়া প্রদীপ দ্রুতপদে সিড়ি দিয়া সোজা নামিয়া আসিল।
হঠাৎ সিড়িতে উমার ব্যগ্র কলকণ্ঠ শোনা গেল : “দাঁড়ান দাঁড়ান। দীপ-দা। বউদির ঠিকানা নাই বা পেলেন, নিজের ঠিকানা না দিয়ে পালাচ্ছেন যে।”
১১. দরজার গোড়ায় প্রদীপ
দরজার গোড়ায় প্রদীপকে উমা ধরিয়া ফেলিল। কহিল,—“আপনার সঙ্গে দেখা হবার ইচ্ছাটা আমার একান্ত আন্তরিক ছিল বলেই ত’ আজ বাস-এ আমাদের দেখা হয়ে গেল। কিন্তু সেই দেখা অসম্পূর্ণ রাখতে হবে এমন দুর্ঘটনা অবশ্যি এখনো ঘটেনি।”
প্রদীপ আশ্চর্য হইয়া উমার মুখের পানে তাকাইল। দুইটি উজ্জ্বল আয়ত চক্ষু বুদ্ধিতে দীপ্তি পাইতেছে, ছোট সঙ্কীর্ণ ললাটটিতে প্রতিভার স্থির একটি আভা বিরাজমান। কৃশ দেহটি ঘিরিয়া স্নানাভ যৌবনের যে একটি লালিত্য লীলায়িত হইয়া উঠিয়াছে, তাহা মুহূর্তের জন্য প্রদীপের ক্লান্ত মন ও চক্ষু আবিষ্ট করিয়া তুলিল। উমার এই ছুটিয়া ডাকিতে আসাটির মধ্যে কোথায় যে একটি সযত্নসমৃদ্ধ সুস্নিগ্ধ স্নেহের স্বাদ আছে, তাহা আবিষ্কার করিতে গিয়া এই মেয়েটির প্রতি প্রদীপের মায়ার আর শেষ রহিল না। কিন্তু কি বলিবে তাহাই ভাবিয়া লইবার জন্য প্রদীপ এক পলক অপলক চোখে উমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
উমা কহিল,—“এখুনি পালাতে চাইলেই আমি ছাড়ব আর কি। আপনার সঙ্গে আমার কত যে কথা আছে, তা এতদিন ভেবে ভেবে আমি শেষ করতে পারিনি। দাঁড়ান, সব আমাকে ভেবে নিতে দিন।”
প্রদীপ ম্লান হাসিয়া কহিল,—“সময় নেই, উমা। তা ছাড়া আমার সঙ্গে মিশতে দেখলে মা খুসি হবেন না।”
উমা নির্ভীক কণ্ঠে কহিল,—“আপাতত নিজে খুসি হলেই আমার স্বচ্ছন্দে চলে যাবে খন। বেশ ত, এ বাড়িতে ডেকে এনে আপনাকে যদি অপমানিত করে থাকি, দাঁড়ান, আমি আপনার মেস্-এ যাব। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে প্রকাও ইতিহাস শেষ করা যাবে না।”
—“তুমি পাগলের মতো কী বকতে সুরু করূলে?”
—“বকূলেই পাগল হয় না এবং ঢের পাগল আছে যারা মোটেই বকে না। আমি বছিও না, পাগলও হইনি। দেখবার ইচ্ছাটা আন্তরিক হলে দৈবাৎ এক আধবার মাত্র দেখা হতে পারে, কিন্তু দেখাটা যখন আবশ্যকীয় হয় তখন ইচ্ছাটা খালি আন্তরিক হলেই চলে না, দস্তুরমত ঠিকানা জানা দরকার। আপনার ঠিকানা যদি না দেন, তবে বলব মা’র থেকে বৌদির ঠিকানা না পেয়ে আপনি ছোট ছেলের মত অভিমান করেছেন। পুরুষ-মানুষের রাগ আমি সইতে পারি, কিন্তু ছিচকাদুনের মত অভিমান আপনাদের মানায় না কক্ষনো।”
প্রদীপ আবার ভালো করিয়া উমাকে না দেখিয়া পারিল না। উহার সাদাসিধে শাড়িখানা যেন নিমেষে তাহার অজস্র স্নেহে মাখিয়া উঠিল, উহার দুই চোখে যেন অদেখা আকাশের ছায়া পড়িয়াছে! কিন্তু নারীর রূপকে সে ধ্যানী বা কবির চোখেই দেখিতে শিখিয়াছে, তাই এই দৃপ্ত সাহসিকাকে ভারতোদ্ধারবাহিনীর অগ্রবর্তিনী করা যায় কি না, তাহাই ভাবিয়া তাহার আশা ও আনন্দ একসঙ্গে উথলিয়া উঠিল। কহিল,—“কিন্তু আমাকে নিয়ে তোমার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? ভবিষ্যৎ বলে আমার যেমন কিছু নেই, তেমন আমার। ঠিকানাও আমি নিজেই খুঁজে পাই না। স্থায়িত্ব জিনিসটা আমার ধাতে সয় না। আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, স্নেহ, জীবন-মরণ সব কিছু স্বল্পায়ু বলেই আমরা কাজ করতে এত বল পাই এবং তাড়াতড়ি করে ফেলবার জন্যে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি।”
উমার দুইটি চোখের কোলে তরল হাসি টলটল করিয়া উঠিল। কহিল,—“আমি দার্শনিকতা বুঝি না। সোজা স্পষ্ট কথা বলতে পারলে বেঁচে যাই। অবশ্যি আপনার দেশসেবায় আমি ব্ৰতধারিণী হ’তে পাবে না, সে আমার বোকা মুখ ও বেচারা চেহারা দেখেই বুঝতে পারছেন, কিন্তু দেশসেবা ছাড়া জীবনে আর বড় কাজ নেই এ-কথা আপনি বুদ্ধিমান হলে নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন না। তেমন কোনো কাজে আপনাকে দরকার হলে কোথায় আমি কড়া নাড়ব?”
